Ultimate magazine theme for WordPress.

এসকে সুর ও শাহ আলম-এর অনিয়ম তদন্তে গড়িমসির অভিযোগ

0

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর ও বর্তমান নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম-এর দুর্নীতিসহ তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম অনুসন্ধানে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয়েছিলো ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং (কারণ উদ্ঘাটন) কমিটি। প্রায় পাঁচ মাস পার হলেও এই কমিটি কোনো রিপোর্ট দিতে পারেনি। বাকি কাজ শেষ করতে আরও এক মাস সময় চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কর্মকর্তাদের গড়িমসির কারণেই গতি পাচ্ছে না দুর্নীতি অনুসন্ধান কমিটির কাজ।

২০০২ সাল থেকে তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘অনিয়ম-দুর্নীতিতে’ ডুবতে বসার ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি দায় নিরূপণ করতে কমিটি গঠন করে দেয় হাইকোর্ট। এছাড়া এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেখভালের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়ও নিরূপণের নির্দেশনাও দেওয়া হয় এই কমিটিকে। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর এমডি, প্রয়োজনে চেয়ারম্যান, সাবেক ডিজি এসকে সুর ও শাহ আলমকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কমিটি।

তদন্ত কমিটিতে যারা আছেন:

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এ কে এম সাজেদুর রহমান খানকে সভাপতি ও বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. সারোয়ার হোসেনকে কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটিতে অন্য সদস্যরা হলেন- বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এ কে এম ফজলুর রহমান, ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক মো. কবির আহাম্মদ, ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ-৪-এর মহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আমীন। এছাড়া আদালত যে দু’জনকে কমিটিতে যুক্ত করেছেন, তাঁরা হলেন- সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মহিদুল ইসলাম ও সাবেক সচিব নুরুর রহমান।

ডুবতে বসা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফসি), পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড।

আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, এই তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের সংগে কমিটির কোনো সদস্য জড়িত থাকলে বা কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে সেই সদস্য দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবেন। তদন্তের প্রয়োজনে এই তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে কমিটি।

জানা গেছে, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ অন্তত পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পিকে হালদার। মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে এসব অর্থ লোপাটের তথ্য চাপা দিতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিম। এসব অনিয়মে সহায়তা করতেন সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী ও নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম। তাদের সহায়তা করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও কিছু অসাধু কর্মকর্তা।

চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য উঠে আসে পিকে হালদারের অন্যতম সহযোগী ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাশেদুল হকের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে। গত ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সিএমএম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন রাশেদুল হক।

রাশেদুল হক তাঁর জবানবন্দিতে বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম চাপা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন কর্মকর্তাদের পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা করে দিতো রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক শাহ আলমকে প্রতি মাসে দেওয়া হতো দুই লাখ টাকা করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতি ‘ম্যানেজ’ করতেন সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী।’

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভার্চুয়ালি যুক্ত এক আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে হাইকোর্টের কোম্পানি বেঞ্চের বিচারক মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার-এর একক বেঞ্চ ঋণখেলাপি আইনজীবীদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পি কে হালদার এবং এস কে সুর কী আকাম-কুকাম করছে সেটা তো চলবেই। আমরা দেখছি হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে এই কোম্পানিকে বাঁচিয়ে রেখে টাকা উদ্ধার করা যায় কি-না। আমানতকারীরা আজকে খেয়ে, না খেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন। আমরা চেষ্টা করছি ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের। একটি কোম্পানি অবসায়ন করতে হলেও তার একটা প্রসিডিং আছে। আমরা সেটাও দেখছি। টাকাগুলো উদ্ধারের একটা পথ বের করার চেষ্টা করছি। এ সময় অনেক ঋণখেলাপি টাকা পরিশোধে সময় প্রার্থনা করছেন।’

এরই এক পর্যায়ে ভার্চুয়ালি যুক্ত আইনজীবীকে আদালত বলেন, ‘শাহ আলম একটা চোর, ডাকাত।’

এর আগে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আসা এসব অভিযোগে সমালোচনার ঝড় তোলেন অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা। এরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টনক নড়ে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পাঁচ সদস্যের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কমিটি গঠনের তিন মাস পর নতুন করে এক মাস সময় চাওয়া হয়। অনুসন্ধানের সুবিধার্থে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিলো তদন্ত দলকে। কিন্তু অতিরিক্ত একমাসসহ মোট প্রায় পাঁচ মাস পার হলেও তদন্তে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। অভিযোগ উঠেছে, কর্মকর্তারা ইচ্ছা করেই তদন্তে সময়ক্ষেপণ করছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশিরভাগ কর্মী দক্ষতা ও সততার সংগে কাজ করেন। দু’য়েজন কর্মকর্তার জন্য সবার বদনাম গ্রহণযোগ্য নয়। তাই যাদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সঠিক তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কিন্তু আমরা দেখছি প্রথম থেকেই বিষয়টি নিয়ে গড়িমসি চলছে। তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছে কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। এভাবে অনিয়মের অভিযোগ এড়িয়ে গেলে আগামীতে অন্য কর্মকর্তারাও এমন অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়াবে।

তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বাংলাভিশন ডিজিটালকে জানান, তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম তদন্তে গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি নতুন করে গভর্নর-এর কাছে সময় চেয়েছেন। তবে সেটা গভর্নরই ঠিক করে দেবেন। তবে তিনি কতদিন সময় দিয়েছেন বা দিবেন বিষয়টি আমি এখনও জানি না।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »