Ultimate magazine theme for WordPress.

ঢাকার সেরা দর্শনীয় স্থান গুলোর তালিকা ও তাদের ইতিহাস!

ঢাকার ৩০টি সেরা দর্শনীয় স্থান ও তাদের ইতিহাস

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা অনলাইন ডেস্ক ♦

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে নতুন আরেকটি দেশের উদ্ভব হয়। তার রাজধানী হয় ঢাকা। সে হিসেবে বাংলাদেশের বয়স এখন ৪৯ বছর। আর বছর খানেক বাদে পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ উদযাপন করবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। বাংলাদেশ ৫০ বছরে পদার্পণ করলেও বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত এর রাজধানী ঢাকার রয়েছে অনেক প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আজ থেকে ৪০০ বছর পূর্বে সপ্তদশ শতকে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে “মসজিদের শহর” কিংবা “বিশ্বের রিকশার শহর” নামে পরিচিত ঢাকা শহরের প্রতিষ্ঠা হয়। এক সময় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ী, বণিক-সওদাগরগন বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে ঢাকায় যাতায়াত করতেন। এখানে বিশ্বের সেরা ঐতিহ্যবাহী মসলিন কাপড় উৎপাদিত হতো। বিখ্যাত বারোভূঁইয়া এবং ঐতিহ্যবাহী নবাবদের দ্বারা পরিচালিত হতো ঢাকার শাসনকার্য।

রূপবৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ প্রাকৃতিক লীলাভূমি বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো ঢাকায় অতটা প্রাকৃতিক রূপ বৈচিত্র পরিলক্ষিত হয় না। তথাপি ইট-পাথর ও কংক্রিটে গড়া এই নগরীর বিরামহীন খেটে খাওয়া মানুষদের খানিক বিশ্রাম ও স্বচ্ছ নিঃশ্বাস গ্রহণের সুবিধার্থে কিছু কিছু স্থানে এখনো প্রকৃতির ছোঁয়া বিরাজমান। ধানমন্ডি লেক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা, মৈনট ঘাট, সাদুল্লাপুর গ্রাম, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, ক্রিসেন্ট লেক, বলধা গার্ডেনসহ আরো কিছু জায়গা সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। ছুটির দিন কিংবা অবসর সময়ে নগরীর সিংহভাগ মানুষ তাদের ক্লান্তি ঘোঁচাতে অথবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবলোকন করতে এসব স্থানসমূহে প্রশান্তির আশায় দলবেঁধে ছুটে আসেন।

তবে এ সকল প্রাকৃতিক স্থান ছাড়াও ঢাকা শহরের মূল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে কিছু প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার মাধ্যমে। এ সকল স্থাপনা আমাদেরকে মুঘল, আর্মেনীয়, নবাব, কিংবা ব্রিটিশদের কথা মনে করিয়ে দেয়।

তাহলে চলুন দেখা যাক ঢাকার সেরা দর্শনীয় স্থান গুলোর তালিকা ও তাদের ইতিহাস ! :-

১। আহসান মঞ্জিল

আহসান মঞ্জিল

বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ঢাকায় নবাবদের আবাসিক প্রাসাদ হলো আহসান মঞ্জিল। বর্তমানে এটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হাজার ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে এর নির্মান কাজ সমাপ্ত হয়। নবাব আব্দুল গনি তার পুত্র খাজা আহসানুল্লাহ এর নামানুসারে এর নামকরণ করেন আহসান মঞ্জিল। তৎকালীন সময়ে এই প্রাসাদটিকে রংমহল বলা হত। ১৯০৬ সালে এখানে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়।

এই প্রাসাদটির ছাদের উপর সুন্দর একটি গম্বুজ আছে। এর ত্রি-তোরণ বিশিষ্ট প্রবেশদ্বারটিও অনেক সুন্দর। তেমনিভাবে উপরে উঠার সিঁড়িগুলোও দৃষ্টিনন্দন। এর সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের মনোরম দুটি খিলান। যা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর অভ্যন্তরে রয়েছে বৈঠকখানা, পাঠাগার, নাচঘর, আবাসিক কক্ষ। রয়েছে বলরুম, গোলঘর, ড্রয়িংরুম, কার্ডরুম, লাইব্রেরি কক্ষ, সিঁড়িঘর, হিন্দুস্থানী কক্ষ, সিন্দুক কক্ষ, বিলিয়ার্ড কর্ড, মুসলিমলীগ কক্ষ, মেমোরিয়াল হাসপাতাল, ডাইনিং রুম। আরোও আছে ভোজন কক্ষ ও দরবার গৃহ। এর রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা। বারান্দা ও কক্ষগুলোর মেঝে মার্বেল পাথরে শোভিত। এসব ঘরগুলো সাজানো রয়েছে নানা রকম তৈজসপত্র, কাটগ্লাসের ঝাড়বাতি, বড় বড় কাঠের আলমারি, কাঁচ ও চীনা মাটির তৈজসপত্র, বিলিয়ার্ড টেবিল, বৃহদাকার লোহার সিন্দুক, শো-কেস, ক্রিস্টাল চেয়ার, ফুলদানি, খেলার সামগ্রীসহ অনেক দামী দামী আসবাবপত্র। দেয়ালগুলোয় শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের তৈলচিত্র, ঢাল-তরবারী, হাতির মাথার কঙ্কাল, বর্শা, বল্লম, নওয়াবদের আমলের বিভিন্ন জীবজন্তু সিং ও নওয়াবদের বংশ তালিকা ইত্যাদি। এ জাদুঘরে এ যাবত সংগৃহীত নিদর্শন সংখ্যা মোট ৪০৭৭টি। এর দক্ষিন দিকের গাড়ি বারান্দার উপর দিয়ে দোতলার বারান্দা থেকে একটি সুবৃহৎ সিঁড়ি সামনের বারান্দা দিয়ে নদীর ধার পর্যন্ত নেমে গেছে। প্রাসাদের বহিরাংশে রয়েছে প্রশস্ত খোলা জায়গা। আর রয়েছে সুবিস্তীর্ণ আকাশ। যেখানে রয়েছে গল্প আসরের সুন্দর ব্যবস্থা।

২। লালবাগ কেল্লা

এর অপর নাম কিলা আওরঙ্গবাদ। ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত এ দূর্গটি একটি মুঘল স্থাপত্য নিদর্শন। যা সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র সুবাদার মুহাম্মদ আজম শাহ ১৬৭৮ সালের দিকে নির্মাণ শুরু করেন। তার বিদায়ের পর সুবাদার শায়েস্তা খাঁ এর নির্মাণ কাজ শুরু করলেও এর শেষ করেননি। এই দুর্গটিতে ৩টি স্থাপনা রয়েছে।

ক. দিওয়ান-ই-আম

দিওয়ান-ই-আম

পূর্ব দিকের এই স্থাপনাটি দ্বিতল বিশিষ্ট। নিচতলায় রয়েছে একটি হাম্মামখানা। উপরের তলায় দরবার হল। ধারণা করা হয় শায়েস্তা খাঁ এই ঘরে বসবাস করতেন। দরবার হল টিতে রয়েছে মুঘল আমলের বিভিন্ন মুদ্রা, অস্ত্রশস্ত্র, হাতে লেখা কোরআন, তৈজসপত্র ইত্যাদি।

খ. পরীবিবির মাজার

পরীবিবির মাজার

শায়েস্তা খাঁর কন্যা ইরান দুখত রাহমাত বানু যাকে পরিবিবি নামেও ডাকা হতো। তার মৃত্যুর পর দিওয়ান-ই- আম ও শাহী মসজিদের মাঝখানের এ স্থাপনাটিতে তাকে সমাহিত করা হয়। মূল্যবান মার্বেল পাথর, কষ্টিপাথর আর বিভিন্ন ফুল ও পাতার নকশা করা টালি দিয়ে মাজারের ৯টি ঘর সাজানো রয়েছে।

গ. তিন গম্বুজ বিশিষ্ট শাহী মসজিদ

তিন গম্বুজ বিশিষ্ট শাহী মসজিদ

সম্রাট আওরঙ্গজেব এর তৃতীয় পুত্র শাহজাদা আজম শাহ এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি মুঘল মসজিদের আদর্শ উদাহরণ। বর্তমানেও মসজিদটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

এছাড়াও এখানে রয়েছে একটি বর্গাকৃতির পানির ট্যাংক, দুর্গ প্রাচীর ও একটি রহস্যময় গুপ্তপথ। জনশ্রুতি আছে এ দুর্গ থেকে বুড়িগঙ্গার তলদেশ দিয়ে জিনজিরা প্রাসাদ ও নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা দুর্গের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। ছোটবেলায় আরেকটি কথা শুনেছি যে, কেউ এই সুড়ঙ্গে প্রবেশ করলে সে আর ফিরে আসে না। যদিও ইতিহাসে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

৩। রোজ গার্ডেন প্যালেস

রোজ গার্ডেন প্যালেস

এটি ঢাকার টিকাটুলি এলাকায় অবস্থিত। ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ঋষিকেশ দাস ১৯৩১সালে ২২ বিঘা জমির উপর এ প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি দেউলিয়া হয়ে গেলে খান বাহাদুর আব্দুর রশিদ কিনে নেন। এর চারপাশে দেশি-বিদেশি প্রচুর গোলাপ গাছ থাকায় এর নাম হয় রোজ গার্ডেন প্যালেস। অবশ্য এখন আর সেই গোলাপ বাগান নেই। প্রাসাদটির স্থাপত্যে করিন্থীয়-গ্রিক শৈলী অনুসরণ করা হয়েছে। এর ৬টি থামে লতাপাতার কারুকাজ করা। ডান পাশে একটি শান বাঁধানো ঘাট রয়েছে। বাগানে আছে মার্বেল পাথরের মূর্তি। একটি কৃত্রিম ফোয়ারা। অবশ্য ফোয়ারা দিয়ে এখন আগের মত পানি বের হয় না। ওপরের নাচঘর, নিচের বৈঠকখানা সহ এই প্রাসাদটিতে মোট ১৩টি ঘর আর কিছু শ্বেত পাথরের মূর্তি রয়েছে। নির্মাণশৈলীর অভিনবত্বে এই ভবনটি অনন্য। সামান্য বর্ণনায় এর সৌন্দর্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। রোজ গার্ডেন প্যালেস ১৯৭০ সাল থেকে নাটক ও সিনেমার শুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। ১৯৪৯ সালের ২৩ শে জুন এই বাড়িতেই বর্তমান আওয়ামী লীগ গঠনের পরিকল্পনা হয়। গতবছর বাংলাদেশ সরকার ৩৩১ কোটি টাকা মূল্যে এই প্রাসাদটি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

৪। জিনজিরা প্রাসাদ

জিনজিরা প্রাসাদ

অপূর্ব কারুকার্য খচিত মুঘল স্থাপত্য-শৈলীর অনুপম নিদর্শন জিনজিরা প্রাসাদ। ১৬২১ সালে তৎকালীন সুবাদার ইব্রাহিম খাঁ বুড়িগঙ্গার ওপারে এই ‘নওঘরা’ প্রাসাদটি অবকাশ যাপন ও চিত্তবিনোদনের প্রান্ত নিবাস হিসেবে বড় কাটরার আদলে নির্মাণ করেছিলেন।

স্থানীয়রা একে হাভেলি নগেরা বা হাওলি নগেরা বলে। অযত্ন অবহেলায় ক্রমশঃ জৌলুস হারানো এ প্রাসাদটির ৩টি বিশেষ অংশ আজও টিকে আছে। সেগুলো হলো প্রবেশ তোরণ আর পৃথক দুটি স্থানে দুটি প্রাসাদ। একটি ৩ তলা দেখতে ফাঁসির মঞ্চ বা সিঁড়িঘর বলে মনে হয় ও অন্যটি অজ্ঞাত প্রমোদগার। দুটি অষ্টভুজাকৃতির পার্শ্ববুরুজ। পশ্চিমাংশে দুটি সমান্তরাল গম্বুজ। মাঝ বরাবর ঢাকনাবিহীন অন্য আরেকটি গম্বুজ ও পূর্বাংশে চৌচালা কুঁড়েঘরের আদলে পুরো প্রাসাদের ছাদ। প্রাসাদের পূর্বাংশের ছাদ থেকে একটি সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে। মাঝখানে অপূর্ব কারুকার্যখচিত প্রকাণ্ড প্রাসাদ তোরণ। এর পূর্বেই সুড়ঙ্গ পথ। যা দিয়ে মুঘল সেনাপতি ও কর্মকর্তারা লালবাগ কেল্লার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতো। জিনজিরা প্রাসাদ এর সাথে অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার এক বিষাদময় স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর তার পরিবার-পরিজনদের এ প্রাসাদে দীর্ঘ ৮ বছর বন্দী করে রাখা হয়েছিলো।

৫। কার্জন হল

১৯০৪ সালে লর্ড কার্জন এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯০৮ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। কার্জন হল মূলত নির্মিত হয়েছিল ঢাকা কলেজের নতুন ভবন হিসেবে। প্রথম দিকে এটি ঢাকা কলেজের লাইব্রেরী হিসেবে ব্যবহার হতো। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে এটি ঢাকা কলেজের মূল ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ভবনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের অধীনে চলে যায়।

কার্জন হল

এই ভবনটি নির্মাণে ভিক্টোরীয় স্থাপত্যরীতি মুসলিম ও মুঘল স্থাপত্য শৈলী অনুসরণ করা হয়েছে। ভবনের বহির্পৃষ্ঠে কালচে লাল রঙের ইট যে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এর খিলান ও গম্বুজগুলোও অসাধারণ। ১৯৪৮ সালের ২৪ শে মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ বক্তব্যের বিরুদ্ধে কার্জন হল থেকেই সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেছিল।

৬। খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ

১৭০৬ সালে নায়েবে নাজিম ফররুখ শিয়ারের শাসনামলে ঢাকার প্রধান কাজী এবাদুল্লাহর আদেশে পুরানো ঢাকার আতশখানায় খান মোহাম্মদ মৃধা এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। লালবাগ কেল্লার অনতিদূরেে ১৭ ফুট প্ল্যাটফর্মের ওপর দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদটি নির্মিত। সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক নির্মিত দিল্লির লালকেল্লার সাথে এই মসজিদের অল্পবিস্তর সাদৃশ্য রয়েছে। মোহাম্মদপুরের সাত গম্বুজ মসজিদ ও সেই সময়ে নির্মিত মুঘল স্থাপত্যরীতির মত এ স্থাপত্যেও অভিন্ন মুঘল শিল্পকলার সমাবেশ ঘটেছে। তিনটি বড় গম্বুজ ও অল্পকিছু লম্বা মিনার বিশিষ্ট এ স্থাপনাটির চারদিকে প্রাচীর বেষ্টিত। লাল ইট আর চুনাপাথরের মিশ্রণে স্থাপনাটির রং অনেকটা পোড়ামাটির মত।

মসজিদের বহিরাংশে রয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তর। ডান পাশটায় শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষের দৃষ্টিনন্দন বাগান। বাগানের পাশেই রয়েছে একটি পরিত্যক্ত কুয়া। আগে এই কুয়া থেকেই মসজিদের পানি সরবরাহ করা হতো। জনশ্রুতি আছে ঢাকার এই প্রাচীন মসজিদে জ্বিনের আনাগোনা রয়েছে। প্রায় সোয়া তিনশ বছর অতিক্রান্ত হলেও খান মোহাম্মদ মৃধার এ স্থাপনাটি মুসল্লিদের পদচারণায় আজও জমজমাট। জৌলুস কমেনি এতোটুকুও। তিলোত্তমা এ ভবনটি নিঃসন্দেহে অপরূপ এক নিদর্শন হয়ে আজও সাক্ষ্য বহন করে চলেছে মুঘল অভিজাত্যের।

৭। হোসেনী দালান

কারবালার প্রান্তরে হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত বরণ কে স্মরণ করার জন্য ১৬৪২ সালে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের ছেলে শাহ সুজার নির্দেশে সৈয়দ মুরাদ নামে প্রভাবশালী এক ব্যক্তি বর্তমান পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের নিকটে এই ইমামবাড়া /হোসেনী দালান নির্মাণ করেন। ৯৩৮০ বর্গফুট জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে শিয়া মুসলিমদের উপাসনালয়টি। বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করা এই স্থাপনাটি সর্বশেষ ইরান সরকারের উদ্যোগে ২০১১ সালে সংস্কার করা হয়। ফলে ইরানের ধর্মীয় স্থাপনার বাহ্যিক রূপ ও নান্দনিকতা এতে প্রতিফলিত হয়েছে। এটি একটি উঁচু মঞ্চের উপর স্থাপিত।

হোসেনী দালান

প্রবেশ পথে রয়েছে বড় বাগান ও দিঘি। পুরো ভবনটি চমৎকার কারুকার্যময়। ভবনের সামনের জলাশয় এর সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ভিতর দুটি বড় হলঘর রয়েছে। রয়েছে আরো কয়েকটি কক্ষ। দক্ষিণ দিকের সম্মুখভাগে তিনতলা বহুভুজ ফাঁপা বুরুজ রয়েছে। বুরুজগুলির শীর্ষে রয়েছে গম্বুজ। ইমারতের কোথাও কোথাও পুরানো আমলের স্থাপত্যের চিহ্ন দেখা যায়। দালানটি সাদা বর্ণের। এর ফটক, দেয়াল ও থামগুলোতে ইরান থেকে আমদানি করা নীল রংয়ের টাইলস লাগানো। টাইলস গুলোতে বিভিন্ন সুরা ও আয়াতের ক্যালিগ্রাফি বা লিপিচিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। হোসেনী দালানে আরো রয়েছে শিয়াদের কবরস্থান। আঙ্গিনার শেষে রয়েছে মুঘল আমলে নির্মিত একটি ফটক। এর শান্ত ও নিবিড় পরিবেশ মনে প্রশান্তি এনে দেয়। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে হোসেনী দালানের চমৎকার একটি রুপার রেপ্লিকা রয়েছে।

৮। ঢাকেশ্বরী মন্দির

হিন্দু ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী কিংবদন্তি অনুসারে দক্ষ রাজার কন্যা সতী পতিনিন্দা সহ্য করতে না পেরে দেহ ত্যাগ করলে শোকে মুহ্যমান মহাদেব সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করেন। সেই সময় বিশ্বচরাচর ধ্বংসের উপক্রম হয়। তখন নারায়ণ সুদর্শন চক্র সহযোগে সতীর দেহ খন্ড করতে থাকেন। এভাবে সতীর দেহ ৫১টি খন্ডে পরিণত হয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে পতিত হয়। এই প্রতিটি স্থানকে এক একটি সতীপীঠ বলে। সতীদেহের উজ্জ্বল কীরিটের ‘ডাক’ তথা উজ্জ্বল গয়নার অংশবিশেষ এই স্থানে পতিত হলে এই স্থানের নাম হয় ঢাকা। আর ঢাকা থেকে ঢাকেশ্বরী।

ঢাকেশ্বরী মন্দির

আরেকটি কিংবদন্তি অনুসারে ১২শ শতাব্দীতে রাজা বল্লাল সেন শৈশবে জঙ্গলে ঢাকা অবস্থায় একটি মূর্তি পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে সিংহাসনে আরোহনের পর সেই স্থানে একটি মন্দির স্থাপন করেন। আর মন্দিরটির নামকরণ করেন ঢাকা+ঈশ্বরী=ঢাকেশ্বরী করে।

অবশ্য ঢাকেশ্বরী মন্দির এর ইতিহাস সম্পর্কে নানা কাহিনী প্রচলিত আছে। তবে বর্তমান মন্দিরটি ২০০ বছরের পুরনো। এবং দেবী ঢাকেশ্বরীর ৮০০ বছরের পুরনো আসল বিগ্রহটি কলকাতার শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার মন্দিরে রয়েছে। দেশভাগের সময় একে সরিয়ে ফেলা হয়। বর্তমানে মন্দিরে থাকা বিগ্রহটি মূল মূর্তির প্রতিরূপ। বাংলাদেশের জাতীয় এই মন্দিরটি পলাশী ব্যারাক এলাকায় ঢাকেশ্বরী রোডের উত্তর পার্শ্বে একটি অনুচ্চ আবেষ্টনী প্রাচীরের মধ্যে অবস্থিত। প্রবেশের জন্য রয়েছে একটি সিংহদ্বার। মূল ফটক দুইটি। মাঝখানেও একটি ফটক রয়েছে। রয়েছে নাটমন্দির। যেখানে রয়েছে নানা রকম অলঙ্কার সুসজ্জিত দুর্গা দেবীর প্রতিমা।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরটি কয়েকটি মন্দির ও সংলগ্ন সৌধের সমষ্টি। এখানে রয়েছে কয়েকটি মন্দির, একটি পান্থশালা ও বেশ কয়েকটি ঘর। পশ্চিমে রয়েছে একটি পুরনো দিঘী।একটি প্রাচীন বট গাছ, কয়েকটি সমাধি। রয়েছে মহানগর পূজা মন্ডপ। মূল মন্দিরের ভবনগুলি উজ্জ্বল হলুদাভ লাল বর্ণের। রয়েছে চারটি শিবমন্দির, নিজস্ব লাইব্রেরী। বর্তমানে মন্দিরটিকে আরো সুন্দর ভাবে সাজানো হয়েছে। নানা জাতের ফুল গাছ দিয়ে মন্দিরটির অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যকে আরও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর স্থাপত্যরীতি, গঠনবিন্যাস ও শিল্পচাতুর্য মন্দিরটির সামগ্রিক দৃশ্যকে মাধুর্যমন্ডিত করে তুলেছে।

৯। আর্মেনিয়ান চার্চ

আর্মেনিয়ান চার্চ

পুরানো ঢাকার আরমানিটোলায় ১৭৮১ সালে ঢাকায় ব্যবসায়ীক কাজে বসবাসরত আর্মেনিয়ানদের জন্য এই চার্চটি নির্মিত হয়। এর নাম দেয়া হয় চার্জ অফ দা হোলি রিজারেকশন। ১৬০৮ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ঢাকাকে সুবহে বাংলার রাজধানী করলে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের আনাগোনা শুরু হয়। তখন আর্মেনিয়ানরাও ব্যবসার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আগমন করেন। এবং বর্তমান আরমানিটোলায় বসবাস করতে থাকেন। তাদের নামানুসারে ঐ জায়গার নাম হয় আরমানীটোলা। এমনকি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ীর প্রচলনও তারাই করেন।

গির্জাটি নির্মাণের পূর্বে এখানে একটি আর্মেনীয় কবরস্থান ও ছোট একটি উপসনালয় ছিল। গির্জার ফটকটিতে চমৎকার কারুকাজ করা। অন্যসব ক্যাথলিক/ব্যাপ্টিস্ট চার্চ থেকে এই চার্চ সম্পূর্ণ আলাদা। আর্মেনীয়দের নিজস্ব স্থাপত্য রীতিতে তৈরী গির্জাটি লম্বায় সাড়ে ৭০০ ফুট। চারদিকে উঁচু প্রাচীর বেষ্টিত। গির্জার চতুর্পাশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য আর্মেনীয় কবর। কবরগুলোতে রয়েছে শ্বেতপাথর, বেলেপাথর, মার্বেলপাথর আর কষ্টিপাথরের তৈরি এপিটাফ। এপিটাফগুলোতে মৃত ব্যক্তির নাম জন্ম ও মৃত্যু সাল ছাড়াও খোদাই করা আছে কাব্যিক ভাষায় আবেগপূর্ণ শোকগাঁথা ও ধর্মগ্রন্থের বাণী।

একটি কবরের উপর আছে অবেলিস্ক। ওবেলিস্কের উপর মার্বেল পাথরের তৈরি মাদার মেরির একটি হাত ভাঙ্গা ভাস্কর্য। গির্জাটি লম্বায় ২৭ ফুট। সম্পূর্ণ গির্জাটিতে রয়েছে ৪টি দরজা ও ২৭টি জানালা। গির্জার তিন দিক ঘিরে রয়েছে বারান্দা। ভবনের শেষ মাথায় রয়েছে একটি ষড়ভুজ আকৃতির টাওয়ার। টাওয়ারের ভেতরে রয়েছে একটি ঘন্টা। অবশ্য ১৮৮০ সাল থেকে ঘন্টা বাজানো বন্ধ হয়ে গেছে। ঘন্টা ঘরের পাশে ক্লক টাওয়ার হিসেবে একটি সুদৃশ্য গির্জাচূড়া ছিল। যা ১৮৯৭ সালে বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ভেঙে যায়। অবশ্য পরবর্তীতে এর সংস্কার করা হয়।

সমগ্র গির্জাটিতে সাদা রং করা। কলাম ও রেলিং এর ধার গুলোতে হলুদ রং দিয়ে নকশা করা। চার্চের ভিতরে রয়েছে সারি সারি ব্যাঞ্চ। রয়েছে একটি বেদি। বেদির ওপর যিশুখ্রিস্টের বিশাল ছবি। উপরে উঠার জন্য সুদৃশ্য প্যাঁচানো একটি কাঠের সিঁড়ি। উপরে নারী ও শিশুদের জন্য সংরক্ষিত গ্যালারি যুক্ত একটি স্থান। চার্চ প্রাঙ্গণের শেষ মাথায় লাল ইটের প্রাচীন একটি বাড়ি রয়েছে। এখানে চার্চের ওয়ার্ডেন থাকতেন। চার্চটির বর্তমান ওয়ার্ডেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত জনৈক আর্মেনীয় আর্মেন আর্স্লেনিয়ান। তিনিই চার্চটির খোঁজখবর রাখেন। তার অনুপস্থিতিতে শংকর ঘোষ নামে এক হিন্দু ৩২ বছর ধরে চার্চটি দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এই চার্চ এখনো পরিচালনা করছেন আর্মেনীয়দের শেষ বংশধররা। এই চার্চে এখন আর নিয়মিত প্রার্থনাসভা বসে না। মাঝে মাঝে অনিয়মিত কিছু অনুষ্ঠান ও প্রার্থনা হয়। তবুও ঢাকার বুকে আর্মেনিয়ানদের স্থাপিত একমাত্র ঐতিহাসিক এই আর্মেনিয়ান গির্জাটি যুগ যুগ ধরে আর্মেনীয়দের ইতিহাস ও স্মৃতি বহন করছে।

১০। রূপলাল হাউজ

পুরানো ঢাকার ফরাশগঞ্জের শ্যামবাজারে অবস্থিত রূপলাল হাউজ। ঢাকার বিখ্যাত আর্মেনীয় জমিদার আরাতুন ১৮২৫ সালে এ ভবনটি নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে রূপলাল ও রঘুনাথ দুই সহোদর এটি কিনে পুনঃনির্মাণ করেন। এটি ৯১.৪৪ মিটার দীর্ঘ একটি দ্বিতল ভবন। প্রস্থ ১৮.৩০ মিটার। তখনকার যুগের অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই স্থাপত্যটি ইংরেজি  আকৃতিতে তৈরি। এর ডিজাইন করেছিলেন কলকাতার মার্টিন এন্ড কোম্পানীর একজন স্থপতি।

রূপলাল হাউজ

দ্বিতল এই ভবনের স্থাপত্যশৈলী অভিনব। কয়েক ধরনের স্থাপত্যরীতির মিশেলে তৈরি এই ভবন। বাড়ির প্রবেশ পথ আর্মেনিয়ান ধাঁচের। প্রবেশপথের বিশাল কলামগুলো তৈরি ক্লাসিক করিন্থিয়ান স্টাইলে। খিলানের টিমপেনামে রয়েছে রঙ্গীন কাঁচের অলংকরণ। ছাদ আর মেঝেতে অসাধারণ কারুকাজ করা। ছাদটি নির্মিত হয়েছিল করিন্থীয় রীতিতে। এর ওপরে রয়েছে রেনেসাঁ যুগের কায়দায় নির্মিত পেডিমেন্ট। সমতল ছাদের কয়েকটি স্থানে তিনটি চিলেকোঠা আছে। ভবনটির দোতলায় দুটি অংশে বিভিন্ন আয়তনের ৫০টিরও বেশি কক্ষ রয়েছে। রয়েছে কয়েকটি প্রশস্ত দরবার কক্ষ। পশ্চিম দিকে রয়েছে একটি আকর্ষণীয় নাচঘর। যার মেঝে কাষ্ঠনির্মিত।

পুরো বাড়ি জুড়ে দক্ষিণ আর উত্তর পার্শ্বে বাতাস টেনে আনার জন্য রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা। বারান্দা দুটি ইট নির্মিত সেমি-করিন্থীয় স্তম্ভের ওপর সংস্থাপিত। ভবনের দরজা ও জানালা গুলোতে কাঠের ভেনিসীয় গ্রিল সমন্বিত পাল্লা ব্যবহৃত হয়েছে। জানালার ফ্রেম ফ্রেঞ্চ ক্লাসিক্যাল স্টাইলের রঙিন কাঁচে মোড়ানো। রূপলাল হাউজের পেছনদিকে প্রবাহমান বুড়িগঙ্গা নদী। নদীর দিকে সম্মুখভাগে আরবান স্কেল এর একটি ঘড়ি ছিল।১৮৯৭ সালে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ে সেটা ভেঙে যায়। অনেকে দাবি করেন এটি লন্ডনের বিগ ব্যান থেকে অনুপ্রাণিত ছিল। একসময় ভবনের আঙিনায় ছিল দুটি প্রশস্ত পাকা করা উঠান। বাড়ির তিনদিকে ছিল বিস্তৃর্ণ জায়গা। ভবনের এক পাশে ছিল রঘুবাবুর বাগান আরেক পাশে ছিল শ্যামবাজার পুল। কালের বিবর্তনে অযত্ন-অবহেলায় দখলদারদের করালগ্রাসে এগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। রূপলাল বাবু তার সৌখিন, বিলাসী ও সৃষ্টিশীল চিত্তের সুনিপুণ প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন রূপলাল হাউজের মাধ্যমে।

জানা যায় একদা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রানী আলেক্সান্দ্রিনা ভিক্টোরিয়ার কলকাতা ও ঢাকায় অতিথি হিসাবে আসার কথা ছিল। সে উপলক্ষে কলকাতায় নির্মাণ করা হয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল। ঢাকায় নতুন করে কিছু বানানো হয়নি। তবে সেই সময় ঢাকায় নবাব পরিবারের আহসান মঞ্জিল ও দাস পরিবারের রূপলাল হাউজ এ দুটি ভবন ছিল সবচেয়ে বিলাসবহুল। বলা হয়ে থাকে নবাবদের সাথে দাস পরিবারের প্রতিপত্তির প্রতিযোগিতা সব সময় লেগে থাকত। সুতরাং রানীকে আতিথ্য দেয়ার ক্ষেত্রেও এই দুই প্রাসাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও ভোটাভুটি হয়।

সে উপলক্ষে ১৯৮৮ সালে তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন কিছু ব্রিটিশ সাহেব নিয়ে সরেজমিনে দুটি বাড়ি দেখে গিয়েছিলেন। এ সময় তার সম্মানে রুপলাল হাউজে একটি বল নাচবল নাচের আয়োজন করা হয়। লর্ড ডফরিন রুপলালের বিলাসবহুল বাড়ি ও তার আয়োজনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। ফলে ভোটাভুটিতে রূপলাল হাউজ জিতে যায়। অবশ্য পরে রানী ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল কিংবা রূপলাল হাউজ কোনটিতেই আসেননি।

রুপলাল ছিলেন সংস্কৃতমনা। তার বিখ্যাত জলসাঘরে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত ও নৃত্য শিল্পীরা আসতেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ ওয়ালীউল্লাহ খাঁ, লক্ষ্মী দেবীর সুর-তালে ও শান শওকতে ঝংকৃত হতো বুড়িগঙ্গার দিকে মুখ করা এই জলসাঘর। অবশ্য এসবই এখন ইতিহাস। দেশভাগের পর দাস পরিবার ঢাকা ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমান। আস্তে আস্তে রুপলাল হাউজ তার জৌলুস হারাতে থাকে। একসময় তা চলে যায় সবজি ও মসলা ব্যবসায়ীদের দখলে। তবে কিছুদিন পূর্বে বাংলাদেশ সরকার দখলদারদের হাত থেকে রূপলাল হাউজটি উদ্ধার করে সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রেখেছে।

১১। বাহাদুর শাহ পার্ক

বাহাদুর শাহ পার্ক

পুরানো ঢাকার সদরঘাটের সন্নিকটে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্ক। এর পশ্চিমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং উত্তর পশ্চিমে জেলা আদালত অবস্থিত। পূর্বে এর নাম ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবে শহীদ বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে সিপাহী যুদ্ধের ঐক্যের প্রতীক বাহাদুর শাহ জাফরের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক।

১২।  বলধা গার্ডেন

বলধা গার্ডেন

ওয়ারীতে অবস্থিত এটি একটি উদ্ভিদ উদ্যান। বলধার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ৩.৩৮ একর জমির ওপর ১৯০৯ সালে উদ্যানটি নির্মাণের কাজ আরম্ভ করেন। যা শেষ হতে সময় লেগেছিল প্রায় ৮ বছর। বিরল প্রজাতির ৮০০ গাছসহ বাগানটিতে প্রায় ১৮ হাজার গাছ রয়েছে। বর্তমানে এখানে ৬৭২ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। বাগানটিতে এমনও অনেক প্রজাতির গাছ রয়েছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোথাও নেই।

জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ওয়ারী, টিকাটুলী ও নারিন্দার ঠিক মাঝখানে দু’টি ভাগে বলধা গার্ডেন তৈরি করেছেন। বলধা গার্ডেনের এক পাশের নাম সাইকি এবং অপর পাশের নাম সিবিলি। বলধা গার্ডেনের সাইকি অংশটিতে সবার যাওয়ার অনুমতি নেই। এটা বন্ধ করে রাখা হয়। কারণ এমন কিছু দুর্লভ প্রজাতির গাছ রয়েছে যা মানুষের আনাগোনায় নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সাইকিতে রয়েছে নীল, লাল ও সাদা শাপলাসহ রঙ্গিন পদ্মা, তলা জবা, অপরাজিতা, ক্যাকটাস, পামগাছ, জবা, প্রভৃতি। এখানে আরো রয়েছে ‘সেঞ্চুরি প্লান্ট’ নামক শতবর্ষে একবার ফোটা ফুলের গাছ।

সপ্তাহের প্রতিদিনই এটি সকাল ৮টা থেকে ১১টা এবং ২টা থেকে ৫টা খোলা থাকে।

১৩। ওসমানি উদ্যান ও বিবি মরিয়ম কামান

১৭ শতকে সম্রাট জাহাঙ্গীর ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপন করলে রাজধানী ঢাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে বেশ কিছু কামান তৈরি করা হয়। এসব কামানের মধ্যে “কালে খাঁ জমজম” ও “বিবি মরিয়ম” বিশালত্বে, নির্মাণ শৈলীতে ও সৌন্দর্যে ভারতখ্যাত হয়ে ওঠে।

“কালে খাঁ” বুড়িগঙ্গা নদীতে তলিয়ে গেলে বিবি মরিয়ম হয়ে ওঠে দর্শনীয় বস্তু। বিবি মরিয়মের দৈর্ঘ্য ১১ ফুট। মুখের ব্যাস ৬ ইঞ্চি। ঢাকার কামান তৈরীর কারিগর জনার্ধন কর্মকার অত্যন্ত শক্ত পেটানো লোহা দিয়ে কামানটি তৈরী করেন।

ওসমানি উদ্যান ও বিবি মরিয়ম কামান

সুবাদার মীর জুমলা ১৬৬১ সালে আসাম অভিযানের সময় ৬৭৫ টি কামান ব্যবহার করেন তার মধ্যে বিবি মরিয়ম ছিল সর্ববৃহৎ। যুদ্ধ বিজয়ের স্মারক হিসেবে তিনি বিবি মরিয়মকে বড় কাটরার দক্ষিণে সোয়ারীঘাটে স্থাপন করেন। তখন কামানটি মীর জুমলার কামান নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৮৪০ সালে তৎকালীন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ওয়ালটারস ঢাকার চকবাজারে এটিকে স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ১৯২৫ সালে বিবি মরিয়মকে সদরঘাটে স্থাপন করা হয়। গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিবি মরিয়মকে সদরঘাট থেকে এনে শহরের শোভাবর্ধনের জন্য ঢাকার কেন্দ্র স্থল গুলিস্থানে স্থাপন করা হয়।

১৯৮৩ সালে বিবি মরিয়ম কে গুলিস্থানের মোড় থেকে উঠিয়ে এনে ওসমানী উদ্যানের প্রধান ফটকের পেছনে স্থাপন করা হয়।

১৪।  বোটানিক্যাল গার্ডেন

বোটানিক্যাল গার্ডেন

মিরপুরের চিড়িয়াখানা আর বোটানিক্যাল গার্ডেন পাশাপাশি অবস্থিত। বিশাল জায়গা নিয়ে অবস্থিত এই গার্ডেনে ৮২.৯ হেক্টর অংশে আছে শুধু গাছপালা। আরো আছে পুকুর খাল ও সরু রাস্তা। সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে দেখা যাবে গোলাপ বাগান, রাস্তার পাশে আকাশমনি, শাপলাপুকুর, বাঁশঝাড়, পাদ্মপুকুর, ইউক্যালিপটাসের বাগান, গ্রিনহাউজ, ক্যাকটাসঘর ও গোলাপ বাগান। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন খোলা থাকে।

১৫। রমনা পার্ক

রমনা পার্ক

শিশু পার্কের উল্টো পাশেই এই রমনা পার্ক অবস্থিত। এটি প্রতি দিন খোলা থাকে, কোনো প্রবেশ মূল্য নেই। এর ভিতরে আছে চমৎকার খাল, সরু পায়েচলার রাস্তা, অসংখ্য গাছ আর সবুজ ঘাসের লন। এর ভেতরে আছে চাইনিজ রেস্তোরা।

১৬।  ধানমন্ডি লেক

ধানমন্ডি লেক

এই লেকটি সারা ধানমন্ডি এলাকা ঘুরিয়ে- পেঁচিয়ে প্রায় ১০ কি.মি পর্যন্ত চলে গেছে। ৫০মিটার চওড়া এই লেকটির গভীরতা ৮ থেকে ৯ মিটার পর্যন্ত। এর বিভিন্ন অংশের উপরে রয়েছে সেতু পারাপারের জন্য, রয়েছে পথচারি বসে বিশ্রামের জন্য বসার ব্যবস্থাও। ৮নং সেতুর কাছে রয়েছে একটি ডিঙ্গি নামক ক্যাফে।

১৭।  গুলশান লেক পার্ক

গুলশানের লেকের পার ছুয়ে এটি বিস্তৃত। ২.৪১ হেক্টর জায়গা নিয়ে এর আধিপত্ত।

পর্ব -১

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »