Ultimate magazine theme for WordPress.

কেয়ামতের পূর্ব লক্ষণ ও বর্তমান বিশ্ব

0

ক্রাইম টিভি বাংলা অনলাইন ডেস্ক…

হুজ্জাতুল ইসলাম আল্লামা শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবী (রহ.) বলেছেন, কেয়ামতের পূর্ব লক্ষণ বা নিদর্শনসমূহ তিন ভাগে বিভক্ত। এক. (আলামতে ছোগ্রা) এমন কতিপয় আগের দূরবর্তী লক্ষণসমূহ, যা এক সময় সংঘটিত হয়েছে এবং তার আলামত শেষও হয়ে গেছে। এর উদাহরণ হলো শেষ নবী হজরত রসুলে আরাবি মুহাম্মদ (সা.)-এর দুনিয়ার বুকে আগমন, পবিত্র কোরআন নাজিল, রসুল (সা.)-এর ওফাত, খেলাফতে রাশেদার যুগ, হজরত ওসমান (রা.)-এর শাহাদাত, সিরিয়া ও ইরাক বিজয়, সিফফিন ও উষ্ট্রীর যুদ্ধ, হজরত হোসাইন (রা.)-এর কারবালার ময়দানে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ ইত্যাদি। দ্বিতীয়, (আলামতে ছোগ্রা) এমন কতিপয় নিকটবর্তী লক্ষণসমূহ যা ঘটছে এবং ঘটে চলছে। আজ পর্যন্ত শেষ হয়নি বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। (১) ব্যাপকহারে আমানতের খেয়ানত করা হচ্ছে। আমানত শুধু টাকা-পয়সার সঙ্গেই সীমাবদ্ধ নয় বরং আমানতের সম্পর্ক মালের সঙ্গে যেমন রয়েছে কথাবার্তার সঙ্গেও তেমন রয়েছে। অনুরূপ মানুষের কাছে মানুষের ইজ্জত-আব্রুও আমানত। কিছু লোক এমন আছে যাদের চাল-চলনের দিকে লক্ষ্য করলে মনে হয় আল্লাহপাক তাকে মানুষের ইজ্জত-আব্রু নষ্ট ও গীবত- শেকায়াত করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই এক কাজ নিয়েই তার ব্যস্ততা। মনে হয় এ ছাড়া তার আর কোনো কাজ নেই। (২) সুদ-ঘুষ ও মদপানের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান জমানাতে এগুলোকে অনেকে কোনো অপরাধই মনে করে না। বহু লোক পোশাকে-লেবাসে দীনি সুরত ধারণ করলেও সুদ-ঘুষের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। সুদি কারবারের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অকপটে বলে যাচ্ছেন শুনে মনে হয় তিনি সঠিক কাজই করছেন। মদের সঙ্গে অনেক নেশাদার বস্তু তৈরি হচ্ছে। যেগুলোকে সমাজের উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা দেদার পান করছে। বিভিন্ন স্থানে শরবতের পরিবর্তে নেশাদার পানীয় সরবরাহ করা হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তারা কোনো কোমলজাতীয় পান করছে।

সেখানে না আছে কোনো দীনি শিক্ষা বা সামাজিকতার লাগাম। আছে শুধু অশ্লীলতার সয়লাব। বর্তমান সময় ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেয়েরাও এই ধরনের নেশাদার বস্তুর সঙ্গে সমানতালে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে পরিণতি বড় ভয়াবহ হচ্ছে। (৩) দুনিয়ার প্রতি মোহ-ভালোবাসা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ এই পৃথিবী এবং তার মধ্যকার সব কিছুই একেবারে লিমিটেড। এখানে সত্যিকার অর্থে আনলিমিটেড বলতে কিছুই নেই। এই দুনিয়া দ্বারা তারাই ধোঁকা খায়, যারা এখানের কোনো কিছুকে আনলিমিটেড মনে করে। নিজের হায়াত, সৌন্দর্য, শক্তি, অর্থসম্পদ, ক্ষমতা, যশ-খ্যাতি সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী ও ধ্বংসশীল। একমাত্র পরকালই স্থায়ী, যার শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই। দুনিয়ার মোহে পড়ে দায়িত্বশীলরা দায়িত্বে অবহেলা ও খেয়ানত করছে। অনেকে প্রতারণা, মিথ্যা ওয়াদা, গানবাদ্য ও অশ্লীল চিত্তবিনোদনের প্রসার, হত্যাকাণ্ড ও ব্যভিচারের কাজে দেদার জড়িয়ে পড়ছে। নিজের অপরাধবোধের অনুভূতি পর্যন্ত তাদের মাঝে দেখা যায় না। তিন. (আলামতে কুবরা) এমন কতিপয় বড় ধরনের লক্ষণ, যেগুলো ভবিষ্যতে ঘটবে। যেমন দাজ্জালের আগমন। দাজ্জাল হলো একজন ভণ্ড মিথ্যাবাদী মাসিহ। সে শেষ জমানায় এসে নিজেকে সত্য মাসিহ অর্থাৎ ঈসা মাসিহ বলে দাবি করবে। এক সময় নিজেকে খোদা বলে দাবি করবে। (নাউজুবিল্লাহ)। মুসলিম শরিফের এক হাদিসে এসেছে। হজরত নবী করিম (সা.) বলেন, দাজ্জালের ফিত্না হবে কেয়ামত অবধি সবচেয়ে বড় ফিত্না। আর পৃথিবীতে তার অবস্থান হবে ৪০ দিন। প্রথম দিন হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন হবে এক মাসের সমান, তৃতীয় দিন হবে এক সপ্তাহের সমান, আর বাকি ৩৭ দিন হবে আমাদের দিনের মতো। অর্থাৎ মোট ১ বছর ২ মাস ১৪ দিন তার স্থায়িত্বকাল হবে। মুসলিম শরিফের অপর হাদিসে এসেছে, হজরত হোজাইফা ইবনে আসিদ গিফারি (রা.) বলেন, একদা আমরা পরস্পরে কথাবার্তা বলছিলাম, এমন সময় নবী করিম (সা.) আমাদের কাছে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন তোমরা কী সম্পর্কে আলোচনা করছ?

তারা বলল, আমরা কেয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছি। তখন তিনি বললেন, তোমাদের ১০টি নিদর্শন না দেখা পর্যন্ত কেয়ামত কায়েম হবে না। আর তা হলো— ১. ধোঁয়া (যা একনাগাড়ে ৪০ দিন পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়বে)। ২. দাজ্জাল। ৩. চতুষ্পদ জন্তু, যেগুলোকে দাব্বাতুল আরদ বলা হয়। ৪. পশ্চিমাকাশে সূর্য উদিত হওয়া। ৫. হজরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.)-এর আকাশ থেকে অবতরণ। ৬. ইয়াজুজ মাজুজের আগমন। (৭, ৮, ৯) তিনটি ভূমিধস— পূর্ব দিকে, পশ্চিম দিকে এবং আরব উপদ্বীপে। ১০. সর্বশেষে ইয়ামান থেকে এমন একটি অগ্নি বের হবে, যা মানুষের দিকে তেড়ে এসে মানুষকে একটি সমবেত হওয়ার স্থান (সিরিয়ার) দিকে নিয়ে যাবে। অপর বর্ণনায় আছে, আদন (এডেন)-এর অভ্যন্তর থেকে আগুন বের হবে, যা মানুষকে সমবেত হওয়ার স্থানের দিকে নিয়ে যাবে। অপর বর্ণনায় আছে এমন এক বাতাস বের হবে, যা মানুষকে (কাফেরদের) সাগরে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করবে। প্রিয় পাঠক! কেয়ামত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কেয়ামত আসার কারণ যাতে আমরা না হই, তাই কেয়ামতের যে আলামতগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো থেকে আমরা সবাই নিজেদের বিরত রাখার চেষ্টা করি। আল্লাহপাক আমাদের সেভাবে চলার চেষ্টা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

লেখক : মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও খতিব বারিধারা, ঢাকা।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »