Ultimate magazine theme for WordPress.

মা-বাবার সম্পদে মেয়ের অধিকার কতটুকু

0

ক্রাইম টিভি বাংলা অনলাইন ডেস্ক…ইসলামপূর্ব যুগে মৃতের পরিত্যক্ত সম্পত্তি বণ্টনের নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা ছিল না। পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে শক্তিশালী ও প্রভাবশালীদের একচ্ছত্র অধিকার বলে মনে করা হতো। নারী ও শিশুদের সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত করা হতো। বিভিন্ন ধর্মও নারীকে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছে। বাবার সম্পত্তিতে একমাত্র ছেলেই সম্পত্তির মালিক বলে মনে করে। কেননা, নারীরা ঘোড়ায় চড়তে পারে না, বোঝা বইতে পারে না, অন্যের উপকার করতে পারে না, শত্রুকে আঘাত করতে পারে না এবং তাদের ব্যয়ভার অন্যকে বহন করতে হয়। তারা কিছু উপার্জন করতে পারে না। (তারাবি) সত্য ও ন্যায়ের ধর্ম ইসলাম এ অন্যায়ের বিলোপসাধন করেছে এবং পরিত্যক্ত সম্পত্তি বণ্টনের এক ইসাফপূর্ণ ও জনহিতকর নীতিমালা দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সহিহ বুখারি ও মুসলিম শরিফে হজরত জাবির রা:-এর সূত্রে উদ্ধৃত হয়েছে যে, একদা হজরত সাদ ইবনে ররাবির স্ত্রী মহানবী সা:-এর কাছে দু’টি মেয়েসহ উপস্থিত হয়ে আরজ করেন- হে আল্লাহর রাসূল! সাদ ইবনে ররাবি উহুদের যুদ্ধে আপনার সাথে শরিক হয়ে শহীদ হয়েছেন। এই দুটি তার মেয়ে। এদের চাচা সাদের সমস্ত সম্পত্তি দখল করেছে। এদের জন্য কিছুই রাখেনি। অথচ অর্থকড়ি ছাড়া এদের বিয়ে দেয়াও সমস্যা হয়ে যাবে। মহানবী সা: বলেন, ‘এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা সিদ্ধান্ত দেবেন। অতপর আল্লাহ তায়ালা উত্তরাধিকার-বিষয়ক আয়াত নাজিল করেন। বাবা-মা ও আত্মীয় স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে। তা কম হোক বা বেশি হোক, এক নির্ধারিত অংশ (সূরা নিসা-৭) এ বণ্টন কিভাবে হবে? কে কতটুকু অংশ পাবে?

আল্লাহ তায়ালা এর বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন সূরা নিসার ১১ ও ১২ নং আয়াতে। ইরশাদ হচ্ছে- আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্বন্ধে নির্দেশ দিয়েছেন- এক ছেলের অংশ দুই মেয়ের অংশের সমান। কিন্তু মেয়ে দু’য়ের অধিক হলে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই তৃতীয়াংশ, আর মেয়ে একজন থাকলে তার জন্য অর্ধাংশ। তার সন্তান থাকলে মা-বাবা প্রত্যেকের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক ষষ্ঠাংশ, আর নিঃসন্তান হলে এবং মা-বাবা উত্তরাধিকারী হলে তার মায়ের জন্য এক তৃতীয়াংশ। তার ভাই-বোন থাকলে মায়ের জন্য এক ষষ্ঠাংশ, এ সবই সে যা অসিয়ত করে তা দেয়ার এবং ঋণ পরিশোধের পর। তোমার বাবা ও সন্তানদের মধ্যে উপকারে কে তোমাদের নিকটতর তা তোমরা জানো না। এটা আল্লাহর বিধান। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। আর তোমাদের স্ত্রীদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধাংশ তোমাদের স্বামীদের জন্য, যদি তাদের কোনো সন্তান না থাকে। তাদের সন্তান থাকলে তোমাদের স্বামীদের জন্য তাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ। তাদের কৃত অসিয়ত পালন এবং ঋণ পরিশোধের পর। আর তাদের জন্য তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক চতুর্থাংশ যদি তোমাদের কোনো সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্য তোমাদের পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক অষ্টমাংশ তোমরা যা অসিয়ত করবে তা দেয়ার এবং ঋণ পরিশোধের পর। যে পুরুষ বা নারীর মিরাস বণ্টন করা হবে, সে যদি মা-বাবা ও সন্তানহীন হয় এবং তার এক ভাই কিংবা এক বোন থাকে, তবে উভয়ের প্রত্যেকের জন্য এক ষষ্ঠাংশ। আর তারা একের অধিক হলে এক তৃতীয়াংশে অংশীদার হবে, কৃত অসিয়ত পূরণ এবং ঋণ পরিশোধের পর, কারো কোনো ক্ষতি করা ছাড়া। এটা আল্লাহর নির্দেশ এবং আল্লাহই সর্বজ্ঞ সহনশীল। (সূরা আন-নিসা : ১১-১২)

উত্তরাধিকার আইন আল্লাহ প্রদত্ত : ইসলামের উত্তরাধিকার আইন সরাসরি মহা ক্ষমতাধর আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক প্রদত্ত। ফলে তা অগ্রাহ্য করার কোনো অধিকার নেই। প্রাক-ইসলামী আরবে শিশু, নারী ও কন্যা সন্তানদেরকে মিরাসের অংশ দেয়া হতো না। বর্তমান আধুনিককালেও কোনো কোনো অমুসলিম সম্প্রদায়ে কন্যা সন্তানের উত্তরাধিকার স্বীকৃত নয়। ইসলাম শিশু, নারী, কন্যা এবং মৃত ব্যক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকেই উত্তরাধিকারের অন্তর্ভুক্ত করেছে। যারা কারো অধিকার থেকে বঞ্চিত করল, ওরা যেন উত্তরাধিকার আইনকে অমান্য করল। কেননা, আল্লাহ তায়ালা অংশের আলোচনা পর বলেছেন, এগুলো আল্লাহর নির্ধারিতসীমা। যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশমতে চলে, তিনি তাকে জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্র্রোতস্বিনী প্রবাহিত হবে। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এ হলো বিরাট সাফল্য। আর যে কেউ আল্লাহ ও রাসূলেরঅবাধ্যতা করে এবং তার সীমা অতিক্রম করে তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সে সেখানে চিরকাল থাকবে। তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। (সূরা আন-নিসা : ১৩-১৪) উত্তরাধিকার সংক্রান্ত আইন, ইয়াতিমের হক ও অসিয়ত আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত সীমারেখার অন্তর্ভুক্ত।

মেয়েকে বঞ্চিত করা : বাবা-মায়ের সম্পদে ছেলে যেমন হকদার; মেয়েও অনুরূপ হকদার। আল্লাহর বিধানমতে মেয়ে পাবে ছেলের অর্ধেক। অনেক বাবা-মাকে এই অংশটুকুও দেন না। বাবা-মায়ের সমুদয় সম্পদ ছেলেদের দিয়ে মেয়েদের বঞ্চিত করেন। বাবা-মা তাদেরকে কিছু না দেয়ার কারণে বাবা-মায়ের সম্পদ থেকে তারা বঞ্চিত হয়। আর এ কারণে অনেক মেয়ে সন্তান বাবা-মাকে ভালো দৃষ্টিতে দেখে না। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর মেয়েদের খোঁজ-খবর কেউ নেয় না। যারা মেয়ে সন্তানকে তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তারা সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে। যারা আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করল তাদের শাস্তি ভয়াবহ। অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার চেয়ে আত্মীয়ের সম্পদ গ্রাস করার শাস্তি দ্বিগুণ হবে।

কেননা, সে একদিক দিয়ে সম্পদ গ্রাস করল, অপরদিক দিয়ে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করল। মহানবী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কারো উত্তরাধিকার হরণ করে, আল্লøাহ তায়ালা তার জান্নাতের উত্তরাধিকার হরণ করবেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ) রাসূলুল্লাহ সা: আরো বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেকের জন্য তার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছেন। সুতরাং কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত করা যাবে না। (জামে তিরমিজি) মোদ্দা কথা! মেয়েকে সম্পদ থেকে বঞ্চিত করা মহাপাপ। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদেরকে এ পাপ থেকে রক্ষা করেন।

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »