Ultimate magazine theme for WordPress.

ব্রাজিলের কোপাকাবানা বিচ পৃথিবীর অনিন্দ্যসুন্দর বিচগুলোর মধ্যে অন্যতম।

ব্রাজিলের ২৬টি প্রদেশের মধ্যে পঞ্চম বৃহত্তম বাহিয়া (সালভাদর যার রাজধানী) ফ্রান্সের চেয়ে বড়। সবচেয়ে ছোট প্রদেশ সাও পাওলো গ্রেট ব্রিটেনের চেয়ে বড়।

0

© আলমগীর দেওয়ান আকাশ  ক্রাইম টিভি বাংলা ব্রাজিল ডেস্ক ♦

জনশ্রুতি আছে_ ব্রাজিল তো আসলে একটা মহাদেশ!
কথাটা ঠিক মিথ্যে নয়। কেন জানেন? ফুটবলের দেশ, সাম্বার দেশ ব্রাজিলের বৈচিত্র্যময়তার গল্প শুনুন তাহলে…
এতো বড় দেশ!
ছোটবেলায় পড়েছি, কয়েকটি দেশ মিলে হয় একটি মহাদেশ। আর ব্রাজিল শুধু দেশই নয়। রীতিমতো এক মহাদেশতুল্য। পৃথিবীতে উপমহাদেশ আছে একটি। এই আমরাই যার অংশীদার। ভারতীয় উপমহাদেশ। কিন্তু জানেন কি, এক ব্রাজিলই ভারত দেশটার চেয়ে প্রায় তিন গুণ বড়! ভারতকে আমরা বলি, বৈচিত্র্যময় এক দেশ। তাহলে ব্রাজিল কী? ব্রাজিল হলো বৈচিত্র্যের বাবা!
ব্রাজিল কত বড়? বাংলাদেশের চেয়ে ৫৫ গুণ বড়। ওদের সাবেক উপনিবেশ পর্তুগালের চেয়ে বড় ৯২ গুণ। ঘাবড়াবেন না! ব্রাজিলের ২৬টি প্রদেশের মধ্যে পঞ্চম বৃহত্তম বাহিয়া (সালভাদর যার রাজধানী) ফ্রান্সের চেয়ে বড়। সবচেয়ে ছোট প্রদেশ সাও পাওলো গ্রেট ব্রিটেনের চেয়ে বড়। কী বুঝলেন? এটাই ব্রাজিল। ৮,৫১৫,৭৬৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তন তার। এ কারণেই ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম ও বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ। কিন্তু বৈচিত্র্যে আর সংস্কৃতিতে সম্ভবত পৃথিবীর সব দেশ ছাড়িয়ে ব্রাজিলের অবস্থান গগনচুম্বী!

ARYANE STEINKOPF in Bikini at a Photoshoot

ব্রাজিলের উত্তরে ভেনিজুয়েলা, গুয়ানা, সুরিনাম ও ফ্রেঞ্চ গায়ানা। দক্ষিণে উরুগুয়ে। উত্তর-পশ্চিমে কলম্বিয়া। দক্ষিণ-পশ্চিমে আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে। লাতিন আমেরিকার প্রায় সব দেশের সঙ্গেই ব্রাজিলের এ সখ্য! বাদ পড়ার মধ্যে শুধু ইকুয়েডর ও চিলি!
এত বড় একটা দেশে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত সময়ের পার্থক্য না থেকে পারে না বলেই ব্রাজিলে ব্যবহৃত হয় তিনটি টাইম জোন! আটলান্টিকের দ্বীপগুলোর জন্য একট, পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটা আর পূর্বাঞ্চলের জন্য একটা সময়। তবে, পূর্বাঞ্চলেরটাই সরকারিভাবে মান্য করা হয়।
যেন ঈশ্বরের বরমাল্য গলায়!
রিও ডি জেনিরোতে মাথা উঁচু করে আছে ৯৮ ফুট উচ্চতার সপ্তম আশ্চর্যের একটি_ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার। যিশুখ্রিস্টের মূর্তি। ২০১০ সাল পর্যন্ত এটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রতিকৃতি। এই মূর্তি ব্রাজিলিয়ানদের হৃদয়ে গাথা। ব্রাজিলিয়ানরা এখানে এসে প্রার্থনা করে। যিশুকে স্মরণ করে। হয়তো তাই, এত বড় দেশ হওয়ার পরও ব্রাজিলে কোনো দৈবদুর্বিপাক নেই! না টাইফুন-হ্যারিকেন-ভূমিকম্প, না তুষারঝড়-দাবানাল-আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত_ ব্রাজিলে এসবের বালাই-ই নেই! প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলতে একমাত্র উত্তরপূর্ব ব্রাজিলের ধারাবাহিক অনাবৃষ্টি আর দক্ষিণের মৌসুমি হিমবাহ। মাঝেমধ্যে আটলান্টিকের ঝড় উত্তাল সুর তোলে। তবে, সেটা তো স্বাভাবিকই। আটলান্টিক বলে কথা! ১৯৬৬ সালে রিওর ৫০০ মানুষের প্রাণঘাতের কারণ হয়েছিল আটলান্টিকের ঝড়। ওই শেষ। তাই, বিশাল ও অবিশ্বাস্য ভূখণ্ড ব্রাজিল যেন ঈশ্বরের বরমাল্য গলায় নিয়ে জেগে আছে!
বিশাল দেশ বলে, ব্রাজিলের আবহাওয়া পাঁচ রকমের! বছরের একই সময়ে এক ব্রাজিলেই আবহাওয়ার ভিন্নতা বেশ লক্ষ্যণীয়। বিমান যোগে কেউ এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে গেলে নিশ্চিতভাবেই তিনি আবহাওয়ার পরিবর্তনের দেখা পাবেন। নতুন কারও জন্য হঠাৎ করেই এই আগন্তুক আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া খুব কঠিন।
গায়ে তার ঔপনিবেশিক রক্ত
পর্তুগিজ ভাষায় যেসব দেশের মানুষ কথা বলে, তাদের বলা হয় লিউসোফোন দেশ। পর্তুগাল ছিল এক সময় রোমান সাম্রাজ্যের প্রদেশ। সেই প্রদেশ একদিন দেশ হয়ে গড়ে তুলেছিল ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য। ব্রাজিলে তারা এসেছিল ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে। পেদ্রো আলভারেস কাব্রালের নেতৃত্বে যেদিন থেকে পর্তুগিজ জাহাজ ব্রাজিলে ভিড়ল, সেদিন থেকে ব্রাজিলরা হয়ে গেল উপনিবেশ। ১৮০৭ সালে স্প্যানিশ আর নেপোলিয়নের ভয়ে পর্তুগিজ সাম্রাজ্য লিসবন থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ব্রাজিলে। অনেক চড়াই-উতড়াই পার হয়ে ১৮২২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর স্বাধীন হয় ব্রাজিল। কিন্তু পর্তুগিজদের ভাষাই গ্রোথিত হয়ে যায় ব্রাজিলিয়ানদের মুখে ও মননে। সেই থেকে ব্রাজিল লিউসোফেন কান্ট্রি। তবে, ব্রাজিলের সংসদে বিশেষ এক ধরনের সাংকেতিক ভাষার স্বীকৃতিও কিন্তু আইন করে পাস করা আছে!
বৈচিত্র্যময় মানুষ
আয়তনে ব্রাজিল পঞ্চম যেমন, ঠিক জনসংখ্যার বিচারেও ব্রাজিল পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম। ২২,৪০,৭৯,০০০ জন মানুষ তার। বাংলাদেশের চেয়ে মাত্র চার কোটি বেশি। কিন্তু ব্রাজিল সেই দেশ, যে দেশে বসবাস করে প্রায় দুই হাজারের মতো নৃগোষ্ঠী। স্বভাবতই তাদের জীবন যাপনের ধারাটাও আলাদা। এই বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির মানুষকে বুকে ধারণ করে পৃথিবীর মানচিত্রে দাঁড়িয়ে আছে ব্রাজিল। লাতিন আমেরিকান দেশ হলেও এখানে ৪৭.৭৩ শতাংশ মানুষই সাদা (পর্তুগিজ ভাষায় ব্র্যাঙ্কো)। ৪৩.১৩% ধূসর (পার্দো)। ৭.৬১% কালো (নিগ্রো)। ১.০৯% পূর্ব এশিয়ান (আমারেলো) ও ০.৪৩% আমেরিন্ডিয়ান (ইন্ডিজেনা)।
ধর্মে প্রবল বিশ্বাসী এই দেশের পঁয়ষট্টি শতাংশ মানুষ রোমান ক্যাথলিক। তার পরই আছে প্রোটেস্ট্যান্টরা। কিন্তু অবাক করা বিষয়, এই দেশের আট শতাংশ মানুষের কোনো ধর্মই নেই। ধর্মবিশ্বাস নেই_ ব্যাপারটা এমন নয় মোটেও। তাদের ধর্মই নেই!
প্রাণ-প্রকৃতি-প্রাচুর্যের বিস্ময়
আমাজনের কথা আর কী বলা যায়! পৃথিবীর বৃহত্তম বন হলো আমাজন। ব্রাজিল যেমন ফুটবলের, ব্রাজিল যেমন সাম্বার, ঠিক তেমনি ব্রাজিল হলো আমাজনের। এই বনের বিস্তৃতি ওই অঞ্চলের নয়টি দেশ জুড়ে থাকলেও সবচেয়ে বেশি অংশটা ব্রাজিলেরই। একশ’ পঞ্চাশ বছর ধরে এ দেশটা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রফতানিকারক দেশ। দূর থেকে কফির বাগান দেখলে মনে হবে এ আবার কোন মাঠ! কোকো উৎপাদনেও ব্রাজিল শ্রেষ্ঠ। আমাজন আছে বলেই হয়তো এখানে প্রায় চার লাখ উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর প্রজাতি উৎসভূমি। জাগুয়ার ও পুমা এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাণী। আটলান্টিকের কোলে জন্ম নেওয়া পিরানহার মতো ভয়ঙ্কর মাছকে ব্রাজিলের ‘মাছত্ব’ (নাগরিকত্ব নয় কিন্তু) দেওয়াই যায়!
সাম্বা আর ফুটবলে মাতোয়ারা ব্রাজিল কিন্তু পৃথিবীর অন্যতম পর্যটন-সুন্দর দেশ। এখানে ফেবেলাগুলো (বস্তি) আপনাকে জানাবে মানুষ কী দরিদ্রক্লিষ্ট। কিন্তু রাজধানী ব্রাসিলিয়া, রিও ডি জেনেরিওর মতো মহানগরগুলোর জাঁকালো ঐশ্বর্য আপনাকে এও দেখাবে, ব্রাজিল কতটা উন্নত ও ধনী হতে পারে। পৃথিবীর অনিন্দ্যসুন্দর বিচগুলোর মধ্যে অন্যতম কোপাকাবানা এই ব্রাজিলেরই কোলজুড়ে বিস্তৃত।
ব্রাজিল সম্ভবত পৃথিবীরই এক বিস্ময়। এতটা বৈচিত্র্যময় একটা দেশ (নাকি মহাদেশ?) হতে পারে? বাস্তবের এই ব্রাজিল যেন রূপকথারই অনবদ্য এক ভাষা!

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »