Ultimate magazine theme for WordPress.

প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াই দ্বীপ

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা অনলাইন ডেস্ক ♦

হাওয়াই শার্ট নামক জামা আমরা ছোটকালে পরেছি; হাফ হাতা শার্ট, প্যান্টের বাইরেই পরা হতো। কোনো সময় সিরিয়াসলি খোঁজ নেইনি এটার নাম হাওয়াই শার্ট কেন? ছোটকালে মিঠাই বিক্রিকরণেওয়ালা আসত, যেমন কিনা আইসক্রিম বিক্রেতারাও আসত। আমাদের আবাসিক এলাকায় ঘোরাঘুরি করত, যেমন কিনা সব আবাসিক এলাকাতেই এখন পর্যন্ত করে। পেঁজা তুলার মতো লাল রঙের মিষ্টি বিক্রি হতো; মিষ্টিটা না সলিড না লিকুইড; কিন্তু মিষ্টি। নাম ছিল হাওয়াই মিঠাই। এটার নাম হাওয়াই কেন ছিল, ছোটকালে এই প্রশ্নটা করতাম না। কিন্তু বড় হয়ে হাওয়াই শব্দটার সঙ্গে পরিচিত হয়ে গেলাম ভূগোল পড়তে গিয়ে। মহাদেশগুলোর পরিচিতি পড়ার সময়, বিশেষত উত্তর আমেরিকার পরিচিতি পড়ার সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্বন্ধে অবহিত হই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যতগুলো স্টেট বা রাজ্য বা প্রদেশ আছে, তার মধ্যে দু’টির বৈশিষ্ট্য ভিন্নতর। একটি মহাদেশের মধ্যে অবস্থিত হলেও ভৌগোলিকভাবে উত্তর দিকে অনেক দূরে, এই প্রদেশ বা স্টেটের নাম আলাসকা। আরেকটি স্টেট বা প্রদেশের নাম হলো হাওয়াই। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত, আমেরিকার সর্বশেষ বা কনিষ্ঠতম স্টেট বা প্রদেশ। রাজধানীর নাম হনুলুলু। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘পেসিফিক কমান্ড’-এর সদর দফতর হনুলুলুতে অবস্থিত।
ভীষণ বড় একটি নৌঘাঁটি এখানে আছে; নৌঘাঁটির নাম পার্লহার্বার। ১৯৩৯ সালে জার্মানি ফ্রান্স আক্রমণ করেছিল; এর মাধ্যমেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এশিয়া মহাদেশের পূর্ব অংশের দূরতম দেশ জাপান জার্মানির পক্ষ নিয়েছিল। ওই জাপান ১৯৪১ সালে জাপানি বোমারু বিমান পাঠিয়ে হাওয়ায় দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত নৌঘাঁটির ওপর বোমাবর্ষণ করেছিল। এর মাধ্যমেই আমেরিকাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এবং ১৯৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটির ভূমিকা পালন করে।
হাওয়াই দ্বীপ সফর
১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে আমি খাগড়াছড়িতে পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করা শুরু করেছিলাম। এরই মধ্যে ১৯৮৮ সালে একবার হাওয়াই যাওয়ার সুযোগ আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক কমান্ডের আওতায় ও ব্যবস্থাপনায় প্যামস তথা প্যাসিফিক আর্মিজ ম্যানেজমেন্ট সেমিনার অনুষ্ঠিত হতো প্রত্যেক বছর; হয় হাওয়াইতে নয়তো অন্য কোনো বন্ধুপ্রতিম দেশের রাজধানীতে। বাংলাদেশের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় ঢাকাতেও এরূপ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই রকমই একটা সেমিনারে একটি প্যামসে যাওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছিলাম ১৯৮৮ সালে আমি এবং আরেকজন। সেই হাওয়াইতে যাওয়ার জন্য দ্বিতীয়বার সুযোগ আসে ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে। এবারো আমরা দু’জন। মনোনীত হয়েছিলাম ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড লিগ্যাল এইড বিষয়ক সেমিনারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণের জন্য। দুই-দু’বার হাওয়াই দেখলেও, বলতে পারছিলাম না যে, আমেরিকা দেখেছি। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ এবং আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের মধ্যে হাজার মাইলের প্রশান্ত মহাসাগর। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ এবং হনুলুলু নগরী পর্যটনমুখী ও পর্যটনকেন্দ্রিকভাবে গড়ে উঠেছে। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের সি-বিচ বা সমুদ্র সৈকতগুলো একাধিক কারণে উল্লেখযোগ্য।
বিজ্ঞাপন ও দূরদৃষ্টির অভিজ্ঞতা
যে দু’বার হাওয়াইতে গিয়েছিলাম, সে দু’বারই লক্ষ করেছিলাম যে, অনেক বড় বড় সাইনবোর্ড বা বিলবোর্ড আছে। সেখানে জনগণকে সতর্কতামূলক বিজ্ঞাপন দেয়া আছে। বিজ্ঞাপনের ভাষা হুবহু মনে নেই কিন্তু মর্মটা মনে আছে। মর্ম ছিল ইংরেজি ভাষায় ‘হ্যাভ সেইফ সেক্স’, বাংলায় মানে দাঁড়াবে ‘নিরাপদ যৌনকর্মে লিপ্ত হও’। নিরাপদ মানে এই নয় যে, অবিবাহিত দু’জন যুবক যুবতী এমনভাবে যৌনকর্ম করুক যেন কেউ ধরতে না পারে বা কারো চোখে না পড়ে বা পুলিশের চোখে না পড়ে। নিরাপদ মানে এই যে, ওই যৌনকর্মের ফলে যেন পুরুষ বা মহিলা অংশীদার এইডস নামক রোগে আক্রান্ত না হয়। সম্মানিত পাঠক, আপনারা এইডস নামক রোগের নাম শুনেছেন। আজ প্রায় তিন দশক ধরে এইডসের প্রকোপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এইডসের নিশ্চিত চিকিৎসা এখনো বের হয়নি; সম্ভবত বের হওয়ার পথে আছে; শক্তিশালী পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ২০-২৫ বছর আগের কথা; এইডস হলে মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। এইডস রোগ একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে যাওয়ার যেমন একাধিক মাধ্যম আছে, তেমনি এইডস রোগ সৃষ্টি হওয়ারও একাধিক কারণ আছে। এইডস রোগ সৃষ্টি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো একাধিক ব্যক্তির সাথে যৌনকর্ম করা; পুরুষ হোক মহিলা হোক। মানুষ যেন এইডসে আক্রান্ত না হয় তার জন্য গত ১০-১৫ বছরে বহু প্রকারের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হাসপাতালে এবং সমাজে প্রচলন করা হয়েছে। ১৫-২০-২৫ বছর আগে এইডসে আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল একজন এইডস আক্রান্ত রোগীর সাথে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া; পুরুষ হোক বা মহিলা হোক। অথচ দ্বীন ইসলাম তথা ইসলাম ধর্মের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে অবিবাহিত ব্যক্তিগণের পুরুষ বা মহিলা যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া প্রসঙ্গে। ইসলামের বিধান মতে, পবিত্র কুরআনের নিষেধাজ্ঞা মতে, পবিত্র হাদিসের নিষেধাজ্ঞা মতে, এটি একটি মারাত্মক বড় ও গভীর গুনাহ। আমি বা আমাদের মতো কেউ হলে, হাওয়াই দ্বীপে বা আমেরিকায় এই প্রচারণা চালাতাম যে, আপনারা কেউই বিবাহবহির্ভূত যৌনকর্মে লিপ্ত হবেন না। কিন্তু সেই ২৫-৩০ বছর আগে হাওয়াই দ্বীপে দেখা বিজ্ঞাপনের মর্ম ছিল, যেমন ইচ্ছা যত ইচ্ছা বিবাহবহির্ভূত যৌনকর্মে লিপ্ত হও, কিন্তু কনডম বা অন্য কোনো প্রতিরোধক অবশ্যই ব্যবহার করবে যেন একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে এইডস ছড়িয়ে না পড়ে। অথবা উভয়েই এইডস রোগে আক্রান্ত না হন। আমাদের সাথে পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গির তফাৎটা এখানেই। পাশ্চাত্য রোগ সৃষ্টি করে, রোগ আরোগ্যের জন্য ওষুধ আবিষ্কার ও গবেষণা করে, ওষুধ বানানোর জন্য ফ্যাক্টরি বসায়, ওষুধ রফতানি করে তথা কয়েক বছর আগে রফতানি করা রোগ সারার জন্য কয়েক বছর পরে ওষুধ রফতানি করে। পাশ্চাত্য (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) কয়েক সপ্তাহ আগে আইন করে পুরুষে পুরুষে বিবাহ এবং মহিলা মহিলা বিবাহ অনুমোদন করেছে। প্রকৃতি ও সৃষ্টিতত্ত্বের শতভাগ বিরোধিতা। এর নেতিবাচক ফল আমেরিকা পাবে এক থেকে দুই দশকের মধ্যেই। আর আমরা আমাদের সমাজে পাশ্চাত্যের তথা আমেরিকার যত প্রকার খারাপ অভ্যাস অনুকরণ করে আমাদের সমাজটাকে ধ্বংস করি। আমরা পাশ্চাত্যকে পূজা করি, পাশ্চাত্যকে আধুনিকতা বলি, পাশ্চাত্যকে অনুকরণ করি, পাশ্চাত্যকে অনুসরণ করি এবং ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মতো পাশ্চাত্য হাঁচি দিলে আমরাও একটা হাঁচি দিই। যা হোক, হাওয়াই সম্বন্ধে কথা বলতে গিয়ে নৈতিকতা ও নীতির কথা এসে গেল উদাহরণস্বরূপ। এটা আমেরিকানদের পক্ষ থেকে দূরদৃষ্টির উদাহরণ। এখন আমি আমাদের দেশীয় দূরদৃষ্টির কথায় আসব। যেটা বলতে চাচ্ছিলাম সেটা হলো, হাওয়াই দেখা মানে আমেরিকা দেখা নয়।
কারলাইল শহর
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড যাকে সচরাচর কন্টিনেন্টাল আমেরিকা বলা হয়, সেটা দেখার প্রথম সুযোগ পেলাম ১৯৮৯ সালে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া নামক স্টেটের রাজধানী হেরিসবাগ নগরী। হেরিসবাগ থেকে ৬০-৭০ মাইল দূরে ছোট্ট একটি শহর, নাম কারলাইল। ছোট্ট কারলাইল শহরে ততোধিক ছোট্ট সেনানিবাস হলো কারলাইল ব্যারাকস। ওই কারলাইল ব্যারাকসে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানটি হলো ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি ওয়ার কলেজ। ওই ওয়ার কলেজে এক বছর মেয়াদি উচ্চতর সামরিক লেখাপড়ার জন্য মনোনীত হয়েছিলাম। পরবর্তী ১২ মাস সপরিবারে কারলাইল শহরেই ছিলাম। দুইশ’ বা আড়াইশ’ বছর আগের কথা। পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্রের সীমানা ও আয়তন বর্ধিত করছে নতুন স্বাধীন হওয়া দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। জনৈক ক্যাপ্টেন কারলাইলের নেতৃত্বে আমেরিকান সেনাবাহিনীর একটি ছোট্ট দল, ওই আমলের উপজাতি বা আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের পরাজিত করে ওই গ্রামটি দখল করেছিল। অতঃপর সেখানে শহরের গোড়াপত্তন করা হয়। ওই শহরের নাম হয় কারলাইল। শহরের গোড়াপত্তনের ২০০ বছর পর গিয়েও দেখলাম রাস্তাগুলো সোজা। অথচ ইতিহাসের যেসময় কারলাইল নামক শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিল, সেই সময় আমাদের এখানেও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিভিন্ন শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিল। কিন্তু আমাদের শহরগুলোর রাস্তাঘাট সোজা ছিল না। ২০০ বছর আগেই বাংলাদেশ থেকে অর্ধেক পৃথিবী দূরের মানুষের চিন্তা-পরিকল্পনা শক্তি এবং আমাদের চিন্তা ও পরিকল্পনা শক্তির মধ্যে তফাৎ ছিল। অর্থাৎ পৃথিবীর মানুষ একেক এলাকায় একেক রকম বৈশিষ্ট্যের দ্বারা মণ্ডিত। মানুষের একটি ক্ষমতা হলো দেখা; ছয়টি ইন্দ্রিয়ের একটি। দেখা শব্দের অপর নাম দৃষ্টি। কাছের দেখাকে নিকটদৃষ্টি বলা যায়; দূরের দেখাকে দূরদৃষ্টি বলা যায়। দূরদৃষ্টি শব্দের আক্ষরিক অর্থ যেমন আছে, তেমনি রূপক অর্থও আছে। একটি উদাহরণ হলো- ভৌগোলিকভাবে দূরদৃষ্টি দেয়া। রমজান মাস আগমনের সময় অথবা রমজান মাসের শেষ দিনে সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশে নতুন চাঁদ খোঁজার জন্য যেই দৃষ্টি দেয়া হয় সেটাও ভৌগোলিকভাবে দূরদৃষ্টি। সাধারণ খোলা চোখে দূরে কোনো জিনিস দেখতে অসুবিধা হলে, চশমার সাহায্যে সেই অসুবিধা বা সেই ঘাটতি পূরণ করা যায়। রূপক অর্থে দূরদৃষ্টি হলো- মনের দৃষ্টি দিয়ে চিন্তা করা। এই চিন্তার এমন কোনো সীমারেখা নেই যেটাকে কিলোমিটার বা মাইল দিয়ে পরিমাপ করা যায়।
মহাসড়কে কয়েক দিনের তুলকালাম কাণ্ড
গত কয়েক দিন তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেল দেশের বিভিন্ন অংশে; বেবিট্যাক্সি বা অটোরিকশা তথা মহাসড়কে ধীরগতির গাড়িঘোড়া চলা নিয়ে। গত ১৮ জুলাই ঈদুল ফিতর ছিল। ঈদের পরবর্তী ১০-১২ দিন সড়ক দুর্ঘটনার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। তখন সরকার হঠাৎ করে ঘোষণা দিলো, এখন থেকে মহাসড়কে কোনো বেবিট্যাক্সি বা অটোরিকশা চলবে না। কেন চলবে না? উত্তরে বলা হলো, এদের কারণেই মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনা ঘটছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র্র অটোরিকশা এবং বড় বড় বাসের সাথে। বাসের কোনো দোষ পাওয়া গেল না; সব দোষ অটোরিকশার। অটোরিকশা বন্ধ করার পর যদি মহাসড়কে কোনো দুর্ঘটনা হয়, তাহলে এর জন্য কে দোষী হবে? এর কোনো উত্তর প্রকাশ্যে সরকার দেবে না। বর্তমান সরকারের জনৈক মন্ত্রী বলেছিলেন, কোনো একজন ড্রাইভার যদি গরু-ছাগল চিনতে পারে তাহলেই তাকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া যেতে পারে। একটু কৌতুক করি। মাননীয় মন্ত্রীর প্রতি সম্মান রেখে মহাসড়কের ড্রাইভাররা অবশ্যই গরু-ছাগল চিনছেন; কোনো গরু-ছাগলের সাথে কোনো বড় গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে না। (কৌতুকের অংশ) বড় গাড়ির সম্মানিত ড্রাইভারেরা ছোট গাড়িকে চিনতে পারছেন না অথবা ছোট গাড়ির সম্মানিত ড্রাইভারেরা বড় গাড়িকে চিনতে পারছেন না। সব ড্রাইভার নয়, কিন্তু বহুসংখ্যক ড্রাইভারের অদক্ষতা দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। সব ড্রাইভার নয়, কিন্তু বহুসংখ্যক ড্রাইভারের মহাসড়কে দ্রুত চালানোর প্রতিযোগিতা দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। মহাসড়কে হাট-বাজার বসে, এটাও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। বড় গাড়ি বা মাঝারি গাড়ি বা ছোট গাড়ি তাদের ব্রেক ফেল করে, এটাও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। ভাঙা রাস্তা, চিকন রাস্তা, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডের অভাব ইত্যাদিও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
অটোরিকশা সমাচার
বেবিট্যাক্সি বা অটোরিকশা মহাসড়কে উঠবে না। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট হওয়া অসুবিধাগুলোর কী হবে? যথা প্রশ্ন এক. এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার জন্য যেসব যাত্রী অটোরিকশা বা বেবিট্যাক্সি ব্যবহার করতেন, তারা এখন কোন গাড়ি ব্যবহার করবেন? প্রশ্ন দুই. অটোরিকশা বা বেবিট্যাক্সি কেনার জন্য ব্যাংক থেকে লোন করা হয়েছিল অথবা মহাজন থেকে লোন নেয়া হয়েছিল, সেই লোন কিভাবে পরিশোধিত হবে? প্রশ্ন তিন. যেসব ড্রাইভার অটোরিকশা বা বেবিট্যাক্সি চালাতেন তারা এখন কী চালাবেন; যদি কিছু না চালান তাহলে তার জীবিকা নির্বাহের উপায় কী হবে? প্রশ্ন চার. মহাসড়কে চালানোর পরিবর্তে এসব বেবিট্যাক্সি বা অটোরিকশা যখন মহাসড়কের বাইরে গ্রামগঞ্জে চালানো শুরু করবে, তখন ওই সড়কগুলোর অবস্থা কী হবে? প্রশ্ন পাঁচ. এসব অটোরিকশা বা বেবিট্যাক্সি গ্যাস দিয়ে চলে অথবা ডিজেল দিয়ে চলে; সিএনজি স্টেশন এবং পেট্রলপাম্পগুলো মহাসড়কের ওপরে অবস্থিত। অতএব এই গাড়িগুলোকে চলতে হলে কোনো-না-কোনো দূরত্বের জন্য অর্থাৎ এক বা দুই বা তিন বা চার কিলোমিটার দূরত্বের জন্য হলেও মহাসড়কে উঠতেই হবে। তখনো তো একই দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থাকে। যখন গ্রামগঞ্জে সব অটোরিকশা চলতে থাকবে, তখন পেট্রল বা গ্যাসের চাহিদাও বেড়ে যাবে। দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য পদক্ষেপ নিতেই হবে। কিন্তু একটি পদক্ষেপ নিতে গিয়ে অন্যান্য সমস্যা সৃষ্টি করলে তখন হিতে অহিত হবে। অটোরিকশা বা বেবিট্যাক্সির কারণে মহাসড়কে দুর্ঘটনা হচ্ছে, এটার জন্য কি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দায়ী? উত্তর হলো, না। কারণ মহাসড়কে অটোরিকশা বা বেবিট্যাক্সি চলা শুরু হয়েছে ১৫, ২০, ৩০ বছর আগে থেকে। আমার বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার দক্ষিণ-পূর্ব অংশে। আমাদের এলাকার বুকচিরে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই মহাসড়ক চলে গেছে। প্রচুর উপ-মহাসড়ক আছে, যেখানে যত না বাস সার্ভিস, তার পাঁচ গুণ বেশি হলো অটোরিকশা সার্ভিস। আমার কল্পনায় বা আমার বুদ্ধিতে কোনো মতেই আসছে না যে, অটোরিকশা বা বেবিট্যাক্সি বন্ধ করে দিলে ওই সব উপ-মহাসড়কের মানুষজন কিভাবে চলাচল করবে? শুধু উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করছি। চট্টগ্রাম মহানগরের বিখ্যাত ষোলোশহর এক নম্বর এবং বিখ্যাত মুরাদপুর দুই নম্বরের মাঝখানে হাতের বাঁয়ে কয়েক ডজন সবুজ রঙের অটোরিকশা দাঁড়ানো আছে। এরা সবাই চট্টগ্রাম শহর থেকে সরাসরি নাজিরহাট বা ফটিকছড়ি প্যাসেঞ্জার নিয়ে যায়। ১০০ অথবা ১১৫ টাকা ভাড়া জনপ্রতি। এই গাড়িগুলোর কী হবে এবং এই প্যাসেঞ্জারগুলোর কী হবে?
দৃষ্টি ও দূরদৃষ্টি
মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমানোই আমাদের লক্ষ্য। কমতে কমতে অনেক বছর পর শূন্য হতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড সৃষ্টি করলে সেটাকে কোনো অবস্থাতেই দূরদৃষ্টি বলা যায় না। শুধু একটি মন্ত্রণালয় নয়, সার্বিকভাবে সরকারি লোকজনের মনমানসিকতায় দূরদৃষ্টি শব্দটিকে প্রোথিত করতে হবে এবং অভ্যাস করার জন্য সুযোগ দিতে হবে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »