Ultimate magazine theme for WordPress.

বাবা-মা-বোনকে একসংগে হত্যা: স্বীকারোক্তিতে ‘মিথ্যা বলেছেন’ মেহজাবিন

0

ক্রাইম টিভি বাংলা অনলাইন ডেস্ক…রাজধানীর কদমতলীতে ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় গ্রেফতার মেহজাবিন মুন পুলিশের রিমান্ড শেষে আদালতকে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, তার বাবা মাসুদ রানা (৫০) প্রবাসে থাকায় তার মা মৌসুমী ইসলাম (৪০) অনৈতিক কাজ করতেন। সে কাজে তাদের দু’বোনকেও জড়াতে বাধ্য করেছিলেন তিনি। বাবা বিষয়টি জেনেও কোনো বিচার করেননি। সেই সংগে ছোট বোন জান্নাতুল ইসলাম মোহিনী (২০) তার স্বামী শফিকুলকে ভাগিয়ে নিতে চেয়েছিলো। এসব নিয়ে তাদের তিনজনের প্রতি জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন তিনি।
আদালতকে দেওয়া মেহজাবিন মুনের এই জবানবন্দিকে মিথ্যা বলে দাবি করেছেন তার স্বজনরা। স্বজনদের দাবি, মেহজাবিন আদালতকে যে জবানবন্দি দিয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। নিজেকে ও স্বামীকে বাঁচাতেই তিনি এমন জবানবন্দি দিয়েছেন আদালতকে। এজন্য রিমান্ডের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মেহজাবিনের স্বজনরা।
গত ১৯ জুন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ এ ফোন দিয়ে ঘাতক মেহজাবিন মুন পুলিশকে বলে, তিনজনকে খুন করছি, তাড়াতাড়ি না এলে আরও দু’জনকে খুন করবো’। এ তথ্য পেয়েই কদমতলী মুরাদনগর এলাকার স্কুল রোডের একটি বাসা থেকে তার মা-বাবা ও ছোটবোনের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সেই সংগে এই ঘটনায় আত্মস্বীকৃত খুনি মেহজাবিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
গ্রেফতারের পর ৪ দিনের রিমান্ডে বেশ কিছু তথ্য দেয় মেহজাবিন মুন। রিমান্ডে মেহজাবিন পুলিশকে জানায়, বিয়ের আগে আমিনুল ইসলাম নামের এক যুবক মেহজাবিন মুনকে প্রাইভেট পড়াতো। এ সময় ছাত্রীর সংগে তার প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে ওই গৃহশিক্ষক ছাত্রীর মা মৌসুমীর সংগেও অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। দু’জনের সংগে অন্তরংগ সম্পর্কের ভিডিও করে রেখেছিলো আমিনুল। পরে আমিনুল ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে মা-মেয়েকে জিম্মি করে অনৈতিক সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলো। এমনকি সে মেহজাবিনের ছোট বোন জান্নাতুল ও তার অপর এক আত্মীয়ের সংগেও অনৈতিক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এই বহুমুখী জটিলতাপূর্ণ সম্পর্কের একপর্যায়ে মেহজাবিন মুনকে শফিকুলের সংগে বিয়ে দেন তার মা মৌসুমী। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আমিনুল তার সংগে অন্তরাংগ মুহূর্তের ভিডিও মেহজাবিনের স্বামীকে দেখায়। এতে তাদের দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। অন্যদিকে মৌসুমীও তখন আমিনুলের ওপর চরম বিরক্ত। তাই শেষ পর্যন্ত শফিকুল, মৌসুমী ও তার এক বোন মিলে আমিনুলকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে। ওই ঘটনায় মেহজাবিন, তার বোন ও মা ৬ মাস জেলও খাটেন।
রিমান্ডে মেহজাবিন আরও জানায়, পড়ালেখায় তিনি ভালো ছিলেন। এসএসসি পরীক্ষায় তার জিপিএ ৫ পাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তার মা আগেই তাদের দুই বোনকে দেহ ব্যবসার মতো অসামাজিক কার্যকলাপে যুক্ত হতে বাধ্য করেছিলো। তার দাবি, তার মা পরীক্ষা চলাকালেও তাকে ছাড় দেয়নি অনৈতিক কাজ থেকে। এ কারণে এসএসসিতে জিপিএ ৫ না পেলেও সে জিপিএ ৪.৮ পেয়েছেন।
মেহজাবিনের দাবি, কৈশোরে অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িত করায় তিনি মায়ের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। অন্যদিকে তার বাবা মাসুদ রানা প্রবাসে আরেকটি বিয়ে করেছেন। তাই তাদের দুই বোনের ব্যাপারে তিনি কোনো মনোযোগ দেননি। মায়ের নির্যাতন থেকে মেয়েদের বাঁচাতে বাবার কোনো ভূমিকা না থাকায় তার প্রতিও ক্ষোভ জমেছিলো তার। অন্যদিকে ছোট বোন জান্নাতুল ইসলাম মোহিনীর সংগে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তার স্বামী শফিকুল ইসলাম। এতে সংসার ভাঙার উপক্রম হওয়ায় ছোট বোনকেও দুনিয়া থেকে সরানোর পরিকল্পনা করেন মেহজাবিন মুন। সে অনুযায়ী দুই মাস আগে প্রথমবার তিনি মা-বাবা-বোনকে হত্যার চেষ্টা চালান। সেদিন মা ও বোন ঘুমের ওষুধ মেশানো পানি খেয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। তবে ভায়াবেটিস রোগী হওয়ায় খেতে রাজি হননি বাবা মাসুদ। ফলে পরিকল্পনা সফল হয়নি। তাই ওই ঘটনার পর মেহজাবিন সিদ্ধান্ত নেন, এত অল্প মাত্রার ওষুধে কাজ হবে না। হত্যা করতে হলে মাত্রা বাড়িয়ে দিতে হবে। এই কারণে তিনি শুক্রবার (১৮ জুন) দুই মিলিগ্রাম মাত্রার ৪০টি ডিজেওপেন ট্যাবলেট (ঘুমের ওষুধ) গুঁড়া কফির সংগে মেশান। এরপর তা সবাইকে খাওয়ান।
রিমান্ডে বলা এসব কথা বৃহস্পতিবার আদালতে ১৬৪ ধারা জবানবন্দিতেও বলেছেন মেহজাবিন।
ডিএমপি’র ওয়ারি বিভাগের উপকমিশনার শাহ ইফতেখার আহমেদ মেহজাবিনের জবানবন্দির বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, রিমান্ডে জানিয়েছে মায়ের অনৈতিক কাজে জড়ানো, বাবার কাছে বিচার দিয়েও বিচার না পাওয়া এবং স্বামীর সংগে বোনের অনৈতিক সম্পর্ক থেকেই তাদেরকে হত্যার করেছে। সেসব কথা জবানবন্দিতেও বলেছে মেহজাবিন। আদালত জবানবন্দি নেওয়ার পর তাকে কেরানীগঞ্জ কারাগারে পাঠিয়েছে।
তিনি বলেন, তবে এই ঘটনায় রিমান্ডে থাকা অপর আসামি মেহজাবিনের স্বামী শফিকুলের জড়িত থাকার বিষয়ে সাক্ষী-প্রমাণ মেলেনি।
এর আগে, গত ২১ জুন রিমান্ডে মেহজাবিনের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে উপকমিশনার ইফতেখার আহমেদ বলেছিলেন, বাবা দেশে না থাকায় মেহজাবিনের মা তাকে এবং তার ছোট বোনকে (নিহত জান্নাতুল) দিয়ে দেহ ব্যবসা করাতো। এসব নিয়ে প্রতিবাদও করেছিলো সে, কিন্তু কোনো ফল হয়নি। তার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ছোট বোনকে দিয়ে এই ব্যবসা চলছিলো। এর মধ্যে তার স্বামী ছোট বোনের সংগে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এ ছাড়া মেহজাবিনের বাবা মাসুদ রানা ওমানে আরেকটি বিয়ে করেছেন। এসব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ থেকে পরিবারের সবাইকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে মেহজাবিন পুলিশকে জানিয়েছেন।
তবে মেহজাবিন রিমান্ড যে তথ্য দিয়েছেন এবং আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং কল্প-কাহিনী বলে দাবি করেছেন তার আপন খালা জেসমিন আক্তার। তিনি বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, মেহজাবিন রিমান্ডে এবং আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে যেসব তথ্য দিয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তার কথার কোনো ভিত্তিই নেই।
তিনি বলেন, মেহজাবিন তার স্বামীকে বাঁচাতে এবং আমার বোন ও দুলাভাইয়ের অর্জিত সম্পত্তি ভোগ করতে এসব বানায়োট মিথ্যা গল্প সাজিয়েছে। কারণ এই হত্যাকাণ্ডে তার স্বামীও জড়িত। কিন্তু সে তার স্বামী জড়িত নয় বলে দাবি করছে। এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
মেহজাবিনদের পারিবারিক কলহের ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, মেহজাবিন যখন তার প্রাইভেট টিচারের সংগে অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যায় তখন তার মা এটা থেকে মেহজাবিনকে ফিরিয়ে আনতে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু শফিকুলের সংগে মেহজাবিনের বিয়ে দেওয়া ছিলো আমার বোনের ভুল সিদ্ধান্ত। কে জানতো এ শফিকুলই আমার বোনের সাজানো সুখের সংসারটি ধ্বংস করে দিবে!
তিনি বলেন, বিয়ের পর শফিকুলের নজর পড়ে তার শ্যালিকা মোহিনীর দিকে। এজন্য সে মোহিনীকে কিডন্যাপ করে অজানা স্থানে নিয়ে জোরপূর্বক অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে তার ভিডিও ধারণ করে রাখে। এরপর সে ভিডিওর ভয় দেখিয়ে প্রায় সময় মোহিনীর সংগে অনৈতিক কাজ করতো। ওই ভিডিও’র ভয় দেখিয়ে মোহিনীকে তার বাসায় রাখতো শফিকুল। এক পর্যায়ে বিষয়টি মেহজাবিনের মা জেনে যাওয়ায় মামলা করেছিলো। এই মামলার পর ভিডিওর ভয় দেখিয়ে মোহিনীকে মিথ্যা কথা শিখিয়ে মায়ের বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষী দেওয়ায় শফিকুল।
তিনি বলেন, সে সময় আদালতকে মোহিনী বলেছিলো তার মা তাকে নির্যাতন করে। তখন তার মা আদালতকে বলেছিলো, আমি যদি আমার মেয়েকে নির্যাতন করি তাহলে আমার মেয়েকে আপনাদের জিম্মায় রাখুন। তবুও শফিকুলের কাছে রাখা যাবে না। তখন আদালত মোহিনীকে গাজীপুর কিশোর সংশোধনাগারে রাখার নির্দেশ দেন। প্রায় ছয় মাস সেখানে থাকার পর কৌশলে শফিকুল ফের মোহিনীকে বের করে এনে প্রায় ১০ মাস তার কাছে রাখে। এরপর বিষয়টি আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সবাই জেনে যায়। পরে মোহিনীকে অন্য জায়গায় বিয়ে দেওয়ার জন্য ছেলে খুঁজতে থাকে তার মা। কিন্তু শফিকুল সব জায়গায় বলে বেড়াতো সে মোহিনীকে বিয়ে করেছে। তাকে অন্য কোথাও বিয়ে দেওয়া যাবে না। এসবে বাধা দেওয়ায় তার মা-বাবা ও বোনকে খুন করেছে শফিকুল ও তার স্ত্রী মেহজাবিন।
তিনি বলেন, শফিকুল ও তার স্ত্রী মেহজাবিন বাবার সম্পত্তির ভাগ চেয়েছিলো একাধিকবার। কিন্তু তার বাবা দিতে রাজী হয়নি। বলেছিলো, শফিকুল খুনি। তাকে কোনো সম্পত্তি দেওয়া হবে না। এছাড়া মেহজাবিন আমার দুলাভাইয়ের বিরুদ্ধে যে তথ্য দিয়েছে- তিনি বিদেশে বিয়ে করেছেন। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্য। সে যদি আরেক বিয়ে করতো তাহলে তার ন্যূনতম প্রমাণ এতোদিনেও কেন পাওয়া যায়নি। তাছাড়া আমার বোনও তো কখনও বলেনি এমন কথা।
তিনি বলেন, মেহজাবিনের কথায় স্পষ্ট যে, সে সব কথা বানিয়ে বলছে। আমাদের ধারণা সে স্বামীর ভয়ে এসব বলছে। তাই আমরা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। পাশাপাশি তাদের দু’জনের ফাঁসির দাবি করছি। শুধু তাই নয়, রিমান্ডে যথাযথোভাবে মেহজাবিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বলেও অভিযোগ তার।

সুত্র – বাংলা ভিশন

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »