Ultimate magazine theme for WordPress.

বাড়ির দেয়াল সাজাতেই নরমুণ্ডু শিকার করে এই জাতি

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা অনলাইন ডেস্ক♦

মারামারি করতে গিয়ে এক পর্যায় খারাপ অবস্থায় চলে যায়। আর তখন আপনার মুণ্ডুটা কাটা যেতেই পারে। মারামারির সময় এমন ঘটনা তো ঘটবে, সেটাই ঠিক আছে। তবে এমন যদি হয় আপনার প্রতিপক্ষের মূল উদ্দেশ্যই হল আপনার মাথাটা কেটে নিয়ে ঘরের শোভা বর্ধন করা কিংবা স্বজাতির কোনো তরুণীর হৃদয় হরণ করা, তখন ব্যাপারটা রীতিমত বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে যায়।

এই মুণ্ডু কেটে নেয়া বা কেতাবী ভাষায় ‘হেডহান্টিং’ কোনো নতুন ঘটনা না। বস্তুত আমেরিকা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলো, ইউরোপ আর এশিয়ার অনেক অঞ্চলেই এহেন মুণ্ডু কাটার সংস্কৃতি ছিল। এই আমাদের উপমহাদেশেই, আসামের ব্রক্ষপুত্র নদের দক্ষিণে বহু আদিবাসী এই মুণ্ডু কাটার নেশায় জড়িয়ে পড়েছিল একটা সময়ে। এমনই একটি দুর্ধর্ষ জাতি নাগারা। আজ জানাবো নাগাদের সম্পর্কে।

কয়েক শত বছর ধরেই নরমুণ্ডু শিকারি কোন্যাক নাগারা। ১৯৪০ এর দশকে ভয়ংকর এই চর্চা আইন করে নিষিদ্ধ করার আগ পর্যন্ত কোন্যাকদের মধ্যে লড়াই মানেই প্রতিপক্ষের মুণ্ডু শিকার। প্রতিপক্ষের কোনো যোদ্ধাকে হত্যা করে তার মুণ্ডু কেটে নিয়ে আসতে পারাই তরুণ কোন্যাকদের জন্য বীরের মর্যাদা লাভের সুযোগ। মুণ্ডু শিকারি তরুণ যোদ্ধাকে গোত্রের লোকেরা অভিষিক্ত করে তার মুখে উলকি এঁকে দিয়ে। মুখে এমন উলকি আঁকা দেখলেই প্রতিপক্ষের যোদ্ধারাও বুঝতে পারে অপর যোদ্ধার সামাজিক মর্যাদা। নিষিদ্ধের পরও নাগাল্যান্ডে এমন নরমুণ্ডু শিকারের শেষ খবর পাওয়া গেছে ১৯৬৯ সালে। ফলে প্রবীণ কোন্যাক ছাড়া কারও মুখেই এখন আর ওই উলকি দেখা যায় না।

মহিষ, হরিণ, বনগাই, বন্য শূকর আর ধনেশের মাথার খুলি আর হাড়ে সাজানো থাকে সব কোন্যাকের বাড়ির দেয়াল। প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিকারের বীরত্বগাথা যেন লিখে রাখা এসব হাঁড়গোড় কঙ্কালে। কোন্যাকদের বার্ষিক শিকারের দিনে এসব স্মারকের পাশাপাশি বধ করা শত্রুর মাথার খুলিও প্রদর্শিত হয় গুরুত্বের সঙ্গে। তবে নরমুণ্ডু শিকার নিষিদ্ধ হওয়ার পর অনেক কোন্যাকই তাদের সংগ্রহে থাকা শত্রুদের মাথার খুলিগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলেছে।

কোন্যাকদের বাড়ি বানানোর প্রধান উপকরণ বাঁশ। বেশ প্রশস্ত একেকটা কুটিরে থাকে অনেকগুলো ঘর। রান্না, খাওয়া, ঘুমানো এবং জিনিসপত্র রাখার জন্য আলাদা ভাঁড়ার ঘর অবশ্যই থাকবে কোন্যাকদের বাড়িতে। সবজি, শস্য এবং মাংস রাখা হয় ঘরের মাঝখানে আগুন পোহানোর জায়গার ওপর। প্রধান খাদ্যশস্য চাল রাখা হয় বাঁশের তৈরি বড় গোলায় বাড়ির পেছন দিকটায়। কোন্যাকদের একটা প্রিয় খাবার আঠা-ভাত। উৎসবের দিনে তো বটেই সারা বছরই হাতে টানা ঢেঁকি দিয়ে ছাঁটা চালে এই ভাত রান্না হয়।

নাগারা দোনি পোলো নামের আদিম ধর্মে বিশ্বাস করতো। সূর্য ও চাঁদ নির্ভর এই ধর্মের অনেক অনুসারী অরুণাচলে আছে। বর্তমান নাগারা অবশ্য প্রায় সবাই খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী। ব্রিটিশ আর আমেরিকান মিশনারীদের ক্রমাগত চেষ্টায় নাগারা নিজেদের প্রাচীন ধর্ম আর রীতিনীতি অনেকাংশে ভুলে গিয়েছে। নাগারা একই গোত্রে বিয়ে দেয়াটাকে খুব খারাপ নজরে দেখে থাকে। নাগারা যেহেতু যোদ্ধা জাতি, সমাজে ছেলে শিশুদের কদর বেশি। তবে মেয়েদেরকেও যথেষ্ঠ সম্মান করা হয়। নাগা মেয়েরা মূলত কাপড় বোনে আর কৃষিকাজে সাহায্য করে থাকে। গ্রামের মোড়লকে আংঘ বলা হয়।

নাগাদের গ্রামে একটি আলাদা করে বড় ঘর বানানো হয়, এটাকে বলে মোরাং। নাগা শিশু-কিশোরেরা তাদের জীবনের বেশ কিছুটা সময় এই মোরাং এ থাকে, আর বয়স্কদের কাছ থেকে নাগা রীতিনীতি শিখে নেয়। বর্তমানে অবশ্য অনেক গ্রামেই আর মোরাং বানানো হয় না। রং-বেরং এর শাল এবং অলংকার প্রস্তুত করবার ব্যাপারে নাগারে খুব দক্ষ। শুধু তাই নয়, প্রত্যেকটি বাড়ির দরজার দুইপাশে নানা কারুকাজ করে থাকে তারা। নাগা সাজসজ্জায় গয়ালের খুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ। গয়াল হচ্ছে ভারতীয় বন্য গরু বা গৌরের সঙ্গে গৃহপালিত গরুর সংমিশ্রণ। নাগাল্যান্ডের প্রাদেশিক সিলেও গয়ালের মাথা ব্যবহার করা হয়।

প্রতিবছর নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমাতে ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত ধনেশ উৎসব পালন করা হয়। মূলত নাগা সমাজকে তুলে ধরবার জন্য ২০০০ সাল থেকে এই উৎসব পালন করা হয়ে আসছে। নাগাদের গল্পকথায় ধনেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ পাখি, নাগা নেতাদের মুকুট প্রস্তুতের কাজে শূকরের দাঁতের পাশাপাশি ধনেশের পালক আর ঠোটঁ দারুণ প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ। নাচ, গান, সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা এবং নানা কুটির পণ্যের সমাহার ঘটে এই উৎসবে। এই ধনেশ উৎসব ছাড়াও বছরব্যাপী নাগা জাতিগুলি নানা আনন্দ উৎসবের আয়োজন করে থাকে খুব ধুমধাম সহকারে।

নাগা সমাজে মুখে মুখে চলা আসা প্রাচীন গল্পকথা প্রচলিত আছে। বিশেষ করে কোনিয়াক গোত্রের নাগাদের মধ্যে রাজা গদাধরের কাহিনী খুব জনপ্রিয়। অহোম রাজা গদাধর বার শতাব্দীর দিকে নিজ রাজ্য ছেড়ে নাগাল্যান্ডে পালিয়ে এসেছিলেন। এখানেই নাগা রাজকন্যা ওয়াতলং এর সঙ্গে তার প্রণয় ও বিবাহ হয়। চৌদ্দ এবং পনেরো শতক থেকেই অহোমদের সঙ্গে নাগাদের সাংস্কৃতিক আদান প্রদান হতে থাকে।

দীর্ঘদিনের বৈরী পরিবেশ কাটিয়ে উঠে নাগারা এখন পর্যটকদের সানন্দে বরণ করে নিচ্ছে। নাগাল্যান্ডের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে ফ্যালকন নামক শিকারী পাখির সমারোহ নাগাদের বাসভূমিকে ক্রমেই আকর্ষণীয় করে তুলছে। প্রদেশটির ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমাতেই জাপানী সেনাবাহিনী এবং সুভাষ চন্দ্র বোসের ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়েছিল।

সুত্র – ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »