Ultimate magazine theme for WordPress.

উড়োজাহাজ আবিষ্কার হলো যেভাবে

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা অনলাইন ডেস্ক ♦

পিতা তার দুই ছেলেকে একটি খেলনা হেলিকপ্টার উপহার দিয়েছিলেন। সেটি দেখে দুই ভাই নতুন একটি হেলিকপ্টার তৈরি করে। তখনই বোঝা গিয়েছিল উদিত সূর্যের তেজ। কারণ ওই খেলনা হেলিকপ্টার থেকেই জন্ম নেয় একটি স্বপ্নের- উড়োজাহাজ বানিয়ে দুই ভাই মিলে আকাশে উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন।

গির্জার যাজক মিল্টন রাইট তার দুই ছেলে উইলবার রাইট এবং অরভিল রাইটকে একটি খেলনা হেলিকপ্টার উপহার দেন। সেটির নকশা করেছিলেন হেলিকপ্টার উদ্ভাবক ফ্রান্সের আলফোন্স পে

এ জন্য দুই ভাই সংগ্রহ করেন স্যার জর্জ কেইলি, চানিউট, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি এবং ল্যাংলির এরোনেটিক সংক্রান্ত গবেষণার তথ্যাদি। ১৮৯৬ এবং ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বিমান তৈরির ওপর যত প্রকাশনা রয়েছে সেগুলো তারা সংগ্রহ করে মনোযোগ দিয়ে পড়েন। কেননা ওই সময় তাদের মতো অনেকেই উড়োজাহাজ তৈরির চেষ্টা করছিল। কিন্তু কেউই সেভাবে সফল হতে পারেননি। তাদের দেখানো পথ ধরেই এবার রাইট ভাতৃদ্বয় শুরু করেন ক্লান্তিহীন গবেষণা।

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে উইলবার পাঁচ ফুট উচ্চতার একটি বাক্স ঘুড়িতে পাখা বেঁধে ওড়ার চেষ্টা করেন। পরের বছরই তারা Glider তৈরি করেন। এটিকে ওড়ানোর জন্য আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনার কিটি হকে নিয়ে আসা হয়। উড্ডয়নটি মাত্র ১২ সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। তাতে অবশ্য  তারা দমে যাননি। এরপর ১৯০১ এবং ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে পরপর দুটি পরীক্ষা করেন। তৃতীয়বার তারা নিজেদের উদ্ভাবিত যন্ত্র ব্যবহার করে কিছুটা সাফল্য পান। প্রায় এক হাজার বার এটি ওড়ানো হয়। এর নাম দেন ‘Flyer-1’. ১৯০৩-এর ২৩ মার্চ রাইট ভ্রাতৃদ্বয় উড্ডয়নকৃত গ্লাইডারের প্যাটেন্ট লাভের জন্য আবেদন করেন। এরপর তারা সাধনা অব্যাহত রেখে ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে তৈরি করেন Flyer-111. এবং এটিতে তারা ১০৫ বার উড্ডয়ন করেন। এ ঘটনা পৃথিবীর সকল গণমাধ্যম বিশেষ করে আমেরিকার বিখ্যাত ‘হেরল্ড ট্রিবিউন’ পত্রিকায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়।

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দুই ভাই উড়োজাহাজকে আরও নিরাপদ উড্ডয়নের জন্য ব্যাপক গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। তারা গবেষণা কাজে পৃষ্ঠপোষকতার জন্য আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন। পরে ফ্রান্সের একটি কোম্পানি এবং আমেরিকার সেনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা চুক্তি হয়। চুক্তির শর্তানুসারে দুই ভাইকে দুই দেশে আলাদাভাবে ফ্লাইং করতে হবে। চুক্তি মোতাবেক বড় ভাই উইলবার ফ্রান্সে এবং অরভিল ওয়াশিংটন ডিসিতে কাজ করেন।
শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা উড্ডয়ন যন্ত্রের নকশা। তিনি প্রথম আকাশে ওড়ার তাত্ত্বিক ধারণাদেন

উইলবারের এই গবেষণা ফ্রান্সের এ্যারোনোটিক্যাল গবেষকরা এবং সংবাদ মাধ্যম ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। তাদের ভ্রুকুটি সত্ত্বেও উইলবার ১৯০৮-এর ৮ আগস্ট বিমান নিয়ে সফলভাবে আকাশে ওড়েন। এই উড্ডয়ন সফল ছিল। হাজার হাজার দর্শকদের সামনে উইলবারের এই আকাশে ওড়া দুর্মুখদের একেবারে থামিয়ে দেয়। ওই বছর ১৪ মে ডেটনের চার্লি ফারনাস নামের একজন সহকারী প্রথম যাত্রী হিসেবে উইলবারের সাথে ফিক্সট উইং এয়ারক্রাফ্টে ভ্রমণ করেন। ৮ অক্টোবর প্রথম আমেরিকান নারী এডিথ বার্গ (একজন ব্যবসায়ীর স্ত্রী) উইলবারের সঙ্গে আকাশে ওড়েন।

উইলবার এবং অরভিল বাবার কাছে ওয়াদাবদ্ধ ছিলেন তারা একসঙ্গে উড্ডয়ন করবেন না। বাবা সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই এমন প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন। অরভিল যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট মায়ারে অবস্থিত ইউনাইটেড স্টেট আর্মি চত্বরে ১৯০৮-এর  সেপ্টেম্বর সফলভাবে বিমানের সাহায্যে আকাশে ওড়েন। এরপর ৯ সেপ্টেম্বর তিনি একাকী এক ঘণ্টা ২ মিনিট ১৫ সেকেন্ড একটানা ভ্রমণ করেন। ১৭ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট টমাস সেলফ্রিজকে অবজারভার হিসেবে সঙ্গে নিয়ে আকাশে ওড়েন। কিন্তু এদিন একশ ফুট ওপর দিয়ে কয়েক মিনিট ওড়ার পর বিমানের প্রোপেলার ফেটে যায় এবং বিমানটি কাঁপতে থাকে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিমানটি মাটিতে আছড়ে পরে। সেলফ্রিজের মাথায় আঘাত লাগে এবং তিনি মারা যান। সেটিই ছিল বিমান দুর্ঘটনায় প্রথম মৃত্যুর ঘটনা। অরভিল এই দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হলেও বেঁচে যান।  এরপর ১২ বছর অরভিল আর বিমানে উড্ডয়ন করেননি।
ছোট ভাইয়ের দুর্ঘটনা সত্ত্বেও উইলবার আরও সাহসী হয়ে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণের অঙ্গীকার করেন। ১৯০৯-এর গোড়ার দিকে অরভিলের সঙ্গে ফ্রান্সে তার বোন ক্যাথেরিন যোগ দেন। এ সময় তারা হয়ে ওঠেন পৃথিবীর সবচেয়ে গর্বিত ও আলোচিত পরিবারের সদস্য। বিশ্বের সব মানুষের মনোযোগ তারা কেড়ে নিয়েছিলেন। ১৯১০-এর ২৫ মে হাফমান প্রেইরিতে উইলবার দুটি বিশেষ উড্ডয়ন করেন। তিনি বাবার কাছে দেয়া প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে ছোট ভাই অরভিলকে নিয়ে ৬ মিনিট উড্ডয়ন করেন। সেটিই ছিল প্রথম এবং শেষবারের মতো দুই ভাইয়ের একত্রে আকাশে ওড়া। এরপর উইলবার তার ৮২ বছরের বৃদ্ধ বাবা মিল্টন রাইটকে নিয়ে ৭ মিনিট আকাশে ওড়েন। বিমানটি সাড়ে তিনশ ফুট ওপর দিয়ে ওড়ার সময় বাবা আবেগে আপ্লুত হয়ে বলতে থাকেন, ‘উপরে আরও উপরে ওঠো উইলবার’। সেটিই ছিল মিল্টনের একমাত্র ফ্লাইট।
রাইট ভ্রাতৃদ্বয় ছিলেন চিরকুমার। ব্যস্ততার কারণে তাদের দুজনের বিয়ে করা হয়নি। বিয়ে প্রসঙ্গে উইলবারের সরল এবং সরস উক্তি- ‘আমাদের কারোরই সময় ছিল না একইসঙ্গে একজন স্ত্রী এবং একটি এরোপ্লেন রাখার।’ মাত্র ৪৫ বছর বয়সে উইলবার ১৯১২-এর ৩০ মে মৃত্যুবরণ করেন। উইলবার সম্পর্কে বাবা মিল্টন ডায়েরিতে লেখেন, ‘একটি ছোট জীবন, প্রাপ্তিতে ভরা। অপরাজিত বুদ্ধিমত্তা, চিরশান্ত মেজাজ, বিশাল আত্মনির্ভরতা এবং মহান বিনয়ী, সঠিককে পরিস্কারভাবে দেখা, এর পেছনে অবিচল লেগে থাকা, তিনি বেঁচেছিলেন এবং মারা গেলেন।’ ছোট ভাই অরভিল মারা যান ১৯৮৮-এর ৩০ জানুয়ারি। এখনকার বিমান অত্যাধুনিক। শব্দের চেয়েও দ্রুত গতিসম্পন্ন বিমান আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে বিমান তৈরির সেই প্রথম মুহূর্তগুলো ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং রোমাঞ্চকর। জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বিমান আবিষ্কার করে রাইট ভ্রাতৃদ্বয় ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »