Ultimate magazine theme for WordPress.

প্রলোভনই মৃত্যুর পথে ঠেলে দিচ্ছে অভিবাসন প্রত্যাশীদের

যারা এসব ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তারা মূলত ভবঘুরে। জেনেশুনেই তারা এ মৃত্যুঝুঁকি নিচ্ছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেরা সচেতন হবেন না, ততক্ষণ পর্যন্ত এটি বন্ধ করা কঠিন হবে।

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা  অনলাইন ডেস্ক♦

একটু কষ্ট করে ইতালি পৌঁছতে পারলেই আর চিন্তা নেই। মাসে উপার্জন হবে দেড়-দুই লাখ টাকার সমপরিমাণ। মানব পাচারকারীদের এমন প্রলোভনে স্থির থাকতে পারেননি সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বাসিন্দা নুরুল হক (ছদ্মনাম)।

জীবনের ঝুঁকির কথা জেনেও অবৈধপথে ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। শুরুতেই ৩ লাখ টাকা ব্যয় করে ফ্রি ভিসা নিয়ে কাতার যান তিনি। সেখান থেকে দালালের মাধ্যমে তাকে তুরস্কে নিয়ে যায় মানব পাচারকারীরা। সেখানে একটি খাদ্যগুদামে আটকে রেখে চাওয়া হয় মুক্তিপণ।

এজন্য দেশের জমি বিক্রি করে আরো ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেন তিনি। ইউরোপে যাওয়ার পথে তার সঙ্গে আরো অন্তত ১৭ বাংলাদেশী ছিলেন। ইতালির পথে যাত্রা করার আগে জানতে পারেন, ওই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বহনকারী নৌকাটি ভূমধ্যসাগরে ডুবে গিয়েছে।

এ কথা শুনে পরে দালালদের অনেক অনুনয়-বিনয় করে ইতালিতে না গিয়ে দেশে ফিরে আসেন তিনি। জীবনের শঙ্কাপূর্ণ দিনগুলোর কথা ভাবলে এখনো আঁতকে ওঠেন নুরুল হক।

দালাল ও মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে ভূমধ্যসাগরের বিপত্সংকুল পথ পাড়ি দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইউরোপের দিকে ছুটে যাচ্ছেন বাংলাদেশীরা। ইউরোপযাত্রায় এ পথটিই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।

এ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মৃত্যু হয়েছে প্রচুর মানুষের। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, এ পথ ধরে ইতালির পথে যাত্রা করা প্রতি ৫০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় উপকূলরক্ষীদের হাতে আটকও হচ্ছেন অনেক।

এর পরও থেমে নেই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল। সচ্ছলতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে জীবনের ঝুঁকিকে তুচ্ছজ্ঞান করে ভূমধ্যসাগর পার হয়ে ইউরোপের পথে পাড়ি দিচ্ছেন তারা।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ লাখেরও বেশি মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশী রয়েছেন ১৯ হাজারেরও বেশি।

যেসব দেশের নাগরিকদের মধ্যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অনুপ্রবেশের প্রবণতা দেখা যায়, সেসব দেশের তালিকায় শীর্ষ দশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ, অবৈধ ও বিপত্সংকুল পথে পাড়ি দিতে গিয়ে এখন পর্যন্ত অনেক বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছে। গত বছরের ৯ মে তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে মৃত্যু হয় ৩৭ বাংলাদেশীর। ইউরোপে অভিবাসনের আশায় অবৈধপথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছিলেন তারা।

এছাড়া প্রায়ই অবৈধপথে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে স্থানীয় উপকূলরক্ষী বা কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হচ্ছেন অনেক বাংলাদেশী। সর্বশেষ বৃহস্পতিবারও লিবিয়া থেকে ইউরোপের উদ্দেশে পাড়ি দেয়া ৩৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আটজন বাংলাদেশী।

আর্থিকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনের লোভ দেখিয়ে তাদের সবাইকেই বিপদসংকুল এ পথে টেনে নিয়ে গিয়েছিল মানব পাচারকারীরা। এজন্য ঋণ ও ভিটেমাটি বিক্রি করে পাওয়া টাকা মানব পাচারকারী ও দালালদের হাতে তুলে দিতে হয়েছে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যমতে, সাগরপথে ইউরোপে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাতে গিয়ে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) আটক হয়েছে ৬৩৯ বাংলাদেশী।

সংস্থাটি জানায়, অবৈধভাবে সাগরপথে ইউরোপে পাড়ি জমানোর প্রবণতা দেশের ৮-১০টি জেলার মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। মূলত শরীয়তপুর. ফরিদপুর, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলার মানুষের মধ্যে এ প্রবণতা। অনেক ক্ষেত্রে জেনেশুনেই এসব জেলার অভিবাসনপ্রত্যাশীরা এ মরিয়া প্রয়াসের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।

এ বিষয়ে ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে যেসব বাংলাদেশী আটক হচ্ছেন বা মৃত্যুবরণ করছেন, বিদেশ যাওয়া নিয়ে প্রচণ্ড মরিয়াভাব থেকেই তারা এ পথে যাচ্ছেন। জীবনের ঝুঁকি নিতে তারা একটুও পিছপা হচ্ছেন না।

এটি মূলত তিনটি কারণে হচ্ছে—প্রথমত, যারা এসব ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তারা মূলত ভবঘুরে। জেনেশুনেই তারা এ মৃত্যুঝুঁকি নিচ্ছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেরা সচেতন হবেন না, ততক্ষণ পর্যন্ত এটি বন্ধ করা কঠিন হবে।

দ্বিতীয়ত, মানবপাচার বন্ধে দেশব্যাপী যে সমন্বিত অভিযান চালানো হয়, তা যথেষ্ট নয়। মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি মামলা রয়েছে। যদিও মূল পাচারকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, এ পাচারকারীদের একটা অংশ দেশে আছে।

এর বাইরে মূল যে চক্র তারা লিবিয়া, দুবাই বা তুরস্কে বসে কাজ চালাচ্ছে। তারা কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। এ তিনটি কাজ একসঙ্গে যদি না হয়, তাহলে কিন্তু এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. তাসনীম সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, পাঁচ বছর ধরে বেশির ভাগ শ্রমবাজারে বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে লোকেরা কীভাবে দেশের বাইরে যাচ্ছেন, তা আগে তদন্ত করে দেখতে হবে।

অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অভিবাসন বিভাগের দায়িত্ব। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে অনতিবিলম্বে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

একই সঙ্গে যেসব দেশ থেকে এসব বাংলাদেশী যাচ্ছেন, সেসব দেশের দূতাবাসগুলোকেও আরো সচেতন হতে হবে।

সুত্র -বণিক বার্তা

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »