Ultimate magazine theme for WordPress.

ইউরোপে অভিবাসন ও অভিবাসী পাচারের বাস্তবতা

0

ইউরোপে অভিবাসনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানবপাচারের সাথে যুক্ত চক্ররা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পাচার করে দেয়। ক্রাইম টিভি বাংলা তুলে ধরছে এ বিষয়ে কিছু তথ্য, যা জেনে সতর্ক হতে পারেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা, জানতে পারেন কীভাবে এই সমস্যার বিরুদ্ধে লড়ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন।
কর্তৃপক্ষের কড়াকড়ির সাথে তাল মিলিয়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে জনপ্রিয় অভিবাসনের পথ। সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষের স্বপ্নের ও অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে দালালদের নানাবিধ অপরাধের প্রবণতা। এর মধ্যে অন্যতম ইউরোপে অভিবাসনের লোভ দেখিয়ে মানবপাচারের সমস্যাটি।
অভিবাসী পাচার কী?
সফল অভিবাসনের স্বপ্ন দেখিয়ে, জীবনের ঝুঁকিতে ফেলে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বিভিন্ন দেশে পাচার করার এই ধারা বর্তমানে বৈশ্বিক অপরাধ চক্রের রূপ নিয়েছে।
ইউরোপিয়ান কমিশনের মতে, অভিবাসী পাচারের সাথে জড়িয়ে আছে কয়েক বিলিয়ন ইউরোর ব্যবসা, যার মূলে রয়েছে অসংখ্য অপরাধী চক্র। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে অবৈধভাবে নিয়ে আসতে এই চক্রগুলি ব্যবহার করে স্থল, জল ও আকাশপথ।

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের এভাবে পাচার হওয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও প্রাণহানির সমস্যা, যা সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় সাগরপথে অবৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে। যে হারে সাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মৃত্যুর হার বাড়ছে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় ঠিক কতটা গভীরে রয়েছে এই সমস্যা।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, এই চক্রের শিকড় ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি সংগঠনের মধ্যেও। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, এই চক্রের সাথে পাওয়া গেছে বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী, কালো টাকার কারবার ও মানবপাচারের যোগ।

কীভাবে লড়ছে ইউরোপ?
পঞ্চবার্ষিকী ’ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন অ্যাকশন প্ল্যান এগেইন্সট মাইগ্র্যান্ট স্মাগলিং’ নীতিমালা ঠিক করে দেয় কীভাবে ও কোন কোন এলাকায় জোর দেবে ইইউ’র অভিবাসী পাচার বিরোধী কার্যকলাপ।
সম্প্রতি শেষ হয়েছে এই অ্যাকশন প্ল্যানের ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের নীতিমালার মেয়াদ। ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের সাথে মিলে শুরু হয়েছে নতুন নীতিমালা গঠনের কাজ। এখনও এই নীতিমালা গঠনের কাজ শেষ না হলেও নীতিমালার ওয়েবসাইট ধারণা দিচ্ছে ঠিক কী কী আশা করা যাচ্ছে এই নতুন পরিকল্পনা থেকে।
ইইউ জানাচ্ছে, ”আমরা দেখেছি কীভাবে অভিবাসী পাচার চক্রগুলোর মধ্যে মানব জীবনের জন্য ন্যূনতম সম্মানটুকুও থাকে না। তারা এই কাজের মাধ্যমে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মানবিক ও অভিবাসনকেন্দ্রিক সমস্ত পরিকল্পনাকে ভেস্তে দিতে চায়। আমাদের নতুন অ্যাকশন প্ল্যানে আমরা চেষ্টা করবো এই চক্রের অর্থায়নের গভীরে যেতে। কীভাবে ভুয়া নথি এই কাজে ব্যবহার করা হয় তার মূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করবো আমরা।

২০২১-২০২৫ সালের অ্যাকশন প্ল্যান গঠনে বিশেষজ্ঞ ছাড়াও সাধারণ জনগণের কাছ থেকে তথ্য চেয়েছে ইইউ। তাদের আশা, মাঠপর্যায়ের তথ্য এই চক্রকে সমূলে উৎপাটনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ইতিমধ্যে বেশ কিছু সহযোগী সংস্থার সাথে মিলে অভিবাসী পাচারের বিরুদ্ধে কাজ শুরু করেছে ইইউ। এর মধ্যে রয়েছে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সংস্থা ফ্রন্টেক্স ও ইউরোপিয়ান পুলিশ সংস্থা ইউরোপোল। এই সংস্থাগুলির সাথে মিলে ইইউ গঠন করে ’ইউরোপিয়ান মাইগ্র্যান্ট স্মাগলিং সেন্টার’ বা ইএমএসসি। ২০১৬ সালে গঠিত এই সেন্টারের প্রথম বছরেই আসে সাফল্য। বারো হাজারেরও বেশি বার্তা পায় সেন্টারটি, যার সাহায্যে ১৭ হাজার ৪০০ পাচারের সাথে যুক্ত রয়েছে এমন সন্দেহভাজনদের তথ্য পায় ইইউ। এই তথ্যের ভিত্তিতে দু’হাজারেরও বেশি দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক তদন্ত শুরু হয়।
এছাড়া এই সেন্টারের সাহায্যে বেশ কিছু স্থানীয় টাস্ক ফোর্স গঠন ও বিভিন্ন ডেটাবেজকে শক্তিশালী করতে পেরেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন।

কী ছিল আগের অ্যাকশন প্ল্যানে?

আগের অ্যাকশন প্ল্যান জানায় যে, ইউরোপগামী অভিবাসনের স্রোতের গন্তব্য মূলত জার্মানি, সুইডেন ও যুক্তরাজ্য। অভিবাসনপ্রত্যাশীরা আসে সিরিয়া, পাকিস্তান, ইরাক, সেনেগাল, সোমালিয়া, নাইজের, মরক্কো থেকে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাড়ছে ভারত, বাংলাদেশ, চীন ও ভিয়েতনাম থেকে আগত অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল।

ফলে, অ্যাকশন প্ল্যানের নজর রয়েছে ভূমধ্যসাগর ও এজিয়ান সাগরের অভিবাসন রুটগুলি, যার মাধ্যমে এই দেশগুলি থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা আসেন।

এই অ্যাকশন প্ল্যান জানায় যে, এই অভিবাসী পাচারের ২৩০টি কেন্দ্র রয়েছে, যা সম্পর্কে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সতর্ক থাকা উচিত। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ আম্মান, আলজিয়ার্স, বৈরুত, বেনগাজি, কায়রো, কাসাব্লাঙ্কা, ইস্তাম্বুল, ইজমির, মিস্রাতা, ওরান ও ত্রিপোলি কেন্দ্রগুলি।

অভিবাসী পাচারের চক্রের সাথে জড়িতদের ত্রিশ শতাংশ কোনো ইইউ রাষ্ট্রের নাগরিক। বুলগেরিয়া, মিশর, হাঙ্গেরি, ইরাক, কোসোভো, পাকিস্তান, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, সার্বিয়া, সিরিয়া, টিউনিশিয়া ও তুরস্কের জন্মগ্রহণ করা ব্যক্তিরা রয়েছেন তাদের মধ্যে।

অ্যাকশন প্ল্যান থেকে উঠে আসে আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিবাসী পাচারের সাথে বেশ কিছু ক্ষেত্রে জড়িত থাকে ইউরোপে বসবাসরত ডায়াস্পোরা গোষ্ঠীর সদস্যরা। যে কোনো দেশের নাগরিক যখন তার দেশের বাইরে বসবাস করে, সেই প্রবাসী গোষ্ঠীকে বলা হয় ডায়াস্পোরা। ফলে ইউরোপে বসবাসকারী তৃতীয় দেশ থেকে আসা প্রবাসীরা নিজদেশ থেকে অবৈধভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পাচারের সাথে জড়িত, জানাচ্ছে ইইউ। বিশেষ করে পাচার হওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের লুকিয়ে রাখা, তাদের যাতায়াত ও অবৈধ কাজের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রয়েছে প্রবাসীদের।

কীভাবে সতর্ক হবেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা?

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন জানাচ্ছে যে, সোশাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে চালানো হয় অভিবাসী পাচারের কার্যক্রম। তুরস্ক বা লিবিয়া পর্যন্ত বিমানে আসার পর সাগরপথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা৷ এ সংক্রান্ত ’ট্যুর প্যাকেজের’ বিজ্ঞাপন নজরে এসেছে ইইউ কর্তৃপক্ষের।

ফেসবুক, হোয়াটসাপসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিবাসী পাচারকারীরা সক্রিয় থাকে। শুধু তাই নয়, এই সব মাধ্যমে অভিবাসন সম্পর্কিত বহু ভুয়া তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের।

পাশাপাশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইউরোপে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের ভুয়া নথির জালে জড়িয়ে ফেলে এই পাচারকারীরা। ইইউ জানাচ্ছে, বেশিরভাগ ভুয়া নথি আসে থাইল্যান্ড, এথেন্স, ইস্তাম্বুল ও সিরিয়া থেকে।

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পাচারের সাথে নৌবাহিনী, সামরিক বাহিনীসহ বেশ কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত ব্যক্তিদের জড়িত থাকার কথা জানাচ্ছে ইইউ। এই পাচারের সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করে আসছে দুর্নীতির বিষয়টি, যার বিরুদ্ধে লড়ার নতুন পন্থা খুঁজছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্র কমিশনার ইলভা ইয়োহানসনের মতে, যে সকল অপরাধী মানবপাচারের সাথে জড়িত, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারাই জড়িত মাদক ও অস্ত্র পাচারের সাথেও। অনেক ক্ষেত্রে পাচারের শিকার অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ব্যবহার করা হয় মাদক ও অস্ত্র পাচারের জন্যেও।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »