Ultimate magazine theme for WordPress.

ভ্যাকসিন: কূটনীতি ও সাম্রাজ্যবাদের নতুন গুটি

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা অনলাইন ডেস্ক ♦

করোনা ভাইরাস নামের মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত বিশ্বে ১৭ লাখের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। গড়ে পৃথিবীতে প্রতিদিন এ মহামারির কবলে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছেন। এক বছর হতে চলল। পৃথিবীর মানুষের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি, শিক্ষা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা এখনো ওলট-পালট হয়ে আছে। কিন্তু তার মধ্যেও থেমে নেই করোনার সম্ভাব্য টিকা নিয়ে মানবতার ধ্বজাধারী বিশ্বমোড়লদের নোংরা স্বার্থের গুটিবাজি।

যদিও চলতি বছর জুলাইয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মহামারি গবেষক বলেছিলেন, ‘করোনার টিকা আবিষ্কার হলেও বেশিরভাগ মানুষের এটি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।’ জাতিসংঘের মহাসচিবও জানিয়ে দিয়েছেন, ‘ভ্যাকসিন পৃথিবীকে আগের অবস্থায় ফেরাতে পারবে না।’ কিন্তু শুরু থেকেই পৃথিবীর ক্ষমতাধর ও ধনী দেশগুলো টিকা আবিষ্কার, প্রয়োগ ও বাজারজাত করা নিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রতিযোগিতায় বেশ ব্যস্ত সময় পার করছে।
ভ্যাকসিন ‍সাম্রাজ্যবাদ  
চলতি বছর আগস্টে সর্বপ্রথম হুট করে বাজারে ভ্যাকসিন নিয়ে আসে রাশিয়া। পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেই, ঠিক সেসময়ই রুশ বিজ্ঞানীদের এ দাবি গণমাধ্যমে এসেছিল যে, করোনা সাধারণ পানিতেই দূর হবে। তারা তখন বলেছিলেন, ‘সাধারণ তাপমাত্রার পানিতেই মরবে করোনাভাইরাস। তবে গরম পানি হলে আরো ভালো।’

যাইহোক, এটা যেহেতু রাশিয়ার টিকা ছিল, তাই যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে বলে, এই টিকার অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ বৈজ্ঞানিক নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি। এভাবে রাশিয়ার সাম্রাজ্যবাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ মার্কিনপন্থীরা আর রাশিয়ার ভ্যাকসিন নিজেরা ব্যবহার করবে না এবং নিজেদের অনুগত দেশগুলোতে ব্যবহার করতে দেবে না।

কিন্তু রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিনও কম যান না। নিজের মেয়ের শরীরে তার দেশের ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। রাশিয়ান ভ্যাকসিন ‘স্পুটনিক-ভি’ এর প্রস্তুতকারক সংস্থাটিও এটির দুই বছর পর্যন্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকার এবং ৯১ ভাগ কার্যকরী হওয়ার ঘোষণা দেয়। ফলে বিভিন্ন দেশ রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে অল্পদিনেই ১০০ কোটি ডোজ টিকার অর্ডার করে ফেলে। রাশিয়া ঘোষণা দিয়েছে, প্রতিবছর তারা ৫০ কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করবে।

এরপর আসে চায়না ভ্যাকসিন। তারপর আনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, পৃথিবীর প্রায় দুইশো জায়গায় করোনা ভ্যাকসিন উদ্ভাবন-উৎপাদনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ইঁদুর থেকে নিয়ে মানুষ সবার উপরে চলছে টিকার ট্রায়াল ও পরীক্ষা। নানান দেশের আবিষ্কার, ট্রায়াল ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যেই চলছে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোকে নিজ-নিজ টিকার প্রতি আকৃষ্ট করা ও দরকষাকষির হিড়িক। কূটনৈতিক ও সাম্রাজ্যবাদী আচরণও এক্ষেত্রে প্রকটভাবে ফুটে উঠছে।

এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই প্রতিবেশী ভারতও। নিজেরা আবিষ্কার করতে না পারলেও তারা যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডের সঙ্গে তাদের টিকা উৎপাদনের চুক্তি সেরে ফেলেছে। ফলে শুরু থেকেই ভারত চাইছে, তার প্রতিবেশি দেশগুলো অক্সফোর্ডের টিকা বৃটেন থেকে না কিনে তাদের কাছ থেকে কিনুক। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর হাইকমিশনাররা কতবার যে এ নিয়ে বাংলাদেশকে তাদের থেকে টিকা কিনতে দফায় দফায় প্রস্তাব অফার করে ঘোষণা ও বিবৃতি দিয়েছে তা পত্রিকাগুলোতে সার্চ দিয়ে দেখা যেতে পারে। ফলে দাদাবাবুদের চাপে পড়ে গরিব বাংলাদেশকে হয়ত তাদের থেকেই কিনতে হবে টিকা। ইতোমধ্যে আমাদের বেক্সিমকো কোম্পানি ভারতের সেরাম সংস্থার সঙ্গে টিকা কেনার চুক্তিও সেরে ফেলেছে। সুতরাং অক্সফোর্ড থেকে ভারত, ভারত থেকে বেক্সিমকো, বেক্সিমকো থেকে সরকার, আর সরকার থেকে জনগণ পর্যন্ত একাধিক মধ্যস্বত্ত্বের ভোগের পর করোনার টিকা যে ফুলে ফেঁপে বেশি দাম হয়ে আসবে তা উপলব্ধি করতে অত বেশি অংক কষার প্রয়োজন নেই।

কিন্তু ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ চীনও এ খেলায় এগিয়ে। নিজেরা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পর যেসব দেশে আধিপত্য বিস্তারে তারা আগ্রহী সেখানে আগে আগে ভ্যাকসিন পৌঁছে দিচ্ছে দেশটি। এ তালিকায় আছে পাকিস্তান, ব্রাজিল, ফিলিপাইন ও সৌদি আরব। ভারতের মতো চীনও বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন দিতে মরিয়া। চীন ঘোষণা করেছিল, বাংলাদেশকে তারা ১লাখ ডোজ টিকা বিনামূল্যে দেবে। এভাবে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, পূর্ব ও পশ্চিমের দেশগুলোতে ভ্যাকসিন হয়ে উঠেছে কূটনীতি, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং সাম্রাজ্যবাদের নতুন গুটি।

আশংকা ও অভিমত:

ভ্যাকসিন নিয়ে কথা অনেক। বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞজনদের আশংকা-অভিমতও প্রচুর। করোনা ভ্যাকসিনের আদৌ প্রয়োজন হবে কিনা তা নিয়েও বিতর্ক শোনা যায় বিজ্ঞমহলে। করোনাকে দীর্ঘমেয়াদী দেখিয়ে, সবাইকে অনলাইনে অফিস করতে উৎসাহ দিয়ে, শত্রু দেশের গুরুত্বপূর্ণ ডাটা-দস্তাবেজ হাতিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্রের আশংকাও ব্যক্ত করছেন কেউ কেউ। অভিজ্ঞ ডাক্তাররা তো বারবার বলেছেন, শুধু মাস্ক পরলেই আশিভাগ করোনা দূর হবে।

যাইহোক, তবু বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে কয়েকটি আশংকার কথা না বললেই নয়।

* প্রথমত অতীতে দেখা যেত, কোনো রোগের টিকা উদ্ভাবনে বছরের পর বছর সময় লাগে। আবিষ্কার, ট্রায়ালে বহু সময় অতিবাহিত হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর সেটা বাজারে আসে। কিন্তু এবার দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। প্রায় প্রত্যেক দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিবিদরা যেন দায়িত্ব নিয়েই  বলে বেড়াচ্ছেন যে, অমুক মাসের শুরুতে বা শেষে ভ্যাকসিন আসছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আর বাইডেনরাও মার্কিন নির্বাচনে করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে মাঠ গরম রেখেছেন বেশ। বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমগুলোও তাদের ভ্যাকসিনের গুণগান গেয়ে আকাশ-বাতাস মাথায় তুলে রেখেছে। এটা জানাকথা যে, বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অর্থনীতি ও রাজনীতির চাপ থাকে। ফলে  এত জলদি ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ভ্যাকসিনগুলোকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছেন।

এধরনের সন্দেহ মোটেও অমূলক নয়। ইতিমধ্যেই ফাইজার ও অক্সফোর্ডের আবিষ্কৃত টিকা এবং চায়না টিকা নিয়ে বিভিন্ন দেশে চিকিৎসাকর্মী ও রাজনীতিবিদদের অসুস্থ হয়ে পড়ার সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট তো স্পষ্টভাবে টিকা নিলে নারীদের মুখে দাঁড়ি গজানোর আশংকাও ব্যক্ত করেছেন। এধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সংবাদকে গণমাধ্যম আর সাম্রাজ্যবাদীরা যতোই ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করুক, গরিব দেশগুলোর জন্য তা বহুল আশংকার বিষয়। ধনী দেশগুলো হয়ত তাদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার চিকিৎসা করিয়ে নিতে পারবে মোটা অর্থ খরচ করে, কিন্তু গরিব দেশগুলোর কী হাল হবে? তাদের কি অতো সামর্থ্য আছে? এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সংবাদ আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনগুলোর দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করছে সন্দেহ নেই। একইসঙ্গে এর মাধ্যমে গরিব দেশগুলোকে বিপজ্জনক ভ্যাকসিন ট্রায়ালের গিনিপিগ বানানোর আশংকাকেও প্রবল করছে।

* করোনা ভাইরাস নামের মহামারিতে গোটা পৃথিবীই আক্রান্ত। এর প্রতিষেধক প্রয়োজন প্রতিটি দেশেরই। কিন্তু করোনার টিকা এলে তার বন্টন নীতি কী হবে? সব দেশ কি তার প্রয়োজনে সময় ও পরিমাণমতো টিকা নিতে পারবে? নাকি ধনী দেশগুলোকে আগে প্রাধান্য দেওয়া হবে?

বেসরকারি সংস্থা অক্সফামের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কিছু ধনী দেশ (আমেরিকা, ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশ, অস্ট্রেলিয়া, হংকং, ম্যাকাও, জাপান, সুইজারল্যান্ড) সম্ভাব্য করোনা ভ্যাকসিনের অর্ধেকেরও বেশি ডোজ কেনার আগাম চুক্তি সেরে ফেলেছে। অথচ জনসংখ্যার বিচারে সেসব দেশে পৃথিবীর মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষের বসবাস। ফলে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে তা ধনী দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিহাস পর্যালোনা করলেও দেখা যায়, ২০০৯ সালে H1N1 মহামারীর সময় যেসব দেশে সংক্রমণ বেশি ছিল, তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা পায়নি; বরং ধনী দেশগুলোই আগে টিকা পেয়েছিল।

* যেহেতু গরিব দেশগুলোর কাছে টাকা নেই, ফলে ধনী দেশগুলোই তাদেরকে মোটা অংকের ঋণ দিচ্ছে টিকা কিনতে। ঋণের সঙ্গে স্বভাবতই যুক্ত হচ্ছে মোটা অংকের সুদসহ নানান অর্থনৈতিক শর্ত ও বাধ্যবাধকতা।

অবস্থাটা দাঁড়াচ্ছে এমন যে, গরিবের কাছে ভ্যাকসিনও নেই, ভ্যাকসিন কেনার টাকাও নেই। কিনতে হলে টাকা ধনীর কাছ থেকেই সুদ এবং একগাদা শর্তসহ ধার করে নিতে হবে। এবং তাদের থেকে তাদের দেওয়া মূল্যেই ভ্যাকসিন কিনতে হবে। কেনার সময় আবার সব প্রভাবশালীকেই খুশি রাখতে হবে। শুধু তাই নয়; আগে-পরে সেই ভিত্তিতেই নিজেদের কূটনীতি-রাজনীতি এবং অর্থনীতি চালাতে হবে। এরপর এ নিশ্চয়তাও নেই যে, কতোটা পার্শপ্রতিক্রিয়া মুক্ত হবে সেই টিকা, আর কবেই বা সেটা এসে পৌঁছবে!

এভাবেই পৃথিবীর মানুষের রোগ নিয়ে ব্যবসা করছে বিত্তশালী রাষ্ট্রগুলো। একটি বৈশ্বিক মহামারিকে তারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তার এবং অর্থ উপার্জনের মাধ্যমরূপে ব্যবহার করছে। এরাই এখনকার পৃথিবীতে মানবতার ধ্বজাধারী!

বিশ্ব মানবতা আজ করোনার আঘাতে নাকাল। লাখ লাখ বনি আদম এ অদৃশ্য ভাইরাসের থাবায় প্রাণ হারিয়েছে। এখনো পৃথিবীর মানুষের জীবন ও অর্থনীতি চরমভাবে বিধ্বস্ত। এ কঠিন মুহূর্তে প্রয়োজন তো ছিল মানবতার দ্বারে দ্বারে বিনামূল্যে করোনার টিকা পৌঁছে দেওয়া। বিনিময় ছাড়াই পৃথিবীর কোটি কোটি অসহায় দরিদ্র গোষ্ঠীর নাগালে এ মহামারির প্রতিষেধক এনে দেওয়া। কিন্তু বিশ্বমোড়লরা তাদের সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারে ব্যস্ত। তাদের ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, আধিপত্য ও অর্থের লিপ্সা তাদেরকে চরম অন্ধ করে দিয়েছে। মানুষের জীবনের চেয়ে তাদের নিকট বেশি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ ও আধিপত্য।

 

 সুত্র- ইসলাম টাইমস

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »