Ultimate magazine theme for WordPress.

মিশর (ইজিপ্ট) : এক রহস্যময় দেশ ও তার রোমাঞ্চকর ইতিহাস

0

ক্রাইম টিভি বাংলা অনলাইন ডেস্ক…রাষ্ট্রীয় নাম: আরব রিপাবলিক অব ইজিপ্ট। সীমানা: উত্তর ভূমধ্যসাগর, পূর্বে ইসরাঈল, দক্ষিণে সুদান এবং পশ্চিমে লিবিয়া। আয়তন : ৯৯৭, ৭৩৮ বর্গকিমি। লােকসংখ্যা : ৬ কোটি ৪৭ লক্ষ (প্রায়)। ভাষা : মূলত আরবী ও ইংরেজি; তবে ফরাসীও ব্যাপকভাবে প্রচলিত। মুদ্রা : পিয়াস্ত্রা, মিসরীয় পাউণ্ড। [এক পাউণ্ডে প্রায় ৩ ডলার! সাপ্তাহিক ছুটি : শুক্রবার। জাতীয় দিবস : ৬ অক্টোবর। ধর্ম : ইসলাম (সুন্নি ৯০%, কপ্টিক খ্রিস্টান ১০%]। রাজধানী : কায়েরাে। প্রধান শহর : আলেকজান্দ্রিয়া, ইসমাঈলিয়া, পাের্ট সঈদ, মনসুরা প্রভৃতি। প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় : আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রাে বিশ্ববিদ্যালয়। সংবাদপত্র : আল-আহরাম, আল-আখবার, আলজামহুরিয়া [আরবী], ইজিপশিয়ান গেজেট [ইংরেজি], জর্নাল দ্য ইজিপ্ট, প্রগ্রেস ইজিপশিয়ান [ফিরাসী]। রাজনৈতিক দল : ন্যাশনাল ডেমােক্র্যাটিক পার্টি, সােশ্যালিস্ট ওয়াকার পার্টি সিরকার বিরােধী দল], লিবারেল সােশ্যালিস্ট পার্টি, ইউনিয়নিস্ট প্রােগ্রেসিভ পার্টি।

ভূপ্রকৃতিঃ মিশরের ভূ-প্রকৃতির সিংহভাগই মরুভূমি, মালভূমি ও নিম্নভূমি সমন্বিত। নীলনদ ও লােহিত সাগরের মধ্যভাগে আরব মরুভূমি অবস্থিত। এ অঞ্চলে ৪ হাজার থেকে ৭ হাজার ফুট উচ্চতাসম্পন্ন কয়েকটি পর্বতশ্রেণী রয়েছে। গৃহ নির্মাণােপযােগী পাথর ও কিছু খনিজ তেল এখানে পাওয়া যায়। নিম্নভূমিই মিশরের ৯৭% এলাকা দখল করে আছে। বাকী ৩% অঞ্চল নিয়ে নীল অববাহিকা ও ব-দ্বীপ। এ ব-দ্বীপ এলাকার বিস্তৃতি কোথাও ১৫০ মাইল, কোথাও ২২৫ গজ মাত্র। বন্যাবাহিত পলিমাটির জন্য এ এলাকা অত্যন্ত উর্বর এবং কৃষিপ্রধান দেশ মিশরের একমাত্র কৃষি অঞ্চল।

জলবায়ুঃ মিশরের জলবায়ু মূলত শুষ্ক। উত্তর উপকূলে বার্ষিক ৮ ইঞ্চি পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। কায়রাে ও এর সন্নিহিত এলাকায় এ পরিমাণ মাত্র ১ ইঞ্চি। অধিকাংশ বৃষ্টিপাত শীতকালে হয়ে থাকে। আকস্মিক বৃষ্টিপাতের ফলে কখনাে কখনাে স্বল্পস্থায়ী বন্যা হয়ে থাকে। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল ‘খামসিন’ নামক ভয়ঙ্কর ধূলিঝড় প্রবাহিত হয়।

কৃষিঃ নীল ব-দ্বীপ এলাকায় উৎপন্ন মিশরের প্রধান কৃষি-ফসল কাপাস। দ্বিতীয় অর্থকরী ফসলের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন আখ। এছাড়া গম, যব, বালি, খেজুর প্রভৃতি ফসলও মিশরে উৎপাদিত হয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে, মিশরের কৃষকদের প্রত্যেককেই নিজস্ব জমির ৩০% অংশে কার্পাস এবং ৩৩% অংশে গমের চাষ করতে হয়।

খনিজ ফসলঃ মিশরের প্রধান খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে ফসফেট, ম্যাঙ্গানীজ, খনিজ তেল, লৌহ আকরিক ও চুনাপাথর। খনিজ তেলের দিক দিয়ে মিশর স্বয়ংসম্পূর্ণ।

যাতায়াত ব্যবস্থাঃ মিশরে অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থার প্রধান মাধ্যম রেলপথ। ১৮৫১ সালে এ-দেশে প্রথম রেলপথ স্থাপিত হয়। বর্তমানে মিশরে ৪ হাজার মাইলেরও বেশি দীর্ঘ রেলপথ রয়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থায় এর পরেই গুরুত্ব লাভ করেছে নদীপথ। ভূ-প্রকৃতির কারণে মিশরে সড়ক, পথ নির্মাণের কাজ ততটা অগ্রসর হয়নি।

শিল্পঃ মিশর আফ্রিকার মধ্যে দ্বিতীয় বৃহৎ শিল্পোন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত। মােট জাতীয় উৎপাদনের ২৫% আসে শিল্প থেকে। প্রধান উল্লেখযােগ্য শিল্পের মধ্যে রয়েছে কার্পাস, বয়ন ও বস্ত্রশিল্প, লৌহ ও ইস্পাত, চিনি, সার-কারখানা, সিমেন্ট শিল্প প্রভৃতি।

রফতানীঃ তুলা ও তুলাজাত দ্রব্য মিশরের প্রধান রফতানী পণ্য। এছাড়া পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য, চিনি, সিমেন্ট, সার, ম্যাঙ্গানীজ প্রভৃতি রফতানী করা হয়ে থাকে।

আমদানীঃ কল-কব্জা ও যন্ত্রপাতি, গম, কাগজ, কাঠ, লৌহ ও ইস্পাত, ঔষধ, পাটজাত দ্রব্য, চা, রাসায়নিক দ্রব্য প্রভৃতি মিশরের আমদানী পণ্য-তালিকার অন্তর্ভুক্ত।

মুসলিম আমলের উল্লেখযােগ্য প্রাচীন কীর্তি

১. মিশর-বিজয়ী মুসলিম সেনাপতি আমর ইবন আ-আসা কর্তৃক ৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত আমর আল ফুসতাত মসজিদ। এ মসজিদটি আফ্রিকা মহাদেশের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ। ২. আহমদ ইবন তুলুন কর্তৃক ৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত মসজিদ। ৩. জ্ঞানচর্চার জন্য প্রতিষ্ঠিত আন্-আযহার মসজিদ (৯৭০-৭২) যা পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ লাভ করে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছে।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

আজ থেকে দুই হাজার তিনশাে বছর আগে গ্রীক ভূগােলবিদ হিরোডটাস মিশরকে অভিহিত করেছিলেন ‘নীলনদের দান’ বলে। আবহমানকাল থেকে বয়ে চলা এই নীলের স্বচ্ছ সুনীল সঞ্জীবনী স্রোতােধারায় আজও স্নাত হয়ে চলেছে পুরনাে সভ্যতার পরিচয়বাহী দেশ ইজিপ্ট বা মিশর। ঐতিহাসিকদের মতে, পৃথিবীর মধ্যে – মিশরই একমাত্র দেশ যেখানে ছয় হাজার বছরের পুরনাে ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায়। আর এই ইতিহাস ফারাও এবং টলেমী, পিরামিড এবং মামলুকদের ইতিহাস।

তবে মুশকিলের ব্যাপার এই যে, এই ইতিহাসের আনুপূর্বিক বা একটানা বিবরণ পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ফারাও যুগ থেকে গ্রীক যুগে উত্তরণের অবিচ্ছিন্ন ইতিহাস যেমন পাওয়া যায়নি, তেমনি পাওয়া যায়নি রােমান যুগ থেকে ইসলামী যুগে উত্তরণের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস। যতদূর জানা যায়, সুপ্রাচীন কালে নীল উপত্যকা ছিল সেমিটিক জনগােষ্ঠীর আবাসভূমি। নীল নদের তীরে উৎপন্ন নলখাগড়া থেকে তারা প্যাপিরাস নামক কাগজ তৈরি করত। এই কাগজ ব্যবহার করা হত তৎকালে প্রচলিত হায়ারােগ্লিফিক বা চিত্রলেখ পদ্ধতিতে জ্ঞানচর্চার কাজে।

হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্মের চার থেকে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে মিশরে ফারাও বা ফেরাউনের শাসন চালু ছিল। তাদের রাজত্বকালে তৈরি পিরামিড এবং মমি সেকালের শিল্প-সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে এ-কালে এখনাে বিস্ময় উদ্রেককর কীর্তি হিসেবে পরিদৃশ্যমান। পবিত্র কুরআনে হযরত মূসা (আঃ) প্রসঙ্গে ফেরাউন এবং তার অত্যাচারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই ফেরাউন বংশের ৩১তম রাজার শাসন। কালে ৩৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রীক বীর আলেকজান্ডার মিশরে আক্রমণ ও অধিকার করেন। মিশরে গ্রীক রাজশক্তির আধিপত্য কায়েম হয়। এই ঘটনার নয় বছর পর। আলেকজান্ডারের মৃত্যু হলে তার তিন সেনাপতি বিশাল গ্রীক সাম্রাজ্যকে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেন। মিশর পড়ে সেনাপতি টলেমীর ভাগে। তিনি নৌবন্দর আলেকজান্দ্রিয়াতে তার রাজধানী স্থাপন করেন। একটি পাবলিক লাইব্রেরি ও একটি মিউজিয়ামও এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়। আলেকজান্দ্রিয়া অবিলম্বেই গ্রীক সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় এথেন্সে পরিণত হয়। সরকারি কাজকর্ম ও সংস্কৃতির একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে গ্রীক ভাষা। সর্বপ্রকার দর্শন, ধর্ম এবং বিজ্ঞানের শিক্ষা ও চর্চাকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক নগর হিসাবে আলেকজান্দ্রিয়া বিকশিত হয়ে ওঠে। স্বাধীন চিন্তাধারা ও অবাধ মত প্রকাশের মুক্তভূমি বলেও আলেকজান্দ্রিয়া তৎকালে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করে। কিন্তু এই অবস্থা খুব বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেনি। খ্রিস্টপূর্ব ৩০ অব্দে রােমানরা মিশর দখল করার পর এই উৎকর্ষমণ্ডিত নগরীর পতনের সূচনা হয় এবং বাইজানটাইন শাসকদের আমলেই এর মৃত্যুঘণ্টা বেজে উঠে।

মিশরে মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির আগমন ও বিকাশ লাভের পূর্বে মিসরীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে ফারাও এবং গ্রীকদের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। ফারাও যুগে চিত্রলেখ পদ্ধতিতে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা, পিরামিডের মতাে সুউচ্চ সমাধিসৌধের প্রতিষ্ঠা এবং মৃতদেহকে মমিকরণের মাধ্যমে হাজার হাজার বছর ধরে অবিকৃত রাখার সাফল্যের মধ্য দিয়ে তাদের শিক্ষা, স্থাপত্য ও চিকিৎসাবিদ্যায় দক্ষতার পরিচয়টিই। ফুটে ওঠে।

গ্রীক আমলে গ্রীসের বাইরে আলেকজান্দ্রিয়া হয়ে উঠেছিল তৎকালীন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান চর্চার দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র। এ যুগে সাহিত্যের চাইতে বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর উৎকর্ষতা পরিলক্ষিত হয়। জ্যামিতির জনক ইউক্লিড (খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ) আলেকজান্দ্রিয়াতে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং ‘ইলিমেন্টস অব জিওমেট্রি’-এর বিন্যাস সাধন করেন। অ্যারিস্টোটলের ছাত্র থিওফ্রাস্টাস এখানে তার জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা প্রদান করতেন। সামােস এর অ্যারিস্টারকাস (২৭০ খ্রিস্টপূর্ব) পৃথিবী থেকে চন্দ্র এবং সুর্যের দূরত্ব নির্ণয়ের প্রয়াস চালান। বিখ্যাত বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস (২৮৭২১২ খ্রিস্টপূর্ব) আলেকজান্দ্রিয়াতে পড়াশােনা করেন বলে জানা যায়। এখান থেকেই ভূগােলবিদ টলেমীর (খ্রিস্টপূর্ব ১৪০)ভূগােল গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। গ্যালেন (১৩০-২০০ খ্রিস্টপূর্ব) এখানকার শিক্ষাকেন্দ্রে বায়ােলজি এবং এনাটমি শিক্ষা করেন। এছাড়া বাজারে ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে গোঁড়া ধর্মতাত্ত্বিক, গ্রীক দার্শনিক, জোহরাস্ট্রিয়ান পুরােহিত, ইহুদী রাব্বি [শাস্ত্র ব্যাখ্যাতা], বৌদ্ধ ভিক্ষু-সবাই তাদের নিজ নিজ বিষয়ে খােলাখুলি আলাপ-আলােচনা করতে পারতেন। নসটিসিজম (খ্রিস্টানদের রহস্যবাদ), নিও পিথারিয়ানিজম এবং নিও প্লাটোনিজমের উদ্ভবও এই মিশরের মাটিতে বলেই জানা যায়।

মিশরে দীন-ই ইসলামের আবির্ভাবের ও বিকাশের শুরু সপ্তম শতাব্দীতে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর জীবদ্দশায় ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে মিশরের শাসক মুকাওকাস ইবন ইয়ামীনকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে একটি পত্র প্রেরণ করেন। হাতিব ইবন আবিবুল তা‘আ মদীনার দূত হিসেবে উক্ত পত্র নিয়ে ইয়ামীনের দরবারে পৌঁছান। ইয়ামীন দূতকে উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করেন, তবে ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি সুকৌশলে এড়িয়ে যান। দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রাঃ)-এর সময়ে মুসলিম সেনাপতি আমর ইবন আল-আস ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে রােমক শাসককে পরাজিত করে। মিশরকে মুসলিম শাসনাধীনে আনেন। মিশর আরবের একটি প্রদেশে পরিণত হয়। এ সময়ে আধুনিক কায়রাের নিকটবর্তী আল-ফুস্তাত নামক স্থানে নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয়। উমাইয়া এবং আব্বাসীয় শাসনের পর ৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মিশরে ফাতিমী খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। এ বংশের প্রথম শাসক জওহর আল-ফুতাতের পরিবর্তে আল কাহিরা বা কায়রােতে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। নতুন রাজধানীকে সুশােভিত করার জন্য চমৎকার প্রাসাদসমূহ নির্মিত হয়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ফাতিমী শাসন উচ্ছেদ করে মিশরের শাসনভার গ্রহণ করেন। তার সময়কাল মিশর এবং ইসলামের ইতিহাসেও অত্যন্ত উল্লেখযােগ্য হয়ে আছে। এ সময়েই তৃতীয় ক্রুসেড সংঘটিত হয়। সুলতান সালাহউদ্দীন ধর্মোন্মাদ খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করে পবিত্র জেরুজালেমের উপর মুসলিম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

ত্রয়ােদশ শতকে সুলতান সালাহউদ্দীন প্রতিষ্ঠিত আইয়ুবী বংশের অবসান ঘটে এবং মামলুক বংশ ক্ষমতা দখল করে। এরা প্রায় ৩০০ বছর মিশর শাসন করার পর যােড়শ শতকে তুর্কী সুলতান প্রথম সেলিম মিশর জয় করেন এবং মিশর উসমানী সাম্রাজ্যের অধীন একটি প্রদেশে পরিণত হয়। উনিশ শতকে নতুন মিশরের জন্মদাতা বলে আখ্যায়িত মুহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে মিশরে খেদিভ রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত আঠারাে শতকের একেবারে শেষভাগে ফরাসী সম্রাট নেপােলিয়নের মিশর অভিযান মিশরের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুলাই তিনি কায়রাে অধিকার করেন। নেপােলিয়ন নিজে মিশর ত্যাগ করেন ১৭৯৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। ১৮৫১ সালে ইংরেজদের সাথে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির – মাধ্যমে ফরাসী বাহিনী মিশর ত্যাগ করলে মিশরে স্বল্পস্থায়ী ফরাসী শাসনের অবসান ঘটে। স্বীকার্য যে, নেপােলিয়ানের এই মিশর অভিযান এক সুদূরপ্রসারী ফলাফলের সূচনা করে। রাজনৈতিকভাবে সমকালীন আধুনিক বিশ্বে মিশরের প্রতি সেই প্রথমবারের মতাে সকলের দৃষ্টি আকর্ষিত হয় এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যবর্তী অবস্থানের জন্য মিশরের কৌশলগত গুরুত্ব বৃহৎ শক্তিবর্গের কাছে বিশ্বব্যাপী প্রাধান বিস্তারের জন্য অত্যন্ত প্রয়ােজনীয় হয়ে ধরা পড়ে। অন্যদিকে এ অভিযানের ফলে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার উদ্দেশ্যে কায়রােতে ‘ইনস্টিটিউট দ্য ইজিপ্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন। ফরাসী পণ্ডিতগণ নেপােলিয়ানের নির্দেশে মিশরের ইতিহাস ও পুরাতত্ত সম্পর্কে গবেষণা ও সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। এরই ফল হিসেবে রচিত গ্রন্থ ‘ডিসক্রিপশন দ্য ল ইজিপ্ট’ আজো মিশরের ইতিহাস ও পুরাকীর্তি বিষয়ক একমাত্র বিশ্বস্ত গ্রন্থ হয়ে আছে। এম. শামপলিন নামক জনৈক পণ্ডিত ফরাসী আবিষ্কারাভিযানে উদ্ধারকৃত রােসেটা পাথরে উৎকীর্ণ চিত্রলেখের অর্থ উদ্ধার করেন। ফলে মিশরের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য আবিষ্কারের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়।

মুহাম্মদ আলীর অযােগ্য উত্তরসূরী ইবরাহীম পাশার সময় মিশর ইংরেজদের দখলে চলে যায়। ১৯২২ সালে অবস্থা ও আন্দোলনের চাপে বাধ্য হয়ে ইংরেজরা মিশরকে স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিলেও সেখানে রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করে যায়। শেষ রাজা ফারুকের সময় ১৯৪৮ সালে মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কর্তৃক সৃষ্ট ইসরাঈলের সাথে ফিলিস্তীন প্রশ্নে মিশরের যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং মিশর সহ আরব দেশগুলাে তাতে পরাজিত হয়। এ পরাজয় মিসরীয় বহু দেশপ্রেমিক সামরিক অফিসারকে ক্ষুব্ধ করে তােলে। ফলস্বরূপ ১৯৫২ সালে রাজা ফারুককে সামরিক অভ্যুত্থানে উৎখাত করা হয়। প্রথমে জেনারেল নগীব এবং কিছুকাল পরে কর্নেল নাসের মিশরের প্রেসিডেন্ট পদে ক্ষমতাসীন হন। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলে ইংরেজ ও ফরাসীরা মিশরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং শেষ পর্যন্ত এ খালের উপর মিশরের জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৭ সালে প্যালেস্টাইন প্রশ্নে, পুনরায় মিশর ইসরাঈল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মিশর ভীষণভাবে পরাজিত হয়। এরপর ১৯৭০ সালে আরব জাতীয়তাবাদের প্রতীক বলে আখ্যায়িত প্রেসিডেন্ট নাসেরের মৃত্যু হলে আনওয়ার সাদাত প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৭৩ সালে একই কারণে তৃতীয়বারের মতাে মিশর-ইসরাঈল যুদ্ধ বাধে। ইসরাঈলের সাথে যুদ্ধে শেষ দিকে বেশ কিছুটা বিপর্যয় সত্ত্বেও এবারই মিশর প্রথমবারের মতাে সাফল্য অর্জন করে। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট সাদাত ইসরাঈলের সাথে বন্ধুত্বমূলক ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি সম্পাদন করায় আরব বিশ্বসহ সমগ্র বিশ্ব থেকে সাদাত একঘরে ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আরব লীগ ও ইসলামী সংস্থা থেকে মিশরকে বহিষ্কার করা হয়। ১৯৮১ সালে সাদাত নিহত হলে প্রেসিডেন্ট হুসনী মুবারক তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি কিছুটা ভিন্ন নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে মিশরের সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। এরই ফলস্বরূপ ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে মরক্কোয় অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন – সংস্থার শীর্ষ বৈঠকে মিশরকে পুনরায় সংস্থার সদস্য করে নেওয়া হয়।

সপ্তম শতাব্দীতে মুসলমানগণ কর্তৃক মিশর বিজয় মিশরের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক সুদূরপ্রসারী ফলাফলের সূচনা করে। মুসলমানরা শুধুমাত্র একটি রাজ্য জয়ের উদ্দেশ্যেই মিশরে আগমন করেননি, তাঁরা সঙ্গে বয়ে এনেছিলেন পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধানভিত্তিক দীন ইসলাম এবং তার আদর্শ ও শিক্ষা। উল্লেখ্য যে, এ সময়ের অধিবাসীদের কাছে ইসলাম ধর্ম একটি সম্পূর্ণ নতুন ধর্মমত হিসাবে বিবেচিত হলেও ব্যাপারটি আসলে তা ছিল না। মূলত সুদূর অতীতকাল থেকেই আল্লাহ তাআলা প্রেরিত বিভিন্ন নবী বিভিন্ন সময়ে মিশরে আল্লাহর দীন প্রচার করে গিয়েছেন। এঁদের মধ্যে হযরত মূসা (আঃ), হযরত ইয়াকুব (আঃ), হযরত আইয়ুব (আঃ), হযরত ইউসুফ (আঃ) প্রমুখ নবীদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য। কিন্তু কালের পরিবর্তনে ও উপযুক্ত ধর্মীয় নেতৃত্বের অভাবে পরবর্তীকালের মিশরবাসীরা নবীদের প্রচারিত একত্ববাদ ও তাদের শিক্ষা এবং আদর্শ থেকে সম্পূর্ণ রূপে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। খ্রিস্টপূর্ব ৩০ অব্দে রােমানগণ কর্তৃক মিশর বিজয়ের একশাে বছরের মধ্যে প্রায় সমগ্র মিশরবাসী খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করে।

মুসলমানরা মিশর অধিকার করার পর এই অবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও উদারতার বাণী অন্য সব ক্ষেত্রের মতাে মিসরেও মুসলমানদের বিজয়ের পথকে সহজ করে দেয়। উল্লেখ্য, এ সময়ে মিশরের রােমক শাসকরা ধর্মমতের দিক দিয়ে ছিল বাইজানটাইন চার্চের অনুসারী। ফলে সংখ্যালঘু মিসরীয় কপ্টিক খ্রিস্টানরা তাদের অত্যাচারের শিকার হয় ও সবদিক দিয়েই ভীষণভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। শাসকদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত বৈরীভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। ইসলামে সকলের ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদানের উদারতায় তারা আকৃষ্ট হয় এবং মুসলিম অভিযানকে সর্বাত্মক সহযােগিতা প্রদানের মাধ্যমে এ বিজয়কে সহজসাধ্য করে তােলে। অবিলম্বেই দেশের তৎকালীন জনগােষ্ঠীর সিংহভাগ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। মুসলমানরা মিশরে একটি সুসংগঠিত সরকার এবং নতুন ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচলন করে। দেশের সর্বত্র অসংখ্য নতুন মসজিদ এবং জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। অতীতের সমস্ত আচার-আচরণ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মিশর একটি নতুন পরিবর্তনের স্রোতধারায় অবগাহন করে উঠে। এই প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক এ. জে. আরবেরীর কথা সমর্থন করে বলতে হয়, মুসলমানদের মিশর জয়ের ফলে এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা হয়। শুধুমাত্র নিরেট পাথরের তৈরি মূর্তি এবং কপ্টিক চার্চগুলাে ছাড়া আর কোনাে কিছুই পরিবর্তনের প্রবল জোয়ারের মুখে আত্মরক্ষা করতে পারেনি। উল্লেখ্য যে, হাজার বছরের কাল পরিক্রমায় মুসলিম তথা আরবীয় সাংস্কৃতির প্রভাবে মিশরের সংখ্যালঘিষ্ঠ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও এমনভাবে আরবীয় হয়ে পড়ে যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তাদের আর কোনাে অস্তিত্ব বজায় থাকেনি। বহুকাল পরে মিশরের ইংরেজ শাসক লর্ড ক্রোমার (১৮৮২-১৯০৭) মিশরে এসে মসজিদ এবং চার্চের মতাে দুটি ধর্মীয় স্থানে সমবেত হওয়া ছাড়া খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের মধ্যে কোনাে পার্থক্য খুঁজে পাননি।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মাত্র কিছুকাল পূর্বেও আফ্রিকা ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ’ বলে আখ্যায়িত করা হত। ইউরােপীয় অভিযানকারীদের কল বিগত শতকে আফ্রিকার সঙ্গে বহির্বিশ্বের সংযােগ সাধিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিশ্বের সব অংশ থেকে এ মহাদেশটি প্রায় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। ভৌগােলিক দিক থেকে আফ্রিকা অংশ হওয়া সত্ত্বেও মিশর কিন্তু এ ক্ষেত্রে ছিল ব্যতিক্রম। ইসলামের আবির্ভাবের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি লাভের সঙ্গে সঙ্গে মিশর ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ৯৭২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত কায়রাের আল-আযহার মসজিদ কেন্দ্রিক শিক্ষাকেন্দ্র ইসলামী জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের উন্মােচন করে। মধ্যযুগের মুসলিম বিশ্বে বহুমুখী জ্ঞান চর্চার জন্য তিনটি স্থান সর্বশ্রেষ্ঠ বলে খ্যাতি লাভ করে। এর একটি হল স্পেনের কর্ডোভা, অন্যটি বাগদাদ এবং তৃতীয়টি কায়রাে। বলা নিষ্প্রয়ােজন যে, কায়রাের ভিত্তি ছিল আল-আযহার শিক্ষাকেন্দ্র। বস্তুত মিশর তাে বটেই, মুসলিম জাহানের বিভিন্ন দেশে ইসলামী আদর্শ, শিক্ষা ও ভাবধারার প্রচার, প্রসার ও পরিচর্যায় আল-আযহারের দান অপরিসীম। যুগনায়ক বিভিন্ন আলিম-উলামার সমাবেশ আল আযহারকে খ্যাতিমণ্ডিত করে তােলে। উল্লেখ করা প্রয়ােজন যে, ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আধুনিকীকরণের প্রয়াসের বিভিন্ন রূপায়ণ ঘটে। সাম্প্রতিক কালে বাণিজ্য, প্রশাসন, প্রকৌশল, চিকিৎসা প্রভৃতি বিষয়ও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, উনিশ এবং বিশ শতকে মিশরে যে ইসলামী আন্দোলন সংঘটিত হয়, তার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি ও বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বিশেষভাবে স্বীকৃত। আধুনিক মিশরের চিন্তানায়ক শায়খ মুহাম্মদ আবদুহু ও ইখওয়ানুল মুসলিমুন আন্দোলনের উদ্গাতা শায়খ হাসানুল বান্না এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই আদর্শ ও শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন।

ধর্মীয়রাজনৈতিক পুণর্জাগরণ আন্দোলন

আধুনিককালে মিশরে প্রথম ইসলামী আন্দোলনের সূচনা হয় উনিশ শতকের – শেষ দিকে। এ আন্দোলনের উদগাতা ছিলেন যুগশ্রেষ্ট বিপ্লবী নেতা মুসলিম সংস্কারক – ও চিন্তানায়ক অগ্নিপুরুষ জামালউদ্দীন আফগানী (১৮৩৯–১৮৯৭)। তার এই এ আন্দোলন ইতিহাসে ‘প্যান ইসলামিজম’ নামে খ্যাত। আফগানিস্তানসহ ইরান, তুরস্ক, ইংল্যান্ড, রাশিয়া, মিশর, ভারত, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশ ভ্রমণকারী মধ্যযুগের দর্শন ও ধর্মশাস্ত্রে প্রভূত জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের অধিকারী এ মনীষীকে ভ্রাম্যমান সংগ্রামী বলেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। সমকালীন বিশ্বব্যাপী মুসলিম জাতির পরাধীনতা ও দুঃখ দুর্দশা জামালউদ্দীন আফগানীর মনে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পুনর্জাগরণভিত্তিক ‘প্যান ইসলামী’ আন্দোলনের লক্ষ্য ও আদর্শকে মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যই তিনি বিভিন্ন দেশে গমন করেন। তাঁর এই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল তিনটি। এগুলাে হল—

১. বিদেশী শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুসলিম দেশগুলােকে রক্ষা করা;

২. সংস্কারান্ধ মুসলিম সমাজের সংস্কার সাধন করে মূল ইসলামের একনিষ্ঠ অনুসরণ;

৩. মুসলিম দেশগুলাের উপর চেপে বসা পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সভ্যতা ও সংস্কৃতির মুকাবিলা করা।

১৮৭১ সালে মিশরে আগমনের পর থেকে ১৮৭৯ সাল পর্যন্ত তার অবস্থানের আট বছর কাল তিনি প্যান ইসলামিজমের প্রচার কাজ চালিয়ে যান। মিশরের যুব ও তরুণ সমাজ তার মতবাদে বিপুলভাবে, প্রভাবিত হন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মিশরের পুনরুজ্জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আফগানীর চিন্তাধারার ক্রমবর্ধমান প্রভাব মিশরের শাসকগােষ্ঠীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তােলে। ১৮৭৯ সালে তাকে মিশর থেকে বহিষ্কার করা হয়।

আফগানীর পর এ আন্দোলনের দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নেন আফগানীর বিশ্বস্ত অনুসারী ও আধুনিক মিশরের চিন্তানায়ক বলে পরিচিত শায়খ মুহাম্মদ আবদুহু [১৮৪৯-১৯০৫]। উল্লেখ্য যে, প্যান ইসলামী আন্দোলনের প্রভাব শুধুমাত্র দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধতা ছিল না। উপরন্তু তা সেনাবাহিনীর মধ্যেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে এবং তাদের একটি অংশ আফগানীর অনুসারীতে পরিণত হয়। এরই ফলশ্রুতিতে একনায়কতন্ত্র উচ্ছেদ ও বিদেশী প্রভাব নির্মূলের উদ্দেশ্যে আরবী। পাশার নেতৃত্বে এক বিপ্লব সংঘটিত হয়; কিন্তু নানা কারণে তা ব্যর্থ হয়। এ বিপ্লবের সাথে জড়িত থাকার অভিযােগে আবদুহুকে তিন বছরের জন্য দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়। এই সময় আফগানীর আহ্বানে তিনি প্যারিসে যান এবং তাঁর প্রকাশিত পত্রিকা ‘আল-উরওয়া আল্-উসকা’ সম্পাদনা করেন। কিছুকাল পরে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হলে আবদুহু ফ্রান্স ত্যাগ করে বৈরুত চলে যান। উল্লেখ্য যে, আরবী পাশার বিপ্লব ব্যর্থ হবার পর মিশরে ইংরেজ দখল কায়েম হয়। লর্ড ক্রোমার মিশরের ইংরেজ শাসকের পদে নিযুক্ত হন। তাঁর শাসনকালে (১৮৮২-১৯০৭] তিনি মিসরে, সর্বপ্রকার আন্দোলনকে অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করেন। যা হােক, ১৮৮৯ সালে আবদুহু মিশরে ফিরে আসেন এবং নীরবে ও সুশৃঙ্খলভাবে দেশে ইসলামী আইন-কানুন প্রবর্তনের প্রয়াস গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি কিছুটা সাফল্য অর্জন করতে সমর্থ হন। মিশর সরকার তাঁকে ১৮৯৯ সালে মিশরের গ্র্যান্ড মুফতি পদে নিযুক্ত করে।

১৯০৫ সালে আবদুহুর মৃত্যুর পর মিশরের অন্যতম প্রধান সংস্কারক সাইয়িদ রশীদ রিযা [১৮৬৫-১৯৩৫] এ আন্দোলনের পতাকাকে সমুন্নত রাখার দায়িত্ব পালন করেন। আবদুহুর ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ মিশরে বসবাসকারী এই লেবাননী মুসলিম তার মাসিক পত্রিকা ‘আল মানার’-এর মাধ্যমে এ আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যান। ১৮৯৮ – ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় এ পত্রিকাটি সমকালীন সংস্কার আন্দোলনের একমাত্র – মুখপত্র হিসাবে কাজ করে। আরব দেশগুলাের বিপুল সংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন এ পত্রিকার পাঠক। ‘আল মানার’-এর প্রত্যেকটি সংখ্যায় ধর্মীয় রাজনৈতিক পুনর্জাগরণমূলক প্রবন্ধ-নিবন্ধ সহ আল কুরআনের ধারাবাহিক প্রাঞ্জল অনুবাদও প্রকাশ করা হত। ১৯৩৫ সালে রিযার মৃত্যুর পর সংস্কার আন্দোলনের এ ধারায়। প্রাবল্য স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং সমকালীন মিশরে প্রায় একই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে, অনুসারী অথচ অধিকতর তীক্ষ্ম আবেদনমণ্ডিত আরেকটি প্রবল আন্দোলনের বিকাশ ঘটে। এ আন্দোলনটি ‘ইখওয়ানুল মুসলিমুন’ আন্দোলন নামে পরিচিত।

ইখওয়ানুল মুসলিমুন আন্দোলন

মিশরের মাটিতে জামালউদ্দীন আফগানী সূচীত ও তার অনুসারীদের ভূমিকাপুষ্ট ‘প্যান ইসলামিজম’ আন্দোলনের পর আধুনিককালে যে ইসলামী সংস্কার ও জাগরণবাদী আন্দোলন মিশরসহ আরব জাহান—এমনকি প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্বেই প্রসার লাভ করে, তা হল ‘ইখওয়ানুল মুসলিমুন’ আন্দোলন। এ আন্দোলনের উদ্গাতা শহীদ হাসানুল বান্না (১৯০৬-১৯৪৯)। ইসলামের ঐতিহ্যবাহী দেশটিতে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির সমূহ ক্ষতি সাধনকারী প্রভাবকে বিদূরিত করে আল্লাহর যমীনে। আল্লাহর দীনকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে হাসানুল বান্না একটি জিহাদী সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রয়ােজন অনুভব করেন এবং এ প্রয়ােজন থেকেই ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘ইখওয়ানুল মুসলিমুন’ বা মুসলিম ভ্রাতৃসংঘ। প্রথমাবস্থায় এ আন্দোলনের কাজ ধীরে ধীরে চলে এবং কয়েক বছরের মধ্যেই তা এক বিপুল শক্তিশালী সংগ্রামী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। গােড়ার দিকে আমল না দিলেও ১৯৩৬ সালের দিকে ইখওয়ানের তৎপরতা শাসকগােষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এ সময় হাসানুল বান্না ব্যক্তিগত পত্রের মাধ্যমে মিশরের রাজা ও মন্ত্রীদের পাশ্চাত্য রীতি পরিত্যাগ করে ইসলামী বিধি-বিধান মেনে চলার আহ্বান জানান। সে সাথে তিনি এ দাবিও জানান যে নারীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা, সরকারি অনুষ্ঠান উপলক্ষে মদ্যপান, মদ ও জুয়ার সকল আচ্ছা, নাইট ক্লাব, সিনেমা পত্রিকায় তাদের স্ত্রী ও কন্যাদের ছবি ছাপা প্রভৃতি বন্ধ করে দিয়ে নিয়মিতভাবে সালাত আদায় এবং ইংরেজি ও ফরাসী ভাষার পরিবর্তে আরবী ভাষা প্রচলনে শাসকবর্গকে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। বলা নিপ্রযােজন যে, বান্নার এ দাবি শাসকবর্গের গাত্রদাহ সৃষ্টি করে।

হাসানুল বান্নার অন্যতম লক্ষ্য ছিল শিক্ষার সংস্কার সাধন। ইখওয়ান আন্দোলনের আদর্শ ও লক্ষ্যের ভিত্তিতে বেশ কিছু প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কারিগরী প্রশিক্ষণমূলক স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সাথে সমাজসেবামূলক কার্যক্রম এবং মসজিদ নির্মাণ ও সংস্কারের কাজও হাতে নেওয়া হয়। এগুলাে ছাড়া সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের অধীনে – দৈনিক পত্রিকা ও বিভিন্ন সাময়িক পত্রিকার মাধ্যমে ইখওয়ানের কর্মসূচী, আন্দোলনের পরিচয়, কর্মপদ্ধতি জিহাদের উপর গুরুত্ব বিষয়ে আলােচনা করা হত। মূলত ইখওয়ানের চিন্তাধারা, আদর্শ, কর্মপদ্ধতি সমগ্র আরব জাহানের তাবৎ জনগােষ্ঠীর এক’বিপুল অংশকে আলােড়িত করতে সক্ষম হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই ইখওয়ানের সদস্য-সংখ্যা বিশ লক্ষের কোঠায় উন্নীত হয়। ইখওয়ান সদস্যের বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তাদের প্রত্যেককেই কুরআন, হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন এবং সালাত পাঠসহ দৈনন্দিন কার্যক্রমের রিপাের্ট পেশ করতে হতাে। উস্নেখ্য, ধর্মীয় সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি ইখওয়ান একটি স্বেচ্ছাসেবামূলক ‘প্যারামিলিশিয়া’ ধরনের বাহিনী গঠন করে। ১৯৪৮ সালে প্রথম আরব-ইসরাঈল – যুদ্ধে এই বাহিনী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে ও দক্ষতার পরিচয় দেয়।

ইখওয়ানুল মুসলিমুনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের উপর প্রথম আঘাত আসে ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে। এ সময়ে কায়রােতে সংঘটিত কিছু অপরাধমূলক তৎপরতার জন্য ইখওয়ানকে দায়ি করে এর হাজার হাজার কর্মীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানাে হয়। ইখওয়ানকেও নিষিদ্ধ ঘােষণা করা হয়। ১৯৪৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাতপরিচয় ঘাতকবাহিনী হাসানুল বান্নাকে গুলি করে হত্যা করে। বান্নার এ আকস্মিক শাহাদত সত্ত্বেও ইখওয়ানের আন্দোলনের গতিধারা অব্যাহত থাকে।

জামাল আবদুন নাসের মিশরের প্রেসিডেন্ট হওয়ার কিছুকাল পর ইখওয়ান আন্দোলন দ্বিতীয়বারের মতাে বিপর্যয়ের শিকার হয়। নাসের নিজে রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনে পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির অনুসরন ও সমাজতন্ত্র প্রচলনের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ কারণে ইখওয়ানের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব এবং বিরােধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ সময়ে ইখওয়ান সম্পর্কিত নাসেরের একটি মন্তব্য থেকে তার মানসিকতার পরিচয় ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ইখওয়ানের উৰ্দ্ধতম নেতাদের সাথে আমি কথা বলেছি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে মেয়েদের বােরকা পরানো, সিনেমা এবং থিয়েটার বন্ধ করে দিতে হবে—অন্য কথায় চালু করতে হবে এক অন্ধকার এবং বীভৎস জীবন। নিঃসন্দেহে এই কাজ করা সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য যে, ইসলামী আদর্শ ও লক্ষ্যের বাস্তবায়নে কাজ শুরু করলেও ইখওয়ান মিশরের মাটিতে সকল প্রকার বিদেশী প্রভাব বিস্তারের ঘাের বিরােধী ছিল। প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জন কিংবা বিদেশী শক্তির হাতের ক্রীড়নক হওয়ার বিরুদ্ধে তাদের ভূমিকা ছিল একেবারে আপােষহীন। ইখওয়ানের এ ভূমিকা কোনাে শাসকের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। নাসের নিজেও তা পারেননি। ১৯৫৪ সালে নাসেরের জীবননাশ সম্পর্কিত একটি ঘটনায় ইখওয়ানকে জড়িত করে নির্মম নির্যাতন ও দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ইখওয়ান এ ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযােগ অস্বীকার করা সত্ত্বেও বহু কর্মীকে জেলে পাঠাননা সহ ছয়জন নেতাকে ফাঁসি দেয়া হয়। এখানেই এর শেষ হয়নি। ১৯৬৬ সালে ‘ইখওয়ান’কে মিশরের মাটি থেকে নির্মূল করার লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট নাসের কর্তৃক কমিটি একটি সুপারিশমালা পেশ করে। সার্বিক কল্যাণসহ একটি ইসলামী আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগােষ্ঠী কি জাতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, তার প্রমাণ হিসেবে উক্ত কমিটির সুপারিশগুলাের এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে

১. দেশের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলাের সিলেবাস থেকে দীনিয়াত এবং ইসলামের ইতিহাস সম্পূর্ণভাবে দূর করে দিয়ে পরিবর্তে সমাজতন্ত্রভিত্তিক একটি কারিকুলাম তৈরি করতে হবে।

২. দেশের জনগণের মন থেকে ধর্মীয় চেতনা ও প্রভাব দূর করার জন্য কমিউনিজমকে দেশের মধ্যে কাজ করার পূর্ণ সুযােগ দিতে হবে ও ধর্ম-বিরােধী প্রচারণার ব্যাপারে পূর্ণ সরকারি সহযােগিতা দিতে হবে।

৩. ইখওয়ানের আদর্শভিত্তিক সমস্ত প্রচারণা ও কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করতে হবে এবং এ মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল সকল আলিম ও ব্যক্তিকে এর থেকে দূরে সরিয়ে রাখা অথবা সমূলে ধ্বংস করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. ইখওয়ান-কর্মী এবং অনুসারীদেরকে অব্যাহতভাবে হয়রানিসহ তাদের সহায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং তাদেরকে কাজ করার কোনাে সুযোেগ না দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।

মিশর সরকারের হিংসাত্মক মনােভাবের শিকার হয়ে ইখওয়ানের প্রখ্যাত নেতা সাইয়িদ কুতুবকে ১৯৬৬ সালের ২৬ আগস্ট ফাঁসিতে শাহাদত লাভ করতে হয়।

১৯৭০ সালে নাসেরের মৃত্যু পর্যন্ত ইখওয়ানের প্রতি দমন ও নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে। নাসেরের পর আওয়ার সাদাত প্রেসিডেন্ট হলে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন সাধিত হয়। ২৩ বছর নিষিদ্ধ থাকার পর ইখওয়ান পুনরায় খােলাখুলিভাবে কাজ করে চলেছে। সংগঠনের আলােড়ন সৃষ্টিকারী পত্রিকা ‘আদদাওয়াত’ও পুনরায় প্রকাশিত হতে শুরু হয়। মিশরের জনসাধারণের পক্ষ থেকেও ইসলামী আইন-কানুন চালু করার দাবি উত্থাপিত হয়। এ প্রেক্ষিতে সরকারি তরফ থেকে কায়রাে হাইকোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে একটি ইসলামী আইন প্রণয়ন কমিটিও গঠন করা হয়। উল্লেখ্য, আওয়ার সাদাত নিহত হবার পর হুসনী মুবারক মিশরের প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হন।

সংযােজন : সাম্প্রতিক চালচিত্র

১৯৮৪ সালে মে মাসের ২৭ তারিখে গণপরিষদের নির্বাচনে সরকারি ন্যাশনাল ডেমােক্রেটিক পার্টি ৭২.৯ শতাংশ ভােট পেয়ে ৪৪৮টি নির্বাচনী আসনের ৩৮৯টিতে জয়লাভ করে। অন্যান্য পার্টির মধ্যে একমাত্র ওয়াফদ দল ১৫ শতাংশ ভােট পেয়ে ৮ শতাংশ ভােটের সীমা অতিক্রম করে এবং বাকি ৫৯টি আসনে জয়ী ঘােষিত হয়।

ইসরাঈলের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের দরুন ইসলামী সম্মেলন হতেও মিশরকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি মাসে ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে আবার মিশরকে সদস্যপদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অথচ মিশর সদস্যপদের জন্য পুনরায় আবেদনও করেনি। একমাত্র লিবিয়া, সিরিয়া এবং দক্ষিণ ইয়ামেন ইসলামী সম্মেলনে মিশরের সদস্যপদ পুনরুজ্জীবনের বিরােধিতা করেছিল।

১৯৮৫ সালের মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট মােবারক ও জর্দানের বাদশাহ হােসেন, হঠাৎ বাগদাদ সফর করে ইরাকের প্রতি সমর্থন জানান। আথচ তখন ইরাকের সাথে মিশরের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না।

১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সাল দুটিতে মােবারক ও বাদশাহ হােসেন এবং ইয়াসির আরাফাত ফিলিস্তীন প্রশ্নে আলােচনার মাধ্যমে সমাধানের লক্ষ্যে চেষ্টা চালাতে থাকেন। প্রস্তাবিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি সম্মেলনে যৌথ জর্দানী-ফিলিস্তীনী প্রতিনিধিত্বের জন্য আরাফাত ও হােসেন যে চুক্তি করেন মােবারক তার প্রতি সমর্থন দেন। কিন্তু ১৯৮৫ সালের ঘটনাবলী শান্তি প্রক্রিয়ায় পিএলও-র অংশগ্রহণের কিছু বিরূপ প্রতিফলন সৃষ্টি করে।

১৯৮৬ সালের নভেম্বরে ড. আলী লুৎফী প্রধানমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করেন। মােবারক আতিফ সিদকিকে প্রধানমন্ত্রী নিয়ােগ করেন। ইনি কেন্দ্রীয় অডিট এজেন্সির প্রধান ছিলেন।

১৯৮৭ সালের এপ্রিলের সাধারণ নির্বাচনে সরকারি দল জাগদ (ন্যাশনাল ডেমােক্রেটিক পার্টি) বিপুলভাবে জয়ী হয়। ৪৪৬টি আসনের মধ্যে ৩৪৬টি আসন তারা লাভ করে। বিরােধী দলগুলোে ৯৫টি আসন এবং স্বতন্ত্র ৭টি আসন পায়।

অক্টোবর মাসে হােসনি মােবারক আরও ছয় বছর মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসাবে পুনর্নির্বাচিত হন। সাদাতের হত্যাকাণ্ডের সময় জারি করা জরুরী অবস্থা ১৯৮৮ সালে আরও তিন বছরের জন্য বাড়ানাে হয়। এ বছরের শেষদিকে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের সাথে শ্রমিকরাও সরকার-বিরােধী আন্দোলনে যােগ দেয়।

১৯৮৯ সালের মে মাসে ভর্তুকি প্রত্যাহারের ফলে খাদ্যশস্যের দাম বেড়ে গেলে ব্যাপক গােলযােগ শুরু হয়।

১৯৯০ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিরােধী দলগুলাে অংশ নেয়নি। মাত্র ২০-৩০ শতাংশ ভােটারের উপস্থিতিতে নির্বাচনে সরকার জাগদল ৪৪৪টি আসনের ৩৪৮টিতে জয়ী হয়। ন্যাশনাল প্রােগ্রেসিভ ইউনিয়নিস্ট পার্টি পায় ৬টি আসন। স্বতন্ত্র ৭টি।

১৯৯১ সালে ইরাকীদের সাথে বহুজাতিক বাহিনীর লড়াই শুরু হলে মিশর – ইরাক-বিরােধী কোয়ালিশনের সমর্থন করে যান। যুদ্ধে ইরাকের বিপক্ষে মিশর ৩৫,০০০ সৈন্য পাঠিয়েছিল।

উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কায়রােতে আরব লীগের প্রথম নিয়মিত বৈঠক শুরু হয় ১৯৯১ সালের ৩০ মার্চ। কায়রােতে আরব লীগের মূল হেড কোয়ার্টারে নতুন মহাসচিবের অধীনে লীগের সভা অনুষ্ঠান ছিল আরব রাজনীতিতে মিশর যে আবার দাপটের সাথে পুনঃপ্রবেশ করেছে তার নিশ্চিত প্রমাণ।

১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষের জন্য ১,০০০ ইসলামপন্থীকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৯৪ সালের ১৭ মার্চ ইসলামী জেহাদ গ্রুপের নয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

১৯৯৫ সালের প্রথম দিকে সােসালিস্ট লেবার পার্টির (সােলেপা) ২০ জন কর্মীকে মিনিয়াতে সরকার-বিরােধী প্রচারপত্র বিলি করা এবং জামায়াতে ইসলামকে সমর্থন করার অপরাধে গ্রেফতার করা হয়।

প্রেসিডেন্ট হােসনি মােবারককে তৃতীয় মেয়াদের জন্য জুলাই মাসে (১৯৯৫) আবার মনােনয়ন দেওয়া হয়। ৪ অক্টোবরের গণভােটে ৯৪.৯% ভােটে এ মনােনয়ন অনুমােদিত হয়। কোনাে বিরােধী দলই মােবারকের তৃতীয় মেয়াদের প্রস্তাব অনুমােদন করেনি। বরং তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অভিযােগ করেছিলেন।

১৯৯৫ সালের ২৯ নভেম্বর এবং ৬ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সরকারি জাগদল ৩১৬টি আসনে জয়ী হয়। স্বতন্ত্র পায় ১১৫টি আসন। ১৯৯৬ সালের জানুয়ারি মাসে। কামাল আহমদ আল গানজোরীর নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রীসভা গঠিত হয়। ইতিপূর্বে তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রী ছিলেন।

১৯৯৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৯১জন বিদ্রোহীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম তীরের হেবরনে এক ইহুদী বসতকারী কর্তৃক ৩০ জন ফিলিস্তীনীকে হত্যার ফলে কায়রােতে নাসেরপন্থী দল এবং ইসলামী ভ্রাতৃত্ব বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

১৯৯৫ সালের আগস্ট মাসে জানা যায় যে, ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংস্কার এবং ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরাঈল যুদ্ধের সময় ইসরাঈলী সৈন্যরা বহু মিসরী যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করেছে। তাতে মিশরে ভীষণ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

লিবিয়ায় প্রায় দশ লাখ মিসরী কাজ করে। মিশরের রপ্তানির একটি বড় মার্কেট লিবিয়া। এজন্য মিসরীয় কূটনীতির বড় লক্ষ্য হচ্ছে পশ্চিমাদের সাথে লিবিয়ার মােকাবিলা পরিস্থিতি পরিষ্কার করা।

মিশরের রাজনৈতিক দলগুলো

  • ডেমােক্রটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি। স্থাপিত ১৯৯০। প্রেসিডেন্ট মুহম্মদ আবদ আল মােনেইম তুর্ক।
  • গ্রীন দল। স্থাপিত ১৯৯০। চেয়ারমান হাসান রাজিব।
  • এইখওয়ান (মুসলিম ভ্রাতৃত্ব)। স্থাপিত ১৯২৮। সরকারিভাবে বেআইনি ঘােষিত। – মহাসচিব মামােন আল-হাদাইবি।
  • লিবারেল সােসালিস্ট পার্টিকায়রাে। স্থাপিত ১৯৭৬! নেতা মুস্তাফা কামাল মুরাদ।
  • নাসেরপন্থী দল। স্থাপিত ১৯৯১।
  • ন্যাশনাল ডেমােক্রেটিক পার্টি (জাতীয় গণতান্ত্রিক দল-জাগদ)। স্থাপিত ১৯৭৮ আনওয়ার সাদাত প্রতিষ্ঠিত সরকারি দল। চেয়ারম্যান মুহম্মদ হােসনী মােবারক।
  • ন্যাশনাল প্রােগ্রেসিভ ইউনিয়নিস্ট পার্টি। স্থাপিত ১৯৭৬। বামপন্থী নেতা খালেদ মাইয়েদ্দিন।।
  • নিউ ওয়াদ পার্টি। স্থাপিত ১৯১৯। ১৯৫২ সালে নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১৯৭৮ সালে এ নামে পুনঃপ্রকাশ। জুন ১৯৭৮ সালে নিষিদ্ধ। ১৯৮৩ সালে পুনর্গঠিত। নেতা ফুয়াদ সেবাগেদিন।
  • সােসালিস্ট লেবার পার্টি। স্থাপিত সেপ্টেম্বর, ১৯৭৮। সরকারি-বিরােধী দল। নেতা ইব্রাহিম করি।
  • উম্মা পার্টি। খার্তুমভিত্তিক ধর্মীয় দল।
  • ইয়ং ইজিপ্ট পার্টি। স্থাপিত ১৯৯১। চেয়ারম্যান আলা আশদিন সালিহ।

ইসরাঈল ও মিশর সম্পর্কের ঘটনাপঞ্জি

১৯৭৭

৯ নভেম্বর—সাদাত ইসরাঈল যেতে প্রস্তুত। মিশরের সংসদ গণপরিষদে সাদাতের ঘােষণা।

১৯-২১ নভেম্বর- সাদাতের ইসরাঈল সফর ও ইসরাঈলী সংসদে ভাষণ।

২-৫ ডিসেম্বর—ত্রিপলীতে সাদাতের উদ্যোগের বিরুদ্ধে বৈঠকে অংশগ্রহণকারী – লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক, আলজিরিয়া, দক্ষিণ ইয়ামেন, পিএলও, পপুলার ফ্রন্ট।

১৪-১৫ ডিসেম্বর কায়রােতে ইসরাঈল ও মিসরীয়দের মধ্যে শান্তি আলােচনা শুরু। যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের উপস্থিতিতে।

২৫-২৬ ডিসেম্বর—ইসমাইলিয়া শহরে সাদাত ও বেগিনের বৈঠক। রাজনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তা সমস্যাবলীর জন্য একটি ওয়ার্কিং কমিটি গঠনে সম্মতি।

১৯৭৮

১১-১২ জানুয়ারি—-মিশর ও ইসরাঈলের মধ্যে কায়রােতে প্রথম সামরিক – আলােচনা।

১৬ জানুয়ারি—জেরুযালেমে মিশর ও ইসরাঈলের মধ্যে রাজনৈতিক সভা। পরের দিনই মিশর তার প্রতিনিধিকে ডেকে পাঠায়।

১ ফেব্রুয়ারি—দ্বিতীয় দফা সামরিক আলােচনা। একদিন পরেই স্থগিত রাখা হয়।

২-৪ ফেব্রুয়ারি—আলজিয়ার্সে সাদাত বিরােধী ফ্রন্টের (প্রতিরােধ ও মােকাবিলা ফ্রন্ট) সভা। ইরাক বাদে সব আরব রাষ্ট্রের যােগদান।

১৫ মার্চ-ইসরাঈল কর্তৃক দক্ষিণ লেবানন আক্রমণ।

১৩ জুলাই-অষ্ট্রিয়ার ফুসলে সাদাতের সাথে ইসরাঈল প্রতিরক্ষা মন্ত্রী-এজমির ইউজম্যানের সাক্ষাত।

১৮-১৯ জুলাই-মিশর ও ইসরাঈলী পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের লিডস ক্যাসলে মোলাকাত।

৫ সেপ্টেম্বর—ক্যাম্প ডেভিডে সাদাত, বেগিন এবং কার্টারের মধ্যে আলােচনা

১৭ সেপ্টেম্বর—সাদাত ও বেগিনের মধ্যে দুটি চুক্তি স্বাক্ষর। একটি মিশর ইসরাঈল শান্তি সংক্রান্ত এবং অন্যটি মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি সংক্রান্ত।

২০-২৩ সেপ্টেম্বর—প্রতিরােধ এবং মুকাবিলা কমিটির দামেশকে সভা (ইরাক – বাদে) এবং মিশরের সাথে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত।

১২ অক্টোবর-ওয়াশিংটনের ব্লেয়ার হাউসে মিশর ও ইসরাঈলের মধ্যকার আলােচনা।

২৭ অক্টোবর—সাদাত ও বেগিনকে যৌথভাবে নােবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান।

২-৫ নভেম্বর—বাগদাদে সাদাত-বিরােধী আরৰ শীর্ষ বৈঠক।

১৭ ডিসেম্বর—মিশর-ইসরাঈল শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের শেষ তারিখ অতিক্রান্ত।

১৯৭৯

২১ ফেব্রুয়ারি-ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভান্স, মিশরের প্রধানমন্ত্রী ড. খলিল এবং ইহুদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মােশে দায়ানের মধ্যে আলােচনা শুরু।

৮-১৩ মার্চ-বাগদাদে মিশর-বিরােধী আরব শীর্ষ বৈঠক।

২৬ মার্চ কার্টারকে সাক্ষী রেখে সাদাত ও বেগিনের শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর। ফিলিস্তীনের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে ব্যাখ্যামূলক পত্রও চুক্তির সাথে সাথে বিনিময়।

২৭-৩১ মার্চ—বেগিনের সরকারিভাবে মিশর সফর।

২-৩ এপ্রিল-বাগদাদে মিশর-বিরােধী আরব শীর্ষ বৈঠক।

২৫ এপ্রিল—সিনাইয়ের রাজধানী আল-আরিস মিশরের হাতে প্রত্যার্পণ।

২৯ এপ্রিল—অধিকৃত সিনাই অঞ্চল থেকে ইসরাঈলী বাহিনী প্রত্যাহার সংক্রান্ত যৌথ কমিশনের মিশর ও ইসরাঈলী জেনারেলদের প্রথম সভা (সিনাইয়ে)।

২৭ মে-আল আরিস প্রত্যার্পণ এবং মিশর-ইসরাঈল সীমান্ত খােলা উপলক্ষে আল-আরিসের অনুষ্ঠানে সাদাত, বেগিন ও ভান্সের অংশগ্রহণ।

১০-১২ জুলাই—ফিলিস্তীনীদের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে আলেকজান্দ্রিয়ায় সাদাত ও বেগিনের সভা। এর পূর্বে এই ব্যাপারে মিশর ও ইসরাঈলের প্রতিনিধিদের মধ্যে ৪টি সভা হয়েছিল।

৪-৬ সেপ্টেম্বর হাইফাতে সাদাত ও বেগিনের সভা। মিশর ইসরাঈলের কাছে ২০ লক্ষ টন তেল বিক্রয় করতে সম্মত।

অর্থনৈতিক বিষয়াবলী

বিশ্বব্যাঙ্কের হিসাব অনুযায়ী ১৯৯৭ সালে মিশরে মাথাপ্রতি জাতীয় উৎপাদন (পিপিপি) ছিল ২.৭৬০ ডলার। ১৯৬০ সাল থেকে বার্ষিক মাথাপ্রতি জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল ৩.৬ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার ছিল ১৯৮৫-৯৫ (পিপিপি) ২.১ শতাংশ।

পরিবহন ও যােগাযােগ

নীল উপত্যকায় রেলপথের ব্যবস্থা আছে। নীলনদও একটি গুরুত্বপূর্ণ যােগাযােগ মাধ্যম। আলেকজান্দ্রিয়া ও পাের্ট সৈয়দ প্রধান বন্দর। কায়রাে একটি প্রসিদ্ধ বিমানবন্দর। মিশরী বিমানের বিশ্বজোড়া সার্ভিস চালু আছে।

শিক্ষা

প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক। প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির হার ৭৬% (১৯৮০), মাধ্যমিক স্কুলে ৫২%। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৮টি। সকল পর্যায়েই শিক্ষা অবৈতনিক। ১৯৭৬ সালে নিরক্ষতার হার ছিল ৬১.৮% (পুরুষ ৬.৪% এবং মহিলা ৭৭.৫%)।

মিশরের বিভিন্ন প্রদেশ এবং তার আয়তন ও রাজধানী

প্রদেশ আয়তন (বর্গকিমি) রাজধানী
কায়রো ১১৪.২ কায়রো
আলেকজান্দ্রিয়া ২,৬৭৯.৪ আলেকজান্দ্রিয়া
পোর্ট সায়িদ ৭২.১ পোর্ট সায়িদ
ইসমাইলিয়া ১,৪৪১.৬ ইসমাইলিয়া
সুয়েজ ১৭,৮৪০.৪ সুয়েজ
দামাইতা ৫৮৯.৬ দামাইতা
দাখালিয়া ৩,১৭৯.৬ মানসুরা
শারকিয়া ৪,১৭৯.৬ জাগাজিগ
কালাইযুবা ১,০০১.১ বেনহা
আফর আশ-শাইখ ৩,৪৩৭.১ আফর আশ-শাইখ
ঘারবিয়া ১,৯৪২.২ তানতা
মেনুফিয়া ১,৫৩২.১ শিরিন আল কোম
বেহেরা ১০,১২৯.৫ দামানহুর
গিজা ৮৫,১৫৩.২ গিজা
বেনী সুয়েফ ১,৩২১.৭ বেনী সুয়েফ
ফাইয়ুম ১,৯২৭.২ ফাইয়ুম
মেনিয়া ২,২৬১.৭ মেনিয়া
আমাইযুত ১,৫৫৩.৩ আমাইযুত
সোহাগ ১,৫৪৭.২ সোহাগ
কেনা ১,৮৫০.৭ কেনা
আসওয়ান ৬৭৮.৫ আসওয়ান
আল-বাহর আল-আহমার ২,০৩,৬৮৫.০ আল ঘাওয়ারদাক
আল-ওয়াদি আল-জাদিদ ৩,৭৬.৫০৫.০ আল খারিজাহ
মাতরুহ ২,১২,১১২.০ মাতরুহ
উত্তর সিনাই আল আরিশ
দক্ষিণ সিনাই আত তুর

 

প্রধান নগরীসমূহ

১। কায়রাে; ২। আলেকজান্দ্রিয়া; ৩। আল-গিজা; ৪। সুবারা-আল-খেমা; ৫। : আল-মহল্লা আল কুবরা; ৬। তানতা; ৭। পাের্ট সায়িদ; ৮। আল-মনসুরা; ৯। আসিউদ; ১০। জাগজিগ; ১১। আল-সুয়েজ; ১২। দামানহুর; ১৩। আল-ফাইয়ুম; ১৪। আল-মেনিয়া; ১৫। কাফর আল-দাওয়ার; ১৬। ইসমাইলিয়া; ১৭। আসওয়ান এবং ১৮। বেনী সুয়েজ।

সুত্র – নবজাগরণ

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »