Ultimate magazine theme for WordPress.

হোলি ওয়াটার কেলেঙ্কারি ও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার দ্বৈরথের ইতিহাস

0

১৯৯০ এর বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এক ডিফেন্ডারকে পানির সাথে ট্র্যাঙ্ক্যুলাইজার মিশিয়ে খাইয়েছিলেন আর্জেন্টাইন ফিজিও। এই কথা স্বীকার করেছিলেন স্বয়ং ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তবে লাতিন আমেরিকার এই দুই প্রতিবেশীর দ্বৈরথটা আরও আগে থেকেই। ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব দিয়ে তা শুরু হলেও খেলার মাঠের রেষারেষিতেও কম যায়নি এই দু’দল।

১৯৯০ এর বিশ্বকাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচে ৩ ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে ডিয়েগো ম্যারাডোনার পাসে গোল করলেন ক্লডিও ক্যানিজিয়া। ওই গোলেই স্বপ্নভঙ্গ হয় ব্রাজিলের।

ব্রাজিলের বিদায়ের চাইতেও সেই ম্যাচটি বেশী আলোচিত দ্য হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল নামে। সেদিন ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার ফ্র্যাঙ্কো খুব কড়া মার্কিংয়ে রেখেছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনাকে। ম্যাচের বিরতিতে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় পেদ্রো থ্রলিগো আহত হওয়ায় ফিজিও এসে তার সেবা করছিলেন। সেই ফাঁকে ফ্র্যাঙ্কো আর্জেন্টিনার ফিজিওর কাছ থেকে এক বোতল পানি নিয়েছিলেন। ফ্র্যাঙ্কোর দাবি অনুযায়ী সেই পানি পান করার পর থেকে তার শরীর অসার হতে থাকে, সামনের সবকিছু দেখতে থাকেন ঘোলাটে। আর তার এই দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোল আদায় করে আর্জেন্টিনা। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনা এক ইন্টারভিউতে স্বীকার করেছিলেন যে ফ্র্যাঙ্কোকে দেয়া পানিতে মেশানো ছিল ট্র্যাঙ্ক্যুলাইজার ড্রাগ। যদিও আর্জেন্টাইন ফুটবল এসোসিয়েশন কখনোই এই স্ক্যান্ডালের দায় নেয়নি।

ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাটলে জানা যায় দুদেশের মধ্যে সিসপ্ল্যাটাইনের যুদ্ধের ব্যাপারে। তখন আর্জেন্টিনার নাম ছিল রিও ডে লা প্লাতা আর ব্রাজিলের নাম ছিল এম্পায়ার অফ ব্রাজিল। সিসপ্ল্যাটাইন ভূখন্ড নিয়ে ১৮২৫ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ চলেছিল ২ বছর ৮ মাস। পরবর্তীতে ব্রিটিশ এবং ফরাসিদের মধ্যস্ততায় এই যুদ্ধের অবসান হয় এবং সেই ভূখন্ডে ইস্টার্ন রিপাবলিক অফ উরুগুয়ে নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয় ।

ময়দানি সেই সমরের প্রতিধ্বনি পাওয়া গেছে ফুটবলের মাঠেও। আর্জেন্টিনার মাঠে ১৯২৫ সালের ক্রিসমাস ডেতে দু দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে একটি ফাউলকে কেন্দ্র করে লাথি ঘুষিতে জড়ান দু’দলের ফুটবলাররা। তারপর এই সংঘর্ষ ছড়িয়ে যায় মাঠে উপস্থিত ৩০ হাজার দর্শকদের মধ্যেও। ২-২ গোলে ড্র হওয়া সেই ম্যাচের পর টানা ১১ বছর ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কেউ কারো সাথে কোন ম্যাচ খেলেনি।

১৯৩৭ সালে সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার দর্শকরা ব্রাজিলিয়ানদের উদ্দেশ্যে বর্ণবাদী মন্তব্য ছুঁড়তে থাকে। সেই ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনার একটি গোলের প্রতিবাদস্বরূপ এবং নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে শেষ বাঁশি বাজার আগেই মাঠ ত্যাগ করে ব্রাজিল। ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যম এই ম্যাচকে নাম দিয়েছিল জোগো দ্য ভারগোনহা বা লজ্জার ম্যাচ নামে।

১৯৩৯ সালের কোপা আমেরিকা ছিল আরেক কাঠি সরেস। যেখানে ফাঁকা পোস্টে গোলকিপার ছাড়াই ব্রাজিল একটি পেনাল্টি নিয়েছিল। কারণ সেই পেনাল্টির সিদ্ধান্ত পছন্দ না হওয়ায় পুরো দল নিয়ে মাঠ ত্যাগ করেছিল আর্জেন্টিনা।

তবে সব ঘটনাকে হার মানিয়েছিল ১৯৪৬ সালের সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশীপ। হাই ইন্টেনসিটির সেই ম্যাচের ২৮তম মিনিটে ব্রাজিলের রোজা পিন্টো আর্জেন্টিনার ক্যাপ্টেন হোসে সলমনের টিবিও ফিবুলা ভেঙে দেন। শুরু হয় দু’দলের খেলোয়াড়দের মারামারি। অবস্থার এতটাই অবনতি হয় যে পুলিশকে এসে সেই মারামারি থামাতে হয়। এই ম্যাচের পর হোসে সলমন আর কোনোদিন ফুটবল খেলতে পারেননি, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাও পরবর্তী ১০ বছর কেউ কারো মুখোমুখি হয়নি।

ঐতিহ্যগতভাবে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার এই দ্বৈরথের ছাপ আছে হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশেও। পেলে-ম্যারাডোনা, রোনালদো-বাতিস্তুতা কিংবা হালের মেসি-নেইমার; ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচের উত্তাপ কমেনি একটুও। ইউরোপিয়ান ফুটবলের প্রশংসা সবার মুখেই, কিন্তু ফুটবলের আসল ঝাঁজটা যে ওই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাতেই।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »