Ultimate magazine theme for WordPress.

আমেরিকায় মানব জাতির বসবাস নিয়ে গবেষণায় মিললো বিস্ময়কর তথ্য!

উত্তর আমেরিকায় সর্বশেষ গ্লাসিয়াল যুগের আগেও মানুষের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি। সেটা প্রায় ১৯ হাজার থেকে ২৬ হাজার বছর পূর্বের সময়ের কথা।

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা ডেস্ক ♦

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ আমেরিকা। ১৪৯১ সালে ইতালীয় নাবিক ও ঔপনিবেশিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস এই দেশটি আবিস্কার করেন। এরপর থেকেই দেশটিতে মানুষের বসবাস শুরু হয়।
তবে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়তই অতীত সম্পর্কিত আরো নতুন সব তথ্য নিয়ে হাজির হচ্ছেন। সম্প্রতি তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে আমেরিকা জন্মেরও পেছনের গল্প। নতুন দুই গবেষণা অনুযায়ী, আমেরিকায় ১৩ থেকে ৩০ হাজার বছর আগেও ছিল মানুষে বাস। সম্প্রতি নেচার জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এমনই খবর।

উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার জনসংখ্যা সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের নানা মত অনেক আগে থেকেই। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ১৩ হাজার কিংবা তারও আগে এসব অঞ্চলে মানুষের বসবাস ছিল। আবার অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণ মিলছে এর সময় আনুমানিক ১৮ হাজার বছরও হতে পারে।

আমেরিকায় বিভিন্ন জাতি, উপজাতিদের স্থায়ী এবং অস্থায়ী বাস। তবে আজো অবদি আমেরিকার স্থানীয় আদি বাসিন্দাদের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। ইতিহাসেও নেই কোনো নথিপত্র। তাদের সংখ্যা বা তথ্য নেই তাদের মানচিত্রেও। তবে এটুকু জানা যায় যে, যুগে যুগে আমেরিকায় ঘাঁটি গেড়েছে অনেক জাতি।
বর্তমানে গবেষকরা অবশ্য বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানসমূহ থেকে নানা তথ্য খুঁজে বের করছেন। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার প্রাচীন সাইটগুলোতে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করছেন। নেচারে প্রকাশিত দুইটি গবেষণার একটিতে প্রাচীন আদিবাসীদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান পাওয়া গেছে।
মধ্য মেক্সিকোর জ্যাকাটেকাসের আর উত্তর আমেরিকার চিকিউইউইট গুহাটির অবস্থান একেবারেই পাশাপাশি। এই এলাকাজুড়ে ৪২টি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট খুঁজে পেয়েছেন গবেষক দল। গুহায় ঘেরা এই অঞ্চলটি রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর আমেরিকাকে সংযুক্ত করেছে। গবেষকরা ধারণা করছে, রাশিয়া এবং কানাডার হিমবাহগুলো গলার কারণেই অতীতে পানির নিচে নিমজ্জিত ছিল আমেরিকা।

উত্তর আমেরিকায় সর্বশেষ গ্লাসিয়াল যুগের আগেও মানুষের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি। সেটা প্রায় ১৯ হাজার থেকে ২৬ হাজার বছর পূর্বের সময়ের কথা। ধারণা করা হয়, এই এলাকা খুব বেশি জনবহুল না হলেও বসতি স্থাপন করেছিল কিছু মানুষ। ২৯ থেকে ৫৭ হাজার বছর আগে হিমবাহ গলে আমেরিকা ডুবেছিল বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। তবে সঠিক সময়টা এখনো জানা না গেলেও স্পষ্ট যে, কলোম্বাসের আবিষ্কারের বহু বছর আগেও এখানে মানুষের অস্তিত্ব ছিল।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী লোরেনা এ.বেসেরা-ভালদিভিয়াই এই গবেষণা দলের প্রধান। তিনি বলেছেন, এগুলো দৃষ্টান্ত পরিবর্তনকারী ফলাফল। যা আধুনিক মানুষকে আমেরিকার ইতিহাস জানতে সহায়তা করবে।
তিনি এবং তার সহকর্মীরা এখানকার ৪২টি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট খনন করছেন। সঙ্গে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে তারা মানব সমাধি পেয়েছেন। চিকুইহাইট গুহায় পাথরের তৈরি সরঞ্জাম পেয়েছেন। যেগুলো হাতে তৈরি বলেই মনে হচ্ছে। এর থেকে বোঝা যায়, প্রস্তর যুগের বাসিন্দা ছিল তারা। প্রাচীনকাল থেকেই মধ্য মেক্সিকোর এই অঞ্চলটি শীতল এবং শুষ্ক। ওই সময় শুধু মানুষ নয় বরং বিভিন্ন প্রাণীরও বসবাস ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রাচীন জাতের উট, ঘোড়া, মাস্টোডনস, ম্যামথ এবং হাতির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এগুলো হয়তো মানুষের খাদ্যের যোগান দিত সে সময়।
গুহার রহস্য :
সিপ্রিয়ান আর্দলিয়ান ২০১০ সালে মে মাসে প্রথম চিকিউইউইট গুহায় প্রবেশ করেন। তিনি কিছু জিনিস দেখে বেশ কৌতূহলী হন। এরপর খননকার্য শুরু করেন সেখানে। পিএইচডিকালীন সময় তিনি এই গুহা নিয়ে গবেষণা করেন। বর্তমানে তিনি মেক্সিকোর ইউনিভার্সিডেড অটোনোমা ডি জ্যাক্যাটেকাসের অধ্যাপক ও প্রত্নতাত্ত্বিক।

সেখানকার স্থানীয় গ্রামবাসীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রথমে গুহার কাছে পৌঁছায় আর্দলিয়ান। তিনি সেখানে একটি চুনাপাথরের টুকরো পান। যেটি পরীক্ষা করে বোঝা যায় এটি প্রায় ৩০ হাজার বছর আগের। এটি অনেকটা পাথর কেটে তৈরি করা সরঞ্জামের মতোই দেখতে ছিল।
এরপর আবার ২০১২ সালে গুহায় খননকার্য চালানো হয়। তবে কিছুদিন পরই তা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আবার শুরু হয় খনন কাজ। সেটা ২০১৬ সালের প্রায় শেষের কথা। সাত সপ্তাহ খননের পর ২০১৭ সালে গুহার প্রবেশদ্বার থেকে ১৬৪ ফুট দূরে আর্দেলিয়ান এবং তার সহকর্মীরা পাথরের বিভিন্ন সরঞ্জাম পায়। যা একসময় মানুষ দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহার করেছিল।
এই গুহায় যে এককালে মানুষের বাস ছিল তারও প্রমাণ মেলে এই গবেষণায়। সরঞ্জামগুলো চুনাপাথর থেকে তৈরি করা হয়েছিল। যা প্রাকৃতিকভাবে গুহায় পাওয়া যায় না। এর অর্থ এগুলো হাতে তৈরি। গুহাটি সমতল থেকে খাড়া হয়ে প্রায় তিন হাজার ২৮০ ফুট উপরে উঠে গিয়েছে। স্থানীয় গ্রামবাসীর সহায়তায় গবেষকরা তাদের সরঞ্জাম সেখানে নিয়েছিলেন।
আর্দলিয়ানসহ তার আট সহকর্মী পুরোটা সময় গুহায় কাটিয়েছেন। এসময় তারা তাদের প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, জেনারেটর নিজেরাই নিয়ে গিয়েছিলেন। গুহায় সূর্যের আলো খুব কম সময়ের জন্যই প্রবেশ করে। ফলে দিনের বেশিরভাগ সময়ই তারা অন্ধকারে জেনারেটর জ্বালিয়ে কাজ করতেন।
এখন সবার মনেই একটি প্রশ্ন, কারা এই অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন? কোথায়ই বা চলে গেছেন তারা? প্রত্নতত্ত্ববিদ ও গবেষক আর্দলিয়ানের মতে, হিমবাহের আগেই এখান থেকে মানুষেরা চলে গেছেন। সেই জাতি হয়তো যুদ্ধ বা মহামারিতে বিলুপ্ত হয়ে গেছে কিংবা হিমবাহের পানির স্রোতে সলীল সমাধি হয়েছে তাদের। তবে এখনো বিস্তর গবেষণা বাকি।
গবেষক দল এখনো গুহায় তাদের গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন। হয়তো এই গুহায় আরো অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন মিলবে অজানা সেই জাতি সম্পর্কে। তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে গুহার দেয়াল পর্যবেক্ষণ করছেন গবেষকরা। এই গুহায় বসবাসকারীদের সম্পর্কে জানা গেলে ঠিক কত বছর পূর্বে মানুষের বাস পৃথিবীতে, তার সঠিক তথ্য জানা যাবে।

তথ্যসূত্র : সিএনএন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »