Ultimate magazine theme for WordPress.

কিউবার অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ জুড়ে আছে ট্যুরিজম।

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা ডেস্ক ♦

মেঘের উপরে সোনার বিকেল। উড়ে যাচ্ছি। অনুভবের গভীরে এক ধরনের ভাল লাগার চমক কিংকিণী বাজিয়ে চলেছে। একদিন মুক্ত মনে পাখিদের আকাশে ওড়ার আনন্দ দেখে মানুষের মনে সাধ জেগেছিল আকাশে ওড়ার। তারপর থেকে মানুষ গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছে নিশিদিন। মনে মনে রাইট   ব্রাদার্সকে স্যালুট জানাচ্ছি। শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা ধারণ করেই যারা চোখ মুদে থাকেননি তারাই আকাশে ওড়ার গূঢ় রহস্যকে আবিষ্কার করেছেন। মানুষের সামনে নিয়ে এসেছেন আনন্দের ঝর্ণা ধারা। আকাশে মেঘের উপরে স্বর্ণালী সন্ধ্যা দেখতে দেখতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে মনে হচ্ছিল এই যে যন্ত্রের উড়োজাহাজে চড়ে আমরা গন্তব্যে যাচ্ছি তার চেয়ে প্রকৃতির অংশ হয়ে মেঘে ভিজে ভিজে, গায়ে সোনালী আলো মেখে মেখে যদি উড়ে যেতে পারতাম, যদি হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করতে পারতাম সোনার আলোকে তাহলে কতইনা ভাল লাগত। এভাবে একসময় পথ শেষ হয়ে গেল, পৌঁছে গেলাম কিউবার ভারাডেরো বিমান বন্দরে।

আমরা ‘ সান উইং’ কম্পানির একটা বাসে উঠে পড়লাম যেটা আমাদের জন্য নির্ধারিত ছিল। কারণ ‘ সান উইং’ কম্পানির সাথেই আমাদের ভ্রমণ প্যাকেজের চুক্তি করা ছিল তাই এয়ার বাসটিও ছিল ‘ সান উইং’  কম্পানির। ছোট্ট শহর। নতুন দেখা বাতাবরণ আর পুরানো অভিজ্ঞতার সাথে নতুন সব অনুভবের অংশবিশেষ এবং অভিজ্ঞতা যুক্ত হচ্ছে। কিউবা রাষ্ট্রটি একটি  লম্বা দ্বীপ। চারিদিকে আটলান্টিক মহাসাগর।  কোন কোন রাস্তার পাশেই আছড়ে পড়ছে সাগরের ঢেউ। মন চঞ্চল হয়ে উঠছে , অনেকটা রোমাঞ্চকর লাগছে। সবুজ প্রকৃতিতে আছে অনেক অনেক নারিকেল গাছ, মাঝে মাঝে জায়ান্ট ক্যাকটাস আরও অনেক ধরনের গাছের পাতারা হাত নেড়ে নেড়ে যেন আমদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে। তখন রাতের আলো আঁধারের খেলার  সাথে নতুন দেশকে যেন একসাথে জেনে নেওয়ার চঞ্চলতা একটি  কথাই কানে কানে বলে যায় সে হল, ‘ভাল লাগছে।‘  মোটামুটি পরিচ্ছন্ন রাস্তা-ঘাট, বাড়িঘর  অবলোকন করে চোখের স্বস্তি আর মনের আনন্দ মিলে  মিশে বিচিত্র এক সুখানুভুতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে একদল  লোককে  নামানো হল ‘টুক্সপান’ নামক একটি রিসোর্ট অ্যান্ড হোটেলে। সুন্দর রিসোর্ট, নয়ন অভিরাম করে  সাজানো, চারিদিকে ফুলের বাগান, চমৎকার ভাবে গুছানো। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার দেশ তাই সেখানে দেখতে পেলাম বাংলাদেশে ফেলে আশা তারা ফুল, রঙ্গন ফুল, যাদেরকে কতদিন দেখিনা। তখন মনে হল আমার দেশের সাথে যতটুকু মিল পেয়েছি তার মূল্য আমার কাছে অনেক। তারপর পৌঁছাল আর একটি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে যার নাম ‘ব্লাও ভারাডেরো’ মনে  হল এখানে আর্কিটেক্ট আর একটু বেশী  মনোযোগ দিয়েছিল। এভাবে একটার পর একটা রিসোর্টে বেড়াতে আশা লোকদেরকে ছুটির আনন্দিত সময় কাটানোর জন্য রেখে যাচ্ছে। পথে পথে গাড়ির মধ্যেই আনন্দ প্রকাশ করার জন্য ড্রাইভার সাহেব মজার মজার কথা বলছেন, অনেক তরুণ উৎসাহী তার সাথে গলা মিলাচ্ছে। একেবারে শেষে পৌঁছে গেলাম হোটেল গ্র্যান্ড মেমোরিতে। ড্রাইভার সাহেব চিৎকার করে বললেন, এবার আমরা পৌঁছে গেছি দা লাস্ট অ্যান্ড বেস্ট হোটেলে। যাত্রীরা হাতে তালি দিয়ে, কন্ঠে উল্ল­াস প্রকাশ করে  নামতে শুরু করল হোটেল চত্বরে। তাকিয়ে দেখলাম বড় বড় ইংলিশ অক্ষরে লেখা আছে ‘গ্র্যান্ড মেমরি অ্যান্ড স্পা’ মানে এটাই আমাদের গন্তব্য। হোটেলে চেক ইন করার পর আমাদের একটি জায়গায় অপেক্ষা করতে বলা হল। বেলবয় এসে ইঞ্জিন চালিত ছোট একটি গাড়িতে আমাদের তুলে নিল এবং পৌঁছে দিল আমদের নির্ধারিত বিল্ডিংএ এবং রুমে ঢুকে আমাদেরকে সকল সুযোগ সুবিধার কথা বুঝিয়ে দিল। এখানে আমরা সাত দিন থাকব, এজন্য কি ধরনের আয়োজন আছে সবকিছুই। কিউবার রাষ্ট্র ভাষা স্প্যানিশ। ট্যুরিস্টদের সাথে মানে আমাদের সাথে সবাই ইংলিশে কথা বলছে ঠিকই তবে বেশীরভাগ মানুষ ভেঙ্গে ভেঙ্গে স্প্যানিশ এক্সেন্টে ইংলিশ বলছে। তবে সবকিছুই স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। তখন মনে হল মানুষ যদি মানুষের মনের কাছাকাছি যেতে চায় তাহলে ভাষা কোন প্রতিবন্ধকই নয়। এখানে তিন ধরনের মানুষ দেখা যাচ্ছে, সাদা, কালো, এবং বাদামী গায়ের রঙয়ের মানুষ। সবাই কিউবান। সে রাতটি ছিল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির রাত। ভিজে ভিজে খাবার সন্ধানে ঘুরছি আমরা তিনটে পরিবার। যাদের সাথে প্লে­নেই আলাপ হয়েছিল। হোটেলের ডাইনিং তখন বন্দ হয়ে গেছে কিন্তু স্নাকবার চব্বিশ ঘণ্টার জন্য খোলা আছে। বৃষ্টির পানিতে গা ভিজিয়ে, পা ভিজিয়ে, পুল ডিঙ্গিয়ে স্নাকবারে পৌঁছলাম। ওখানে কথা বলে জানলাম, ডাইনিং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খোলা থাকে। কিন্তু সব  বার গুলি (বিচের ধারের বার গুলি ছাড়া) চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে এবং আমরা জানতাম সব রকম খাবারই ইনক্লুসিভ। অনেকটা স্বস্তি অনুভব করলাম। গভীর রাত পর্যন্ত আমদের গল্প হল, তারপর ঘুমের জন্য ফিরে গেলাম যে যার রুমে। সকালে টিপ টিপ বৃষ্টি উপেক্ষা করে  ডাইনিংএ গেলাম, নাস্তা সেরে দিনের আলোতে সবকিছু বুঝে নেওয়ার তাগিদে ঘুরতে বের হলাম। আবহাওয়ার কথা না বললেই নয়।  কানাডায় ফল সিজন চলছে, তাপমাত্রা পনেরো, সতেরো থেকে জিরো ডিগ্রি সেলসিয়াস এ অবস্থান  করছে, ঠিক সেই সময় ভারাডেরো তে তাপমাত্রা ছিল সাতাশ, আটাশ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ভারাডেরোতে তখন একটি ডিপ্রেশন চলছিল যা দুইদিন স্থায়ী হয়েছিল। অনুকুল তাপমাত্রার কারণে ডিপ্রেশনের আবহাওয়া তেমন কোন বিরক্তির কারণ হতে পারেনি। তৃতীয় দিন সকালে আলোর বন্যায় যেন হাসতে লাগল, ভাসতে লাগল সকলই।

কিউবা সমাজতান্ত্রিক দেশ। কিউবার অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ জুড়ে আছে ট্যুরিজম। এখনে অনেক দেশ থেকেই ট্যুরিস্ট আসে বিশেষ করে শীতের দেশগুলি থেকে ট্যুরিস্ট এসে বেশি ভিড় করে। অনেকের   সাথে কথা বলে জানলাম  ইউরোপ, কানাডা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, এমনি  বিভিন্ন দেশ থেকে ভ্রমণ পাগল লোকেরা এখানে ছুটি কাটাতে এসেছে। কিউবার কারেন্সি স্ট্যান্ডার্ট হিশেবে ইউএস ডলার প্রচলিত। কানাডিয়ান ডলারের প্রচলন আছে তবে ইউএস ডলারই নির্ধারিত মূল্যমান। দেশটির সাথে কানাডার সম্পর্ক বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ তাই কানাডিয়ানদের মনে হয়েছিল একটু বেশী খাতির করে ওদেশের লোকেরা। হয়ত কানাডা বিশ্বের ধনী দেশগুলির একটি এবং সামাজিক নিরাপত্তার দিক থেকে প্রথমে অবস্থান করছে বলেই দেশটিকে গুরত্বের সংগে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিউবার কারেন্সিকে বলা হয় ‘পেসো’। ট্যুরিস্টদের জন্য সিইউসি নামে এক ধরনের কারেন্সি প্রচলিত আছে। একশত ইউএস ডলারে পাওয়া  যায় সত্তুর পেসো। ট্যুরিস্টদের জন্য সকল পণ্যের মূল্য সিইউসি তে নির্ধারিত থাকে। বৃষ্টির ঝামেলা উপেক্ষা করে ভারাডেরো ডাউন টাউনের দিকে পা বাড়ালাম। ডাবল ডেকার বাসে চড়তে আনন্দ অনুভব করলাম। আমরা একেবারে উপরে উঠে বসলাম তখন বৃষ্টি নেই। বাসের দোতলায় কোন ছাদ নেই, উন্মুক্ত স্থান থেকে সমস্ত শহর দেখা যাচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়েছে শহরের মূল আকর্ষণই হল আটলান্টিক মহাসাগর। যার রূপ দেখে দেখে তৃপ্তি হয়না। পথিমধ্যে একটা জায়গা অপূর্ব লেগেছে, নদী এসে একটা বাঁক নিয়ে নির্দ্বিধায় যেন সাগরে মিশে গেছে। সত্যিই অতুলনীয় দৃশ্য। আকাশ আর সীমাহীন সাগরের মাঝখানে কিউবা যেন একটি অপরূপ ভূখন্ড হিসাবে জেগে আছে, একথা ভাবতে ভাবতে মন বলাকা পাখা মেলে দিল। রবীন্দ্রনাথের বলাকার মতই মন ছুটতে  লাগল, নিজেকে মনে হতে লাগল মুক্ত বিহঙ্গের মত। তিনি যেমন বলেছিলেন, ‘হেথা নয় হোথা নয়, আর কোথা অন্য কোনখানে’  ঠিক তেমন করে  কী যেন এক  বেগের  আবেগে মন ছুটছে , কোথাও কোন বন্ধন নেই। আজ মন যেখানে যেমন ইচ্ছা ঘুরতে যেতে পারে তাই   সাগরের বুকে উড়ে যাচ্ছে মন বলাকা। কোন লক্ষ্য নেই। শুধু ছুটে চলাই একমাত্র উদ্দেশ্য, গতিই যেন জীবনের সবটুকু অনুভব জুড়ে সত্য হয়ে আছে আর কিছু নয়। সাগরের বিশালতা প্রত্যক্ষ করলে হয়ত মানুষের মন এমন  চঞ্চল হয়ে যায়। রাস্তার দুই পাশে  চমৎকার সবুজ প্রকৃতি দেখে ক্যমেরা ক্লিক ক্লিক করতে লাগল। প্রথমে একটা মার্কেটে পৌঁছলাম। মার্কেটটি সাজানো গোছানো। নাম লেখা আছে ‘প্ল­াজা আমেরিকা’। নাম দেখে ভাল লাগছিলনা। স্বাভাবিকভাবে একটি উপলব্ধি কাজ করছিল যে আমরা আমেরিকা অথবা কানাডার কোন কিছু দেখতে এখানে আসিনি এসেছি কিউবান নিদর্শন দেখতে। অনিচ্ছা নিয়ে দুএকটা দোকানে ঘুরলাম। সব পণ্যের গায়ে লেখা আছে সিইউসির নাম।

কোনটি ৫০, কোনটি ৩০  কোনটি ২০ সিইউসি এমনি নানা রকম পণ্য এবং নানা ধরনের মূল্যমান। তখন মনে হল এখানে সব পণ্যেরই মূল্য কিছুটা বেশী। খানিকটা অস্বস্তি লাগছে  ট্যুরিস্টদের জন্য সকল পণ্যের একটু বেশী মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে। যারা  ট্যুরে আসে তারা শপিং এর চেয়ে বেশী ব্যস্ত থাকে দর্শনের আকর্ষণে। তারা বেশী শপিং করেনা বলে আমার ধারনা।  তাছাড়া একই মানের পণ্য আমেরিকা-কানাডায় আরো খানিকটা কম মূল্যে পাওয়া যায়। উল্লে­খ করার মত  তেমন কিছু কেনা হলনা কিন্তু অভিজ্ঞতা হল  দেশের অর্থনৈতিক মানসের একটি পার্ট সম্পর্কে। তখন আমার মনে হতে লাগল যদি পণ্যের মূল্য আরো কম করে নির্ধারণ করা হত তাহলে হয়ত ট্যুরিস্টরা কিছু বেশী পন্য ক্রয় করত। ওখান থেকে ফিরে আমরা গেলাম  একেবারে ভারাডেরো ডাউন টাউনের ফ্লি মার্কেটে। মার্কেটটি বাইরে থেকে দেখে মনে হল কতগুলি টেন্ট লাগানো একটা অস্থায়ী ব্যবস্থা। ভিতরে ঢুকে দেখলাম ওখানে কিউবান সুবিনিয়ারে ঠাঁসা। কাঠের তৈরি পণ্য, সমুদ্রের ঝিনুক দ্বারা তৈরি বিভিন্ন ধরনের পণ্য, সত্যিকারের স্টোন এবং পার্লের গয়না দিয়ে সাজানো রয়েছে। আবার যে গয়নাটি যে স্টোন দিয়ে তৈরি তার একটুকরা নমুনা পাশে রাখা আছে। মুক্তার গয়নার পাশে মুক্তাওয়ালা ঝিনুক রাখা আছে। কোন পণ্যের দামই নির্দিষ্ট করা নেই। তবে মনে হচ্ছিল টুরিস্টদের কাছে সব পন্যের দামই একটু বাড়িয়ে চাচ্ছে। অর্থাৎ যার কাছ থেকে যতটুকু বেশি মূল্য রাখা যায়  ততটুকুই যেন তাদের লাভের অংশ হিসাবে গণ্য হবে। এটা এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক দীনতা। প্রথমে তারা  জিজ্ঞেস করছে  কানাডা থেকে এসেছি কিনা। আমি দোকানে কানাডার নাম  বলার পর কিছুতেই কোন পণ্যের দাম এতটুকু কমাতে রাজি হয়নি তাই বেশি দামেই কিছু কিনে নিতে হল। ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম  আর ভবতে থাকলাম, অনাকাঙ্ক্ষিত মূল্যে বেশী কিছু কেনা যাবেনা অথচ অনেক  কিছুই কিনতে ইচ্ছে করছে।  হঠাৎ করে দেখতে পেলাম দুজন কেনেডিয়ান মহিলা বলল তারা ইন্ডিয়া থেকে এসেছে। তাদের গায়ের রঙ ছিল বাদামী, হয়ত তারা ছিল ইন্ডিয়া থেকে আগত ইমিগ্রান্ট। ইন্ডিয়া শুনে অনেকেই দামের ব্যাপারে তাদের সাথে কিছুটা  নমনীয় ভূমিকা পালন করল যা পরিষ্কার বুঝতে  পারলাম। ঘুরতে যেমন ভাললাগল তেমনি  তাদের মানসিক প্রবণতা প্রকাশ পেল এবং মনে হল এ যেন এক চেনা মার্কেটের চরিত্র, যাকে অনেক পিছনে ফেলে এসেছি । তৃতীয়  বিশ্বের মার্কেট গুলোর সাথে কিছুটা চারিত্রিক মিল পেলাম। চোখের  সামনে ভেসে উঠল ইন্ডিয়া-বাংলাদেশের মার্কেটের চরিত্র। তবে ক্রেতাদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে উল্লি­খিত দেশ দুটির চেয়ে এদেশের মার্কেট ও পণ্যের মান অনেক উন্নত মান সম্পন্ন যা ইউরোপ এবং আমেরিকা, কানাডার সম পর্যায়ের । ফেরার সময় প্রচন্ড বৃষ্টির কবলে পড়ে ফ্লি মার্কেটে ঘোরার আনন্দ অনেকটা হ্রাস পেল। আর ছাদে বসা হলনা এবার জানালা দিয়ে শহর দেখছি।  শহরের বাড়িগুলি দেখছি আর ভাবছি সব দেশের মানুষেরই হয়ত মনের অনুভূতি একই রকম। হয়ত সব দেশের নাগরিক গণ বিশ্বাস করে  আমাদেরই মত “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবেনাক তুমি/ সকল দেশের রানী সেজে আমার জন্মভূমি।“

বিকেলে হোটেলের স্যুইমিং পুল যেন আমদেরকে অনেকটা টেনে নিয়ে গেল। তখন আর বৃষ্টি নেই, চমৎকার মিউজিক বেজে চলেছে। ‘সালসা’ ওদের প্রিয় মিউজিক। পুলের সঙ্গেই মিনি বার সেখানে সব ধরনের পানীয় পাওয়া যায়। একদিকে স্নাকবার আছে ইচ্ছে করলে সেখানে কিছু খেয়ে আবার পুলে ফিরে আসা যায়। ও দেশে আইনের প্রয়োগ খুব কঠিন। ওখানে কোন অপরাধ সংগঠিত হয়না। অপরাধ কাকে বলে সাধারণ কিউবানরা হয়ত এর রূপ ভুলে গেছে। সরকার আইনের মাধ্যমে যা নিষিদ্ধ করেছে তা ভঙ্গ করার ক্ষমতা কারো নেই। সব রকম পানীয় অবাধে মানুষ খেতে পারে। যে যত ইচ্ছা ড্রিঙ্ক করতে পারবে  কিন্তু ড্রাংক অবস্থায় সব ধরনের অপরাধ নিষিদ্ধ। তাই তারা ক্রাইম থেকে মুক্ত। একটি দেশে সাধারণ মানুষের সমাজে কোন ক্রাইম সংগঠিত না হলে সামাজিক ও মানসিক ভাবে নাগরিকগন সর্বাধিক নিরাপদে বসবাস করতে পারে। একটা আর্থিক দীনতা কিউবা বাসীর অন্তরে অন্তরে ক্ষীণ ধারায় বইছে  যা আমি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছি। তখন আমাকে একটা চিন্তা অসম্ভব ভাবিয়ে তুলেছে; আমরা একটা সংস্কার নিয়ে বড় হয়েছি যে, অভাবে স্বভাব নষ্ট ;অর্থাৎ দারিদ্রতার কারণে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। কিউবাকে দেখে আমার সেই আজন্ম বয়ে আনা ধারনা সমূলে উৎপাটিত হয়ে গেল। বোধটা আরও সুস্পষ্ট হল যে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে অপরাধ প্রবণতা কালচারের ঘারে চড়ে আসে, কখনো দারিদ্রতার ঘারে চড়ে আসেনা। মানুষ স্বভাবতই অপরাধ প্রবণ কিন্তু আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারাটাই কালচারের অঙ্গ। কিউবান সরকার সেটুকু পেরেছেন। সামাজিক জীবনের চারিদিক কণ্টক মুক্ত করতে পারা এবং সমাজের আর্থিক উন্নতিকে গতিমান করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কেবল দেশের মানুষ ধনী হলেই সব  কিছুর সমাধান হয়ে যায়না; আর্থিক উন্নতির পাশাপাশি প্রয়োজন নৈতিক জীবন বোধ এবং সকল মানুষের অবাধে সমাজে বিচরণ করার নিশ্চয়তা। ধর্ম, গোত্র, সেক্স নির্বিশেষে রাষ্ট্রীয় আইন মেনে সকলের  জীবনকে বন্ধনহীন করে তোলাই সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিউবাতে কিছুটা আর্থিক দীনতা থাকলেও তারা মানুষের যাপিত জীবনে এবং সংস্কারে অনেকখানি অপরাধ মুক্ত। এখানে নারী ও পুরুষের মধ্যে বাহ্যিক কোন প্রভেদ নেই। যদিও অন্তরে কি আছে আমরা বাইরে থেকে তার খোঁজ রাখিনা। সকলেই এখানে মানুষ হিসাবে গন্য হয় এবং সবক্ষেত্রেই তাদের অধিকার সমান। নারী পুরুষের মধ্যে সামাজিক বিভেদ বলতে দৃশ্যমান কিছু চোখে পড়েনি। যা  মানুষ হিসাবে আমাকে আকর্ষণ করেছে। আমি যে সামাজিক নিয়মগুলি দেখে বেড়ে উঠেছি, যাকে কোনভাবে সমর্থন করতে পারিনি কোনদিন, সেই নিয়মগুলি কোনখানে নেই , যা অনেকখানি মানসিক স্বস্তি নিয়েই অনুভব করেছি। ওখানে সেক্সের  শাসন  মানুষকে  প্রথার দড়ি দিয়ে টেনে পেছনে নিয়ে যাচ্ছেনা। এক শ্রেণীর মানুষের অবমাননায় আর এক শ্রেণী ধন্য হয়না, কারণ সেখানে আইন ভঙ্গকারী আইন ভাঙ্গাকে বীরত্ব মনে করেনা। প্রথাদৈত্যই একমাত্র জীবনসঙ্গী হয়ে ওঠেনি, জীবনের সবটুকু পরিসর জুড়ে নির্ভীক প্রথার অভয় দৌড় নেই ওখানে যেটা এশিয়ানদেশগুলিতে চরম ভাবে প্রতিয়মান। (চলবে)

যেসব পণ্য তারা উৎপাদন করছে তার মধ্যে চিনি শিল্প আর সিগারেট শিল্প দেশটিকে সমৃদ্ধ করেছে। এক সময়য়ের বিশ্ব নন্দিত হাভানা চুরুটের কথা সর্বজন বিদিত। আখের চাষ করার জন্য আফ্রিকা থেকে এবং চায়না থেকে সেøভ ধরে এনেছিল প্রথম দিকের স্প্যানিশ রাজাগণ। কার্লোস নামে একজন স্বাধীন চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষ যিনি ছিলেন একজন আখ চাষি তিনিই প্রথম সেøভদেরকে মুক্ত করার কথা ভাবেন এবং একসময় স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তার মুক্ত মানবিক চিন্তাই মানুষের বন্ধন থেকে মানুষকে মুক্ত করেছে। চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়েছে সেø­ভিয়ান প্রথা।

কেটে গেল আরও একটি রাত। সময়ের ঘোড়া দ্রুত গতিতে ছুটতে লাগল।পরের দিন সকালে ঝলমলে রোদের মধ্যে মন ছুটাছুটি করতে শুরু করল। মনে হচ্ছিল মানুষ কেবল শুভ বোধের দ্বারাই সুখকর ও কল্যাণকর বোধ খুঁজে পেতে পারে। মনে হবে আলোর সাথে এসব মনে হওয়ার সম্পর্ক কি? আসলে  বাঁধন হারা সময় টুকুই এসব ভাবনার কারণ হয়ে উঠেছে হয়তবা। যখন আমরা ছুটি কাটাতে গিয়ে বাঁধন হারা সুখ অনুভব  করছি ঠিক সেই মুহূর্তে পৃথিবীর অনেক নিরীহ মানুষ প্রথার বন্ধনে নির্যাতিত হয়ে সন্ত্রাসে মারা যাচ্ছে। পৃথিবী জুড়ে এভাবেই  সুখে অসুখে মিলেমিশে মানব জাতি ছুটে যাচ্ছে কোন এক লক্ষের দিকে।

আটলান্টিক মহাসাগরের উদার আহ্বান আমাকে চুম্বকের মত টানছে। আমরা আটলান্টিকের বিচে গিয়ে পৌঁছলাম। বিচের চেয়ারগুলিতে কেউ শুয়ে শুয়ে বই পড়ছে, কেউ গায়ে সোনার রোদ মাখার জন্য শুয়ে চোখ বন্ধ করে আছে, কেউ বেলা ভূমিতে ঝিনুক কুড়াচ্ছে, কেউবা সমুদ্রের জলে ঝাপ দিয়ে ধেয়ে আসা ঢেউ গুলির সাথে খেলা করছে। সবার চোখে মুখেই একটা আনন্দের ঝলকানি সুস্পষ্ট। আমি অপেক্ষা করতে পারলামনা ঝাপ দিলাম অতল সীমাহীন সাগরের বুকে। ছোটবেলায় আমি এই বক্তব্যের  ভাব সম্প্রসারণ করেছিলাম, ‘সমুদ্রের বুকে ঝাপ দাও, তরঙ্গকে আঁকড়ে ধরো ওখানেই আছে অনন্তজীবন।‘ কথাটা তখনকার চেয়ে আজ যেন বেশী বেশী অনুভব করছি। যে কথাগুলি আমাকে সারা জীবন ধরে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে , এবং সেই আত্মসঙ্গী হয়ে যাওয়া কথাগুলি যে একটা চিত্রকল্প বহন করে বেড়াচ্ছে সে যেন বাস্তব রূপ ধারণ করে আমার সামনে উপস্থিত হল । যদিও এর   অর্থগত দিকটা অনেক ব্যাপক কিন্তু আজকের সমুদ্রের বিশালতার কাছে, ব্যাপকতার কাছে যার সমস্ত বিস্তৃতি হারিয়ে কেবল জেগে আছে ঢেউয়ের সাথে খেলা করার আবেদনটুকু। তাই সমুদ্রের জোয়ারের সাথে একাকার হয়ে  গেলাম শুধু।

এবার হাভানা যাওয়ার আয়োজন চলছে। হাভানা কিউবার রাজধানী। শহরটি বিশাল নয় তবে তাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। চারশ’ বছর ধরে স্পেন কিউবার শাসন ক্ষমতায় থাকার পর  আমেরিকার সাথে স্পেন এর যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় কিউবার মালিকানা নিয়ে। ১৮৯৮ সালে যুদ্ধ শেষ হয় এবং  আমেরিকা যুদ্ধে জয় লাভ করে এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে। এরপর ক্রমাগত ইতিহাসের পট পরিবর্তনের  মধ্য দিয়ে একসময় কিউবা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়।  এসব উত্থান পতনের  নিদর্শন তাদের  স্থাপত্য শিল্পে বহন করে চলছে। শহরটিতে আমেরিকা এবং স্পেনের শাসন কালের নিদর্শন এখনও জীবন্ত। কিউবার ডিক্টেটর নামে পরিচিত ফিদেল ক্যাস্ট্রো দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর বাবা স্পেন থেকে আগত একজন ইমিগ্রান্ট ছিলেন। ফিদেল ক্যাস্ট্রো দেশের সংবিধান সহ অনেক পরিবর্তন সাধন করেন। পরবর্তীতে তিনি শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার ভাই রাউল ক্যাস্ট্রোর কাছে ক্ষমতা হস্তার করেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান এর পদ থেকেও তিনি অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু পরোক্ষভাবে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় তার দর্শনকে চলমান রেখেছিলেন। বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন দেশের শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতাসীন হওয়ার ফলে দেশের সামাজিক এবং  ধর্মীয় সংস্কার বহু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একটা নিজস্ব রূপ ধারন করেছে। যদিও ধর্মের শাসন নিয়ে কোনরকম বাড়াবাড়ি নেই, তবু সাধারন জনগণের মধ্যে একটি অস্পষ্ট ধর্মীয় অনুভূতি কাজ করছে সেটি হল ক্যাথলিক খ্রীস্ট ধর্ম। হাভানা ক্যাথলিক চার্চ তার দৃষ্টান্ত  বহন করছে। চার্চের  পাশেই রয়েছে ধর্ম শিক্ষার স্কুল। ইচ্ছে করলে দেশের যে কোন নাগরিক সেখানে ধর্ম শিক্ষা পেতে পারে। পোপ হলেন সেই স্কুলের প্রধান ব্যক্তি।

হাভানা যাওয়ার পথে একটি জায়গায় আমরা থেমেছিলাম কিছু খাওয়া দাওয়া আর ফ্রেশ হওয়ার জন্য। সেখানে একটা রেস্টুরেন্টে আমরা যে যার মত বিভিন্ন প্রকার স্নাক খেলাম ফ্রেশ হলাম আবার চললাম গন্তব্যের দিকে। ভ্রমণের ফর্মুলা অনুযায়ী মিউজিয়াম, প্রধান চার্চ, দুর্গ, রেভুলেশন স্কয়ার, মহানায়কদের শ্বেত পাথরের মূর্তি, ঐতিহাসিক নিদর্শন বর্ণনা এবং ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দ মিলে কখন সময় ফুরিয়ে গেল টের পাইনি। ভ্রমণে যাওয়া বেশ কয়েকজন টরন্টোবাসীর সংগে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল এরা কেউ ইমিগ্রান্ট, কেউ টরন্টোরিয়ান, সবাই মিলে আমরা এক দেশের অস্তিত্ব বহন করছি বলে সবাইকে একই সংস্কৃতির মানুষ মনে হচ্ছিল। আমরা কানাডিয়ানরা সবাই মিলে লাঞ্চের জন্য রেস্টুরেন্টে একটি টেবিলে বসেছি , গল্পের ছলে যে যার অভিজ্ঞতার কথা বলে চলল। কেউ নেতিবাচক ভঙ্গী প্রকাশ করল কেউ আবার অনেকটা ইতিবাচক মত প্রকাশ করল, তবে নেতিবাচক কথার দিকেই সকলের ঝোঁকটা একটু বেশী ছিল। আসলে কেউ ঠিকঠাক করে বলতে পারেনা যে টেবিল টক কোন দিকে ঝুঁকে পড়বে, আমদের বেলায়ও তাই হল। ফেরার পথে আমরা একটা অতি পুরাতন দুর্গ দেখার জন্য থেমেছিলাম সেখানে ছোট একটি মার্কেট আছে যেখানে সব কিউবান সুবিনিয়ার কেনার জন্য একটা বিশেষ জায়গা, ছোট ছোট একচালা ছাউনির মধ্যে দোকানের জৌলুস মন্দ নয়। কিছু কেনাকাটা সেরে ফিরতে বেশ অন্ধকার হয়ে গেল, তখন জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ কবিতার মত করে মনে হতে লাগল সব পাখী ঘরে ফেরার লগ্ন এলো এবার।

 

আমরা কোন ট্যুরে কিভাবে কখন যাবো তার একটা নির্দেশনা পেয়ে গিয়েছিলাম আগেই, কারণ প্রথমে রেজিস্ট্রি করতে হয়েছিল এবং টাকা জমা দিতে হয়েছিল আমাদের হোটেলেই। সমস্ত দিনের  ভ্রমণের আনন্দের রেশ পরের দিনেও যেন সতেজ হয়ে আছে। পরের দিন প্রভাত আলোয় শরীর ভিজিয়ে আমরা কোন এক আনন্দের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। এবার সমুদ্রে যাবো, অনুভূতিটা এরকম যেন অনেক আগেই মনটা সমুদ্র যাত্রায় নেমে পড়েছে তাই সে সাগরের বিশালতায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। নতুন নতুন দৃশ্যাবলী পেছনে রেখে আমরা ছুটছি , ক্রমাগত চলে যাচ্ছি কোন এক আনন্দের সাজানো ঘরে। আমাদেরকে বহনকারী বাস এসে পৌঁছল একটা টার্মিনালে যেখান থেকে দেখতে পেলাম সাগরের বুকে ভেসে যাচ্ছে  শত শত প্রমোদ তরী। এর মধ্যে একটা এসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, নাম তার ‘কাটামারাং।‘ লাইন ধরে একে একে উঠে  পড়লাম যার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল তাকে হাত ধরে সাহায্য করল ভ্রমণ আয়োজকরা । এভাবে  সবাই  উঠে গেলাম সমুদ্রের বুকে ভেসে যাওয়া একটি বোটে। হৃদয় তখন কি এক ভাললাগার আনন্দে বিভোর।  বোটের আকৃতি জাহাজের মত নয় অনেকটা বন্ধনহীন ভেসে বেড়ানোর উপযোগী করেই তৈরি। বোটের মধ্যে যেন আনন্দের ঝর্ণাধারা বইছেতো  বইছেই। নাচে গানে মাতোয়ারা সকলে। যেন পৃথিবীর সব আনন্দ এখানে এসে জমা হয়েছে। সকলেই সুইমিং কস্টিউম পরে আছে, আমি এমন একটি দেশে জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি যে দেশের মানুষ মনে করে মেয়ে মানুষের অঙ্গ দেখলে পুরুষ মানুষ হামলে পড়বে তাঁর উপর, তাই আমার হৃদয়ে চলছে অনুসন্ধানের যজ্ঞ। আমার চোখ সকলের মুখ অনুসন্ধানে  তৎপর হয়ে উঠল, বুঝতে  চেষ্টা করছি কারো মুখে ভেসে উঠছে নাকি ধর্ষণের আগ্রহ। কোন মানুষের চোখে মুখে  মেয়ে মানুষের অঙ্গ দেখে তাঁকে ধর্ষণের অভিলাষ জেগে উঠতে দেখিনি। কোন পুরুষকেই পাপী মনে হচ্ছেনা যে তাকে দেখে মেয়েরা অঙ্গ ঢাকতে তৎপর হয়ে উঠবে। কোন পুরুষ মানুষকে দেখে  মনে হচ্ছেনা নারীকে সুইমিং কস্টিউম পরা দেখে লালসার যাতনায় মরে যাচ্ছে। এখানে আনন্দটা নির্মল। এটাকেই বলে স্বাধীনতা, যা বাংলাদেশে প্রথার মধ্যে হারিয়ে গেছে।  যেখানে প্রথার আগ্রাসনেই  রচিত হয় নারী ও পুরুষের বিভেদের ফারাক। নারীর অঙ্গ দেখলে পুরুষের আগ্রাসী চিন্তা বেড়ে যায় কেবল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে; যারা নারীর দিকে শুধুমাত্র যৌনতার দৃষ্টিতেই তাকায়। মনে হয় আজন্ম লালিত কী যেন এক আক্রোশ বহন করে চলছে নারীদের প্রতি পুরুষ চরিত্রগুলো। তাই তাকে ধর্ষণের পর মেরে ফেললে জীবনের প্রতি কোন অন্যায় করা হয়না যেন। তাদের বেঁচে থাকা এবং মৃত্যু বরণ করা দুটোই যেন  পুরুষের অভিলাষ। নারী একজন মানুষ একথা কোনভাবেই  যেন  ভাবতে পারেনা তারা। কিন্তু ঐ ভাবনার বৃত্তের বাইরে যারা অবস্থান করেন তাদের মাথায় ধর্ষণের চিন্তা বা মতলব কোনটাই আসেনা। এর মনস্তাত্ত্বিক  কারণ হল যখন এসব সামাজিক প্রথাগুলি তৈরি  হয়েছে তখন মানুষের জীবনে যৌনতার আনন্দ ছাড়া আর কোন আনন্দের ব্যবস্থা ছিলনা। মানুষের মনে কখনও আসেনি যে যৌনতাকে অতিক্রম করেও সকল মানুষ মিলে নির্মল আনন্দের ব্যবস্থা করা যায়। আজকের সভ্য জগতে যৌনতার আনন্দ কেবল নিতান্তই ব্যাক্তিগত; মানে সেটা কেবল দুটি মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এবং নিয়মতান্ত্রিক । কিন্তু নৈর্ব্যক্তিক আনন্দের ব্যবস্থা করতে হলে ঐ সীমাবদ্ধ ভাবনার বাইরে গিয়ে  সকলের আনন্দের উৎসকে খুঁজে বের করতে হয়। যে আনন্দের নেপথ্যে থাকবেনা কোন ভীতির  কুহেলিকা। মানুষের আনন্দ লোভী মন সভ্য মানুষকে তাগিদ দেয় যে অনেকে মিলে যতটুকু আনন্দে ভেসে যাওয়া যায় সেটুকুই জীবনকে সহজ ও স্বাভাবিক করে রাখে। কুসংস্কার মুক্ত করে এবং মানুষকে উদার হওয়ার মন্ত্র শিখায়। মানুষের অন্তরে অন্তরে সর্বদা দুটি মন্ত্র সক্রিয়, একটি হল মানুষে মানুষে আনন্দের মাধ্যমে সৌন্দর্য মণ্ডিত মানব সভ্যতা গড়ে তোলা, অন্যটি হল কোন প্রথা ও  কোন সংস্কারের কারণে মানুষে মানুষে  শত্রু  ভাবাপন্ন সম্পর্ক তৈরি করা, এবং প্রথাবদ্ধতাকে  অন্তরে ধারণ করে মানুষের  ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য সকল সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করা।  এই দুটি সত্যের মধ্যে মানব জাতি কোনটিকে গ্রহণ করবে তা নির্ভর করে  তাদের মানসিক প্রবণতার উপর। এভাবেই জাতিগত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়।

সীমাহীন সমুদ্রের মাঝে একটি নির্দিষ্ট স্থানে এসে আমাদের বোটটি থামল। সাগরের বুকে একটি  সুবিধা জনক জায়গা পছন্দ করে বিশেষ ব্যাবস্থায় স্টেশন করা আছে। একইভাবে দুটি স্টেশন তৈরি করা আছে। একটা বড় এরিয়া জুড়ে কোন কিছু আটকে রাখার মত করে  গোলাকৃতি আয়োজন রয়েছে। যখন সেই স্টেশনে আমরা নেমে পড়লাম আনন্দে মনটা যেন চঞ্চল হয়ে উঠল। চারিদিকে অন্তহীন সাগর  মাঝখানে  মানব সৃষ্ট একটি ঘাটি , ডলফিনদের আবদ্ধ রাখার জন্য এ ব্যবস্থা। তবে  ডলফিনদের অবরুদ্ধ রাখার প্রক্রিয়াটি দেখে মনে হল সাগরের বিশালতাকে ব্যাহত করা হয়নি এতটুকু। ডলফিনরা সেখানে বসবাস করলেও তাদের অবরোধ করে রাখা হয়েছে সে রকম মনে হচ্ছেনা। দেখে মনে হচ্ছে এ এক অদৃশ্য অবরোধ। কারণ এই গোলাকৃতি জায়গাটির মেকানিজম চমৎকার। যেহেতু ডলফিন বড় আকৃতির মাছ তাই তার শারীরিক আকৃতির তুলনায় খানিকটা ছোট ছোট ফাকা দিয়েই রচিত বন্ধন।। তাঁরা ছুটে যেতে পারছেনা তবে তাদের অবরোধের কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছেনা । একে একে সকলে নেমে গেল ডলফিনের সাথে খেলা করতে। ডলফিনের পছন্দের খাবার হিসাবে এক ধরণের মাছ তাদেরকে খেতে দেওয়ার কারণে যেন উৎফুল্ল হয়ে শিখানো খেলা দেখাতে লাগল পরম উৎসাহে।  যখন ডলফিনের পিঠে চড়ে সাগরের জলে ঘুরছি তখন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল , মনে হচ্ছিল সমস্ত বাস্তবতা স্বপ্নের জগতে হারিয়ে গেছে। রিসোর্টের পক্ষ থেকে ক্যামেরা ম্যান ছিল, প্রায় সবাই ডলফিনের সঙ্গে চমৎকার যত ছবি  উঠাল। ডলফিন  মাছ হয়ে মানুষের গালে চুম্বন করছে ফটো স্যুটের জন্য। দৃশ্যটি দেখে আমার মনে আনন্দের ঝর্ণা বয়ে গেল।

এবার একটা মজার ইভেন্ট আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে যার নাম ‘স্নোর কেলিং।‘ মহাসাগরের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে মানুষেরা জলের তলদেশে গিয়ে কতকি রহস্য উদ্ধার করেছে, ঠিক তাদের মতই যেন আমরা সকলে খেলায় মেতেছি। দেখে মনে হচ্ছে সবাই সাগর মন্থনে নেমেছে। কিছু ভীতু মানুষেরা জিজ্ঞেস করে যখন জানতে পারল পানির গভীরতা এখানে একেবারেই নেই তখন তাদেরকে এক একজনকে সম্রাটের মত মনে হল, তাদের চোখ মুখ ঝলকানি দিয়ে উঠল। কেউ মাছদের খাবার দিয়ে  জড়ো করেছে , কেউ সাঁতার কাটছে । এভাবে প্রকৃতির সাথে মানুষের মেলেমেশাটাকে অবাঁধ না হলে মানুষ এক বিপুল  আনন্দ থেকে বঞ্চিত  হয়। ওখানে পানির সচ্ছতা দেখে মন যেমন মুগ্ধ হয়েছে তেমনি নিজেকে অনেক বেশী মুক্ত মানুষ ভাবতে ইচ্ছে করেছে , যে মুক্তি আমার নেপথ্যে ফেলে আশা সংস্কৃতির মধ্যে কিঞ্চিৎ  ম্রিয়মান ছিল। এভাবে ত্রিশ মিনিট কি ভাবে কেটে গেল টের পেলামনা। কারণ আমাদের ত্রিশ মিনিটই বরাদ্দ ছিল। সকল বয়সের মানুষেরা আবার একে একে উঠে এল বোটের মধ্যে। আমাদের কাপড়  আমাদের শরীরেই শুকাল। ক্রমাগত আনন্দ ধারা সামনে নিয়ে চলল আমাদেরকে, আমরা ছুটতে ছুটতে একটা ছোট্ট দ্বীপে পৌঁছে গেলাম। দ্বীপটির  শুভ্র সৈকত এখনও মনের নির্জনে জেগে আছে। সেই সৈকতের রূপ যুগান্তরের মুগ্ধতাকে অতিক্রম করে গেছে । প্রকৃতি সম্পর্কে মানব গোষ্ঠী এবং তাদের পূর্ব পুরুষেরা যতটুকু ভাবতে পেরেছে তার চেয়েও যেন  সুন্দর  কোন দৃশ্য এখানে, অন্তত আমার মনে তেমনই একটা অনুভূতি এসে জুটেছে। রবি ঠাকুরের সেই গানটি আমার হৃদয়কে চঞ্চল করে তুলছে , ‘ওরে ওরে ওরে আমার মন মেতেছে/ তারে আজ থামায় কেরে।‘ এখানে এসে মনে  হল মন যেন মুক্ত ও সাবলীল। দিগন্তব্যাপী শুভ্রতার মধ্যে একটি দ্বীপ জেগে আছে যেন পরম তৃপ্তি নিয়ে। যে দ্বীপটি মানব সভ্যতার পদচারনায় অনেক বেশী মুখর ,  অনেক বেশী পরিপাটি । এখানে  প্রয়োজনীয়  সব ব্যবস্থাই রয়েছে। লাঞ্চ সেরে সমুদ্র সৈকতে নেমে পড়ল সবাই। যতদূর দৃষ্টি যায় শুভ্র রঙের বালুচর আর সঙ্গে সমুদ্রের সচ্ছ পানি। শুভ্র সমুদ্র সৈকতে যেন কী আনন্দে সকলে লুটোপুটি করছে আর সাথে সাথে ক্যমেরা ক্লিক ক্লিক করে চলেছে। কেউ সেলফি তুলছে , কেউ অন্যের সাহায্য নিচ্ছে , এভাবে আলোর গল্প , আনন্দের গল্প , মুক্তির গল্প , প্রকৃতির কাছে ছুটে যাওয়ার গল্প দিয়ে ভরে উঠল আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি। সমুদ্র থেকে যেন কুড়িয়ে আনা অজস্র স্ফূর্তির ঝিনুক মালা গেঁথে যাচ্ছে হৃদয়ের অন্তরালে বসে কে যেন , যাকে শুধু অনুভব করা যায় দেখা যায়না কখনও ।

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »