Ultimate magazine theme for WordPress.

রাঙামাটির কোথায় ঘুরবেন?

পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্যগুলো বলছে রাঙামাটি ভ্রমণের উপযুক্ত সময় এখন

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা ডেস্ক♦

পাহাড় এখন সবুজে ভরে গেছে। সবুজ পাহাড়ে বুক চিড়ে নেমে আসা ঝর্ণা থেকে অবিরাম পানি পড়ছে। স্বচ্ছ পানিতে থৈ থৈ কাপ্তাই হ্রদ। আগমনী শরতে পরিষ্কার আকাশে উড়ছে সাদা মেঘের ভেলা। পাহাড়ের অপরূপ দৃশ্যগুলো যেন বলছে রাঙামাটি ভ্রমণের উপযুক্ত সময় এখন। এবার সময়ে মিলছে ঈদের লম্বা ছুটি। ইতোমধ্যে পাহাড়ের দেশ রাঙামাটিতে বাড়তে শুরু করেছে পযটকদের ভিড়।
রাঙামাটি পর্যটন কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়ুয়া বলেন, এবারের বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকা ঝুলন্ত সেতু গত ১ আগস্ট জেগে উঠেছে। এটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। গত ৫ আগস্ট হোটেল-মোটেলের ৫০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে।

রিজার্ভ বাজারের অভিজাত মোটেল ‘মতি মহল’ এর মালিক শফিউল আজম বলেন, “এবার রাঙামাটিতে বিপুল সংখ্যক পর্যটক আসবে-এমনটা আশা করা হচ্ছে।”

রাঙমাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ বলেন, পযর্টকরা নিরাপদে রাঙামাটি ভ্রমণ করতে পারবে। নিরাপত্তা নিয়ে তাদের চিন্তার কোনো কারণ নেই।

ঝুলন্ত সেতু 

রাঙামাটির অন্যতম নিদর্শন ঝুলন্ত সেতু। এটি না দেখে চলে যাওয়া মানে রাঙামাটি ভ্রমণে অপূর্ণতা। রাঙামাটি শহরে তবলছড়িতে সেতুটির অবস্থান। এর দৈর্ঘ্য ৩৩৫ ফুট। সেতুটির কাছে রাঙামাটি পর্যটন মোটেল।

বর্ষার বৃষ্টিতে কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধিতে সেতুটি কিছুদিন পানির নিচে থাকলেও গত ১ আগস্ট পানি নেমে যায়। এটি এখন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

যারা রাঙামাটি শহরে থাকবেন- তারা সেতুটি দেখতে তবলছড়ি বাজার থেকে অটোরিকশা রিজার্ভ করে যেতে পারেন। ভাড়া চল্লিশ টাকা। ফেরার পথেও একই ভাড়ায় তবলছড়ি বাজার পর্যন্ত রিজার্ভ আসতে হবে। পর্যটন মোটেলে অবস্থান করলে যখন তখন সেতুটি দর্শনের সুযোগ মিলে। সেতু বা পর্যটন ঘাট থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকা নিয়ে কাপ্তাই হ্রদ ভ্রমণ করা যায়।

শুভলং ঝর্ণা

শুভলং ঝর্ণা। এটি যেন এখন পূর্ণ যৌবন ফিরে পেয়েছে। ঝর্ণায় এখন অবিরাম পানি পড়ছে। যা শুকনো মৌসুমে বেড়াতে আসা পর্যটকরা দেখতে পান না। এটি রাঙামাটি সদর ও বরকল উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায়।

রাঙামাটি শহরের বনরূপা, গর্জনতলী থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় যেতে সময় লাগে ১ ঘন্টা। একটি নৌকার ভাড়া দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। স্পীড বোটে সময় লাগবে  ১০ থেকে ১৫ মিনিট। ভাড়া তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। ইঞ্জিন চালিত নৌকায় আসা যাওয়ার পথে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগের সুযোগ থাকে। এক সাথে কাপ্তাই হ্রদে নৌ ভ্রমণও হয়ে যায়। শুভলং যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। ঝর্ণা পরিদর্শনে টিকিটের প্রয়োজন হয়। শুভলং যাওয়ার পথে কাপ্তাই হ্রদের দ্বীপে চাং পাং, পেদা টিং টিং, মেজাংসহ একাধিক রেস্টুরেন্ট রয়েছে।

মুন্সী আব্দুর রউফ স্মৃতিসৌধ

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ ১৯৭১ সালে ২০ এপ্রিল হানাদারদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন রাঙামাটির নানিয়াচর বুড়িঘাটের চেঙ্গী নদীর পাড়ের একটি টিলায়। তিনি যে টিলায় শহীদ হন সেখানে রয়েছে তাঁর কবর। নির্মাণ করা হয়েছে সীমান্ত শিখা নামে স্মৃতিস্তম্ভ।

রাঙামাটি শহরের বনরূপা, গর্জনতলী থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় যেতে সময় লাগে ১ ঘন্টার একটু বেশী। একটি নৌকার ভাড়া দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। স্পীড বোটে সময় লাগবে ২০ থেকে ২৫ মিনিট। ভাড়া তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। এটি পরিদর্শনে টিকিটের প্রয়োজন হয় না।

রাজবন বিহার 

বৌদ্ধ তীর্থস্থান রাজবন বিহার। শহরের রাজবাড়ি এলাকায় অবস্থিত। বিকাল ৪ টার পর শত শত পর্যটক রাজবন বিহার দর্শন করেন। শহরের যেকোন প্রান্ত থেকে সড়ক পথে রাজবন বিহারে যাওয়া যায়। অটোরিকশায় উঠার আগে ভাড়া নির্ধারণ করা দরকার। রাজবন বিহার পরিদর্শনে কোন টিকিটের প্রয়োজন হয় না।

সাজেক

সাজেক রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে অবস্থিত। পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত এ পর্যটন স্থানটি ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। প্রতিদিন হাজারো পর্যটক সাজেকে বেড়াতে আসে। সাজেক থেকে ভারত দেখা যায়। ভোরে মেঘের সাথে খেলা করা যায়। সূর্য উদয়ের আগে মেঘগুলো যেন পর্যটকদের আলিঙ্গন করে চলে যায়। সাজেক রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা হয়ে সাজেকে যায় পর্যটকরা। ইতিমধ্যে সাজেকে বাণিজ্যিকভাবে শতাধিক রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। ছুটির দিনগুলোতে এসব রিসোর্টের কোনটিই খালি থাকে না।

বড়গাঙ রেস্টুরেন্ট ও রিসোর্ট

শহর থেকে একটু দূরে রাঙামাটি-কাপ্তাই সড়কের মগবান ইউনিয়নে মোরঘোনা এলাকায় বড়গাঙ রিসোর্টের অবস্থান। সেখানে রাত্রী যাপন ও খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। ব্যাম্বু চিকেন খাওয়ার সুযোগ রয়েছে এখানে।

বেড়ান্নে লেক শো ক্যাফে

বড়গাঙ থেকে কয়েক গজ দক্ষিণে বেড়ান্নে লেক শো ক্যাফে। কাপ্তাই হ্রদের তীরে বেড়ান্নে ক্যাফে তৈরি করা হয়েছে। কাপ্তাই হ্রদের পানির কাছাকাছি করে বানানো হয়েছে একাধিক ছাউনী। সেখানে থাকার ব্যবস্থা না থাকলেও আছে খাবারের ব্যবস্থা। আদিবাসীদের বিভিন্ন খাবার মিলবে বেড়ান্নেতে।

পলওয়েল পার্ক 

রাঙামাটি শহরের ডিসি বাংলোর কয়েক গজ আগে পলওয়েল পার্ক। রাঙামাটি জেলা পুলিশ এটি পরিচালনা করে। এখানে রয়েছে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। কাপ্তাই হ্রদের পাড়ে নির্মাণ করা হয়েছে একাধিক কটেজ। এবারের ঈদে এগুলো উন্মুক্ত করা হবে। রয়েছে সুইমিংপুল। আছে লাভ লক পয়েন্ট বা ভালবাসার তালা। ভালবাসা বন্ধনকে চিরস্থায়ী করতে অনেক যুগল দম্পতি লাভ লক পয়েন্টে ভালবাসার তালা ঝুলিয়ে তালার চাবি কাপ্তাই হ্রদের পানিতে ফেলে দেয়। পলওয়ের ভিতরে লাভ লক পাওয়া যায়। রাঙামাটি শহরের যেকোন প্রান্ত থেকে সড়ক পথে পলওয়েলে যেতে হয়। টিকিট কেটে পার্কে প্রবেশ করতে হয়।

এর পাশে ডিসি বাংলো পার্ক। অনুমতি মিললে যে কেউ শত বছরের ডিসি বাংলো ঘুরে আসতে পারেন। ডিসি বাংলোর সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে।

আরণ্যক 

রাঙামাটি সেনাবাহিনীর পরিচালিত আরণ্যক রিসোর্ট ও পার্ক। রাঙামাটি সেনানিবাসের ভিতরে আরণ্যকের সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করে। রাঙামাটির দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন স্থান আরণ্যক  টিকিট কেটে আরণ্যকে প্রবেশ করতে হয়। রাঙামাটি শহরের যেকোন প্রান্ত থেকে সড়ক পথে আরণ্যকে যাওয়া যায়।

রাজার বাড়ি 

রাজার বাড়ি আছে বলে নাম হয়েছে রাজবাড়ি। এ রাজবাড়ি এলাকায় রাজার বাড়িটি অবস্থিত। এখানে রাজার বাড়ির কাছাকাছি রয়েছে রাজার কার্যালয়। পুরনো বাজার বাড়িটি পুড়ে যাওয়ায় নতুন করে রাজার বাড়িটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দর্শনীয় কিছু না থাকলেও পর্যটকরা রাজবাড়ি এলাকায় পা হলেও রাখে।

ফালিতাঙ্যা চুগ

অনেক পর্যটক রাঙামাটি এসে পাহাড় উঠতে চান। এসব পর্যকরা যেতে পারেন রাঙামাটির বরকলের ফালিতাঙ্যা চুগে। চুগ মানে উচু পাহাড়। এ পাহাড় ভ্রমনটি হতে পারে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। রাঙামাটি শহর থেকে নৌ পথে বরকল উপজেলা সদর। স্থানীয় গাইড নিয়ে ফালিতাঙ্যা চুগে গেলে পর্যটকরা বাড়তি সুবিধা পায়।

ফুরমোন 

শহরের কাছাকাছি থেকে পাহাড় উঠতে চান এমন পর্যটকরা ফুরমোনকে বেছে নিতে পারেন। মোন অর্থ বড় পাহাড়। এ ফুরমোনের চুড়ায় রয়েছে বৌদ্ধ মন্দির। এ পাহাড় থেকে রাঙামাটি শহরকে দেখা যায়। তবে পাহাড় উঠার আগে অবশ্যই পানি ও স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় খাবার নিতে হবে। স্থানীয় গাইড নিয়ে ফুরমোন উঠলে পর্যটকরা বাড়তি সুবিধা পায়।

কিভাবে যাবেন/কোথায় থাকবেন/কোথায় খাবেন

রাজধানী ঢাকার গাবতলি, কলাবাগান, পান্থপথ, ফকিরাপুল থেকে ডলফিন, শ্যামলী, হানিফ, ইউনিক, সেন্টমার্টিন, এস আলম বাস যোগে রাঙামাটিতে আসতে পারেন। শ্যামলী ও সেন্টমার্টিনে এসি সার্ভিস চালু আছে। বিভিন্ন বাসের ভাড়া ভিন্ন ভিন্ন। ৭/৮ ঘন্টায় রাঙামাটি পৌছে বাসগুলো। রাঙামাটিতে থাকার জন্য রয়েছে বহু হোটেল-মোটেল। রয়েছে বিভিন্ন সরকারি বিশ্রামাগার। কাতালতলি এলাকায় সুফিয়া ইন্টারন্যাশনাল, সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল, তবলছড়ির পর্যটন মোটেল, রিজার্ভ বাজারে মোটেল মতিমহল, গ্রীন ক্যাসেল, হোটেল প্রিন্স, লেকসিটি, কলেজ গেইটে মোটেল জজ, রাজবাড়িতে হোটেল ডিগনিটি অন্যতম, কোর্ট বিল্ডিং এলাকায় হোটেল শাপলা, ড্রিমল্যান্ড অন্যতম।

রাঙামাটিতে বেড়াতে এসে অনেকে আদিবাসী খাবার খেতে চায়। তাদের জন্য শহরের রাজবাড়ি এলাকায় রয়েছে একাধিক হোটেল। যার মধ্যে টুগুন রেস্টুরেন্ট, পিবির ভাতঘর, বিজুফুল, স্টিফেন ভাতঘর, বনরূপা বাজারে যদন ক্যাফে, আইরিশ অন্যতম।

এছাড়া যারা সাধারণ খাবার খেতে চায়, তাদের জন্য আছে বনরূপা বাজারে দারুচিনি, মেজবান, ক্যাফে লিংক অন্যতম।

কাপ্তাই হ্রদের মাঝখানে দ্বীপের কোথাও খেতে মন চাইলে চাং পাং, পেদা টিং টিং, মেজাং, গরবা রেস্টুরেন্টে খাওয়া যায়। তবে পরিবহন খরচের তারতম্যের কারণে দাম শহরের রেস্টুরেন্টের চেয়ে সেখানে একটু বেশি।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »