Ultimate magazine theme for WordPress.

কঠোর লকডাউন: শুধু রাজধানীতেই জরিমানা দুই কোটি, কার্যকর কতোটুকু?

0

করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত কঠোর বিধি-নিষেধে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই জরিমানা আদায় হয়েছে দুই কোটিরও বেশি টাকা। সেই সংগে গ্রেফতার করা হয়েছে সাড়ে আট হাজার ব্যক্তিকে। তবু করোনা সংক্রমণ কমেনি। বরং দিন যতো যাচ্ছে, ততোই বাড়ছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা। যে কারণে এতো জরিমানা এবং গ্রেফতার, তা কতোটা নিরসন করতে পেরেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে পহেলা জুলাই থেকে কঠোর বিধি-নিষেধ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর পরই বিধি-নিষেধ বাস্তবায়নে পুলিশের পাশাপাশি রাজধানীসহ দেশজুড়ে মাঠে নামে সেনা-বিজিবি ও র‍্যাব সদস্যরা। এই সময়ে বিধি-নিষেধ বাস্তবায়নে সক্রিয় ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও। গত ১৪ দিনে শুধু রাজধানী ঢাকায়ই অযৌক্তিক কারণে ঘর থেকে বেরিয়ে জরিমানা গুনতে হয়েছে ২ কোটি ৯ লাখ ৯৭ হাজার ৮৯২ টাকা।
নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, জরিমানা ও গ্রেফতারের মূল উদ্দেশ্য ছিলো মানুষকে ঘরে রাখা। এজন্য চেষ্টার কোনও ত্রুটি ছিলো না। কিন্তু সফল হতে পারেননি জানিয়ে তাঁরা বলছেন, সফল না হওয়ার জন্য অন্য অংশীজনরা দায়ী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্প কারখানা এবং গার্মেন্টস খোলা রেখে ছোট ছোট দোকান বন্ধ রাখা মানেই যদি লকডাউন হয়, সেটি কোনোভাবেই সফল হবে না। এজন্য জারিকৃত প্রজ্ঞাপনটি ‘সমন্বয়হীন প্রজ্ঞাপন’ ছিলো বলেও মত তাঁদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যারা গ্রেফতার হয়েছেন কিংবা যাদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন বিভিন্ন কল-কারখানার শ্রমিক ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মী। এদের অনেকেই নিদারুণ বাস্তবতা মাথায় রেখে শুধু পেটের দায়েই বাইরে বের হয়েছিলেন। যে কারণে মামলা কিংবা জরিমানায়ও তাঁদের ঘরে ফেরানো যায়নি।
রবিবার (১১ জুলাই) দুপুরে সাইন্সল্যাব চেকপোস্ট এলাকায় কথা হয় মোটরসাইকেল চালক আজাদের সংগে। তিনি বাইরে বেরিয়ে জরিমানার মুখে পড়েছিলেন।
তিনি বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, একটা ওয়্যারহাউসে সুপারভাইজার পদে চাকরি করতাম। করোনাকালে ঈদুল ফিতরের পর চাকরি হারিয়েছি। এরপর চাকরি পাইনি। স্ত্রী, দুই সন্তানের খাবার জোগাড় এবং মাস শেষে বাসা ভাড়া ম্যানেজ করতে নিরুপায় হয়ে মোটর সাইকেলে যাত্রী আনা-নেওয়া করে সংসার চালাচ্ছিলাম। বিধি-নিষেধ জারি হওয়ার পর সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ৫-৬ দিন বের হইনি। জমানো টাকাও শেষ। বাধ্য হয়ে বের হয়েছিলাম। পাঁচদিন মোটরসাইকেল চালিয়ে আড়াই হাজার টাকা আয় করেছি। আজ ধরা পড়েছি। দুই হাজার টাকার মামলা দিয়েছে। এখন এই টাকা পরিশোধ করতেও তো আমাকে আবারও মোটরসাইকেল চালাতে হবে।
তিনি বলেন, কেউ মনের খুশিতে এমন পরিস্থিতিতে বাইরে বের হয় না। নিশ্চয়ই আমার মতো অতি কষ্টে রয়েছে বলেই বের হয়। আমাদের তো একবেলা কেউ খাবার দিয়ে সহযোগিতা করবে না। আমরাও কারও কাছে হাত পাততে পারি না। এটাই কি আমাদের অপরাধ?
এমন পরিস্থিতি শুধু মো. আজাদের নয়। আরও অনেকেই জানিয়েছেন লকডাউনে কষ্টময় দিনগুলোর কথা। পাশাপাশি লকডাউনের ব্যবস্থাপনা নিয়েও তাঁদের মনে চরম ক্ষোভ।
এতো জরিমানা কিংবা গ্রেফতারের পরও সড়কে সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে রীতিমত অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বরত কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগের লালবাগ জোনের এক কর্মকর্তা বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, এটা ঠিক যে- এই ক’দিনে যাদের মামলা দেওয়া হয়েছে কিংবা জরিমানা করা হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশই কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবী। চাকরি বাঁচাতেই মূলতঃ বাইরে বের হতেন। কিন্তু আমাদের কাছে যেহেতু নির্দেশনা রয়েছে, জরুরি সেবা ছাড়া অন্য কেউ বাইরে বের হতে পারবে না, তাই নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের মামলা দিতে হতো কিংবা জরিমানা করতে হতো। আমাদেরও কিছু করার ছিলো না।
এই কর্মকর্তা বলেন, সরকারের নির্দেশনা ছিলো, জরুরি ছাড়া কোনও প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে না। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অনেক প্রতিষ্ঠানই নির্দেশনা মানেনি। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে তো আমরা ব্যবস্থা নিতে পারবো না। এজন্য অন্য সংস্থা রয়েছে। আমরা জরিমানা করেছি এটা ঠিক, কিন্তু জরিমানা যে উদ্দেশ্যে করেছি, মনে হচ্ছে তা কাজে আসেনি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মনিবুর রহমান বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, লকডাউনে শিল্পকারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিলো। কর্মীদের ছাড়া সেটি সচল রাখা যায় না, তাই কর্মীরাও বের হয়েছে। কিন্তু প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিলো নিজস্ব পরিবহনে কর্মীদের আনা নেওয়া করতে হবে। বাস্তবে দেখা গেছে, অনেকেই তা করেননি বা অনেকের সেই সক্ষমতা নেই। আমি বলবো, সকল অংশীজন লকডাউন বাস্তবায়নে সহযোগিতা করলে মানুষকে ঘরে রাখা সম্ভব হতো। সেই সহযোগিতা পরিলক্ষিত হয়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও আইইডিসিআর-এর সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, বাংলাদেশ একটি বাণিজ্যমুখী রাষ্ট্র। সবখানে বাণিজ্য খোঁজে। এবারের লকডাউন থেকেও সরকার কিছু আয়-উপার্জন করতে চেয়েছে জরিমানা দিয়ে। লকডাউন বাস্তবায়নকারীরা ভেবেছে, জেল দিলে, জরিমানা করলেই বুঝি এটি ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা যাবে। ঠিক তা নয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কল-কারখানা সব খোলা থাকবে। আবার বলা হলো, বাড়ি থেকে যেন মানুষ বের না হয়। তো কল-কারখানা খোলা থাকলে ৫০ লাখ মানুষ তো বের হবেই। এই প্রজ্ঞাপনের সংগে বাস্তবতা তো মিলছে না। তাহলে এই লোকগুলোকে অযথা জরিমানা করা হলো কেন?
তিনি বলেন, প্রজ্ঞাপনে এতো ফাঁক-ফোকর যে, ফুটো কলসিতে পানি ঢালার মতো হয়েছে। এভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। হওয়ার কথাও না, হয়ওনি।
তিনি বলেন, নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হলো, ২৩ জুলাই থেকে কল-কারখানাও বন্ধ থাকবে। তার মানে কল-কারখানাও বন্ধ রাখা যায়, সরকার চাইলে। এই কল-কারখানা কেন এই ১৪ দিন বন্ধ রাখা হলো না? কার স্বার্থে কল-কারখানা খোলা ছিলো? আমরা কি পারতাম না এই ১৪
তিনি বলেন, নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হলো, ২৩ জুলাই থেকে কল-কারখানাও বন্ধ থাকবে। তার মানে কল-কারখানাও বন্ধ রাখা যায়, সরকার চাইলে। এই কল-কারখানা কেন এই ১৪ দিন বন্ধ রাখা হলো না? কার স্বার্থে কল-কারখানা খোলা ছিলো? আমরা কি পারতাম না এই ১৪ দিনে সবাই মিলে স্যাক্রিফাইস করতে? যেখানে দোকান খোলা রাখা যায় না, সেখানে গার্মেন্টসগুলোতে লাখ লাখ কর্মী যাওয়া-আসা করছে। এমন সুবিধা কার স্বার্থে?
তিনি আরও বলেন, এই যে জরিমানা-তল্লাশী, মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট- এগুলো হলো স্ট্যান্টবাজি। যেমনটা সিনেমায় দেখানো হয় যে, নায়ক লাফ দিয়ে আরেকজনকে ঘুষি মেরে ফেলে দিলো। কিন্তু বাস্তবতা হলো- ওই নায়কের পেছনে সুতা লাগানো থাকে। লকডাউনটা ছিলো এমন। এই যে ঈদে শিথিল করলো, এখন দেখার অপেক্ষা শুধু ঈদের পরের ভয়াবহতা।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »