Ultimate magazine theme for WordPress.

‍‍`পড়াশোনার পেছনে এতো খরচ করে কি লাভ? সেই তো পরের ঘরেই যাবে!‍‍`

0

এতো পড়ে কি হবে সেই তো পরের ঘরেই যেতে হবে! যতোই পড়ো সেই তো রান্নাঘর’ই সামলাতে হবে, বিয়ে না দিয়ে মেয়েকে এতো পড়ালেখা করানোর মানেই টাকা নষ্ট! মেয়ের পড়াশোনার পেছনে এতো খরচ করে কি লাভ? সেই তো অন্যের ঘরেই যাবে! বেশি পড়াশোনা করলে যোগ্য ছেলে পাওয়া যাবে না, বেশি পড়াশোনা জানা মেয়েদের সংসার টিকেনা!’ এমন কথাগুলো প্রতিটা মেয়ের কাছে ডাল-ভাতের মতো অনেকটা। খুব ভাগ্য করে জন্ম নেওয়া দু’একজন ছাড়া এই কথাগুলো শোনে নি, এমন মেয়ে খুব কম’ই আছে। সমাজ মেয়েদের একটা গন্ডির মধ্যে বেঁধে দিয়েছে। যেখানে মেয়েদের বিয়েটাই মুখ্য! আসলেই কি তাই? বিয়েটাই কি সব? একটা মেয়ের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, স্বপ্ন, প্রতিভা এসবের কি কোন মূল্য নেই?

‘মেয়ে’ শব্দটাতেই কেন ভেঙ্গে যায় হাজারো স্বপ্ন! বেশ কয়েকবছর আগের কথা, আমার খুব কাছের এক আপুর স্বপ্ন ভেঙ্গে যেতে দেখেছি। পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলেন তিনি। অনার্স ফাইনাল ইয়ারে ওঠার পর থেকে বাড়িতে আর কিছুতেই উনাকে রাখবে না। পরিবারের মানুষ এমন ব্যবহার করতো যেন উনি এমন কোন অপরাধ করেছে যার কোন ক্ষমা নেই।

আপুর পরিবারের কথা শুনে আমি রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, ‘অনার্স কমপ্লিট হলে না-কি আপুর যোগ্য ছেলে পাওয়া যাবে না! ছেলেপক্ষ অনার্স শুনেই না-কি আগেই রিজেক্ট করে দিয়েছে বয়স বেশি বলে!’ কথাগুলো শুনে আমি খুব করে ভাবলাম, মানসিকভাবে কতটা বিপর্যস্ত হলে আমরা এভাবে ভাবতে পারি! আমরা নারীর অধিকার বলে চিল্লাই অথচ নিজের ঘরে গিয়ে ঠিকই বলি, মেয়েদের এতো পড়াশোনা করার দরকার নাই! সেই-তো অন্যের সংসারেই যাবে!

উনি উনার স্বপ্নগুলো এতো সুন্দর করে লালন করতেন যে আমি মাঝেমধ্যে অবাক হতাম আপুকে দেখে। পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলেন তিনি, আমি খুব করে বিশ্বাস করতাম আপু পারবেই নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে, এতোটা বিশ্বাস আমার নিজের ওপরও ছিলো কি-না আমি জানতাম না! আপু ফাইনাল ইয়ার ওঠার পর থেকেই বাসায় বিয়ে চাপ দ্বিগুণ থেকে চারগুণ হয়ে গেলো। আপু বিয়েতে রাজি ছিলো না এমন নয়, আপু চেয়েছিলো নিজে কিছু করতে। ইন্টার থেকে আপুকে বিয়ের জন্য বাড়ি থেকে কথা শোনানো হতো, অনেক কষ্টে তিনি অনার্স পর্যন্ত এসেছেলিনে।

আপু, পরিবারের চাপে বিয়ে করে নেয়। ছেলেপক্ষ প্রতিশ্রুতি দেয়, তারা বিয়ের পর আপুকে পড়াবে, আপু যতটা পড়তে চায় তারা করাবে। কিন্তু বিয়ের মাসখানেকের মাথায় তাদের চেহারা পাল্টে যায় পুরোপুরি। চাকরি তো দূরের কথা, আপুকে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষাটাও দিতে দেয়নি! অথচ আপু একদিন স্বপ্ন দেখতো অনেক মানুষের ভরসা হওয়ার, একটা নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলার। আপুর কথাগুলো শুনে আমি কয়েকমিনিট কথা বলতে পারিনি, ফোনের ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ এসেছে স্বপ্নভাঙ্গার গল্প হয়ে।যখন পড়াশোনা জানা মেয়ের সংসার টেকেনা তখন আমরা খুব সহজভাবেই বলে দেই, এ মেয়ের সংসার টিকবে কি, এ তো পড়াশোনা জানা মেয়ে, এই মেয়ে জানে না-কি মানিয়ে নিয়ে চলা কাকে বলে! এ তো ভাঙতে জানে! কথাগুলো যে অবলীলায় বলে গেলেন, আপনাকে বলছি, হ্যাঁ আপনাকেই! মানিয়ে চলা বলতে আপনি ঠিক কি বোঝাতে চান? পড়াশোনা জানা মেয়েরা অনেক বেশি মানিয়ে নিয়ে চলতে চায় কিন্তু আপনি আপনার মতো মানুষগুলো মনে দৃঢ় ধারণা নিয়ে থাকেন এই মেয়ে কি মানিয়ে নেবে, মানিয়ে নেওয়া কি এ বোঝে না-কি! একবার ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে দেখুন, পড়াশোনা জানা মেয়েরাই জীবনে সবচেয়ে বেশি মানিয়ে নিয়ে চলে। আমরা তার লড়াইয়ের গল্প জানিনা কিন্তু তকমাটা লাগিয়ে দেই সহজেই!

আমার খুব করে বলতে ইচ্ছে করছিলো, আপু, সমাজ আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কিন্তু সমাজ আমাদের জীবন নয়! বিয়েই কি একটা মেয়ের গন্তব্য? হ্যাঁ, বিয়েটা ইম্পর্ট্যান্ট কিন্তু স্বপ্নটা…..?!

একটা মেয়ের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবাটা অন্যায়? নিজেকে নিয়ে ভাবাটা কি অন্যায়? এইজন্য প্রতি পদে পদে তাকে পিষতে থাকবে এই মানসিক বিকারগ্রস্ত সমাজ? আমি মাঝেমাঝে অবাক হয়ে যাই, সত্যি কি মেয়েরা আজ স্বাধীন কিন্তু আমি তো দেখি মেয়েরা আজও পরাধীনতার শিকলে বন্দি! একটা মেয়েকে এটা বুঝিয়ে বড় করা হয় যে এটা তার আসল বাড়ি নয়, বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই তার আসল বাড়ি অথচ শ্বশুরবাড়িতে বরাবর পরের মেয়ে বলে সম্বোধন পাওয়াটাই তার গন্তব্য?

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, মেয়েদের কি আসল বাড়ি বলে সত্যিই কিছু আছে? মেয়েদের নিজের বাড়ি আসলে কোনটা? বাবার বাড়ি না শ্বশুরবাড়ি! মেয়েদের নিজের বাড়ি বলে আসলেই কি কিছু আছে? কবে এসব থেকে মুক্ত হবে সমাজ? কবে! নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখাটা কবে বিয়ে শব্দটাতে গিয়ে শেষ হবে না? কবে!

‘মেয়ে’ শব্দটাই একটা শিকল হয়ে গেছে যেন। তোমার স্বপ্ন দেখতে নেই, কারণ তুমি ‘মেয়ে’। তোমার কষ্ট পেতে নেই, সহ্য করে নিতে হয় কারণ তুমি ‘মেয়ে’। হাজারো অত্যাচারে তোমার মুখ খুলতে নেই, কারণ তুমি ‘মেয়ে’। পড়াশোনা শিখে নিজস্বতা গড়তে যেওনা, কারণ তুমি ‘মেয়ে’। ক্যারিয়ার নিয়ে তোমার ভাবা যাবে না, কারণ তুমি ‘মেয়ে’। তোমার গন্তব্য তো ‘বিয়ে’!

‘মেয়ে’ শব্দটা মাঝেমাঝে আমার কাছে অভিশাপের মতো লাগে। এটা করো না, ওটা করো না, না, না আর না! এই সমাজ, এই পরিবার কবে বুঝবে ‘বিয়ে’ শব্দটার বাহিরে মেয়েদের একটা জগৎ আছে। মেয়েদের নিজের জন্য কিছু করা দরকার। একটা সংসারে ছেলের মতো মেয়েটাকে সমানভাবে এগিয়ে দিতে কবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে সমাজ, পরিবার! কবে? কবে!

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »