Ultimate magazine theme for WordPress.

হযরত নূহ আলাইহিস সালামের জীবনী।

প্রথম ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি হল নূহ আঃ এর জাতি বা কওমে নূহ। তাদের এ আজাবের সম্পাপ্তি মুহাররাম মাসের ১০ তারিখে হয়েছিল।

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা নবীদের কাহিনী  ⇒

আল্লাহর গজবে ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীর আদি ছয়টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ, ‘আদ, ছামূদ, লূত্ব, কওমে মাদইয়ান ও কাওমে ফেরাউন সম্পর্কে আল্লাহ তাআল কুরআনে আলোচনা করেছেন। ফলে তাদের সংশোধনের জন্য এবং পথভোলা মানুষদের সুপথে আনার জন্য তাদের মধ্যে হতে নবী ও রাসূল পাঠিয়েছিলেন। তন্মধ্যে প্রথম ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি হল নূহ আঃ এর জাতি বা কওমে নূহ। তাদের এ আজাবের সম্পাপ্তি মুহাররাম মাসের ১০ তারিখে হয়েছিল।

১। পরিচয়-

আদম আঃ থেকে নূহ আঃ পর্যন্ত দশ শতাব্দির ব্যবধান ছিল। যার শেষ দিকে মানবকূল শিরক ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত ছিল এবং তা বিস্তৃতি লাভ করে। ফলে তাদের সংশোধনের জন্য আল্লাহ তাআলা নূহ আঃ কে তাদের মাঝে রাসূল রূপে প্রেরণ করেন। তিনি ৯৫০ বছরে দীর্ঘ বয়স লাভ করেছিলেন এবং সারা জীবন পথভোলা মানুষকে সুপথে আনার জন্য দাওয়াতি কাজে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।

কিন্তু তার স্ব-জাতি তাকে প্রত্যাখ্যান করে। ফলে আল্লাহর গজবে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এ জাতির ঘটনা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে এবং কুরআনের মাধ্যমে জগতবাসী জানতে পেরেছে। হযরত নূহ আঃ, হযরত আদম আঃ এর দশম বা অষ্টম অধঃস্তন পুরুষ ছিলেন। সে জন্য তাকে ‘‘আবুল বাশার সানী” বা দ্বিতীয় আদম বলা হয়। তিনি দুনিয়াতে প্রথম রাসূল ছিলেন। (সহীহ মুসলিম, হা- ৩২৭)

২। নূহ আঃ এর জন্ম-

বর্তমান ইরাকের মুছেল নগরীর উত্তর প্রান্তে নূহ আঃ এর জন্ম হয়েছিল। তার চারটি পুত্র ছিল। হাম, সাম, ইয়াফিস ও ইয়াম বা কেনআন। প্রথম তিন জন নূহ আঃ এর প্রতি ঈমান আনেন, শেষজন কাফের হয়ে মহা প্লাবনে ডুবে মারা যায়। (তাফসীরে কুরতুবী) মহাপ্লাবনের শেষে তার তিন পুত্র হাম, সাম, ও ইয়াফিস এর বংশধর বেঁচে ছিলেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা ছাফফাত- ৭৭)

আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তার (নূহ আঃ) বংশধরগণকেই অবশিষ্ট রেখেছি। (সূরা ছাফ্ফাত- ৭৭)

রাসূল সাঃ বলেন, সাম আরব জাতির আদি পিতা, হাম আফ্রিকীয়দের আদি পিতা ও ইয়াফিস রোমকদের (গ্রীক) আদি পিতা। (আহমদ,হা- ১৯৯৮২)

ফলে ইহুদী খ্রিষ্টানসহ সকল ধর্মের লোকেরা নূহ আঃ কে তাদের আদি পিতা হিসেবে মর্যাদা দিয়ে থাকে।

ইবনে আব্বাস রাঃ বলেন, নূহ আঃ ৪০ বছর বয়সে নবুওয়াত প্রাপ্ত হন এবং মহাপ্লাবনের পর ৬০ বছর বেঁচে ছিলেন। (তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা আনকাবুত- ১৪/১৫)

৩। তৎকালীন সামজিক অবস্থা-

আদম আঃ এর সময় শিরক ও কুফরের মোকাবেলা ছিল না। তখন সবাই তাওহীদের অনুসারী ও একই উম্মত ছিলেন। (সূরা বাকারা- ২১৩)

কিন্তু কালের বিবর্তনে মানুষের মধ্যে শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটে। নূহ আঃ এর স্বজাতি ওয়াদ্দা, সুওয়া, ইয়াগুছ ও ইয়াউক এবং নাসর প্রমুখ নেককার লোকদের উসিলায় আখিরাতে মুক্তি পাবার আশায় তাদের কবর পাকা করে পূজা শুরু করে।

আদাম আঃ ও নূহ আঃ এর মধ্যবর্তী সময়কালে এই পাঁচ জন ব্যক্তি নেককার ও সৎকর্মশীল বান্দা হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাদের মৃত্যুর পর তাদের ভক্ত অনুসারীদেরকে শয়তান এই বলে প্ররোচনা দেয় যে, এই সব নেককার মানুষের মূর্তি সামানে থাকলে তাদের দেখে আল্লাহ তাআলার প্রতি ইবাদতে অধিক আগ্রহ সৃষ্টি হবে। ফলে তারা তাদের মূর্তি বানিয়ে পূজা শুরু করে। তাদের মৃত্যুর পর তাদের বংশধরেরা মূর্তি পূজা অব্যহত রাখে, আর এভাবেই পৃথিবীতে প্রথম মূর্তি পূজার শিরকের সূচনা হয়। (ইবনে কাসীর, বুখারী, হা- ৪৯২০)

অতএব, পৃথিবীর প্রাচীনতম শিরক হল নেককার মানুষের কবর পাকা করে ইবাদতগাহ বানানো এবং পরবর্তীতে তাদের মূর্তি বানিয়ে পূজা করা। যা, আজও প্রায় সকল ধর্মে রূপ নিয়েছে।

৪। দাওয়াত ও প্রচার-

আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি নূহ আঃ কে তার স্বজাতির নিকট প্রেরণ করলাম তাদের উপর মর্মান্তিক আজাব আসার পূর্বেই তাদেরকে সর্তক করার জন্যে। নূহ আঃ তাদের কে বললেন, হে আমার জাতি! আমি তোমাদের জন্য সুস্পষ্ট সতর্ককারী। এ বিষয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। তাতে আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেবেন। তবে এটি নিশ্চিত যে, আল্লাহর নির্ধারিত সময় যখন এসে যাবে তখন তা এতটুকু পেছানো হবে না, যদি তোমরা জানতে। (সূরা নূহ- ১/৪)

নূহ আঃ স্বজাতিকে দিন-রাত, প্রকাশ্যে ও গোপনে দাওয়াত দেন। কিন্তু তারা তার দাওয়াতে অতিষ্ঠ হয়ে তাকে দেখলে পালিয়ে যেত, কখনো কানে আঙ্গুল দিত, কখনো তাদের চেহারা কাপড় দিয়ে ডেকে ফেলতো। তারা তাদের হঠকারীতা ও জেদে অটল থাকতো এবং চরম ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতো। (সূরা নূহ- ৬/৯)

৫। দাওয়াতের ফলশ্রুতি-

আল্লাহ তাআলা নূহ আঃ কে ৯৫০ বছরে সুদীর্ঘ জীবন দান করেছিলেন, তিনি এক পুরুষ হতে দ্বিতীয় তৃতীয় পুরুষকে শুধু এ আশায় দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছিলেন যে, তারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। শতাব্দির পর শতাব্দির অক্লান্তভাবে দাওয়াত দেওয়ার পরও তার স্বজাতি ঈমান আনেনি।

মূলত এই সময় তার স্বজাতি জনবল ও অর্থবলে বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। সংখ্যাধিক্যের কারণে ইরাকের ভূখন্ডের আবাস সংকুলান হচ্ছিল না। আল্লাহর চিরন্তন নীতি এই যে, তিনি অবাধ্য জাতিকে সাময়িক ভাবে অবকাশ দেন। (সূরা বাকারা- ১৫)

৬। বদ দু’আ-

এই সুদীর্ঘ দাওয়াতি জিন্দেগিতে তিনি যেমন কখনো চেষ্টায় ক্ষান্ত হননি, তেমনি কখনো নিরাশও হননি। স্বজাতির পক্ষ হতে নানাবিধ নির্যাতানের সম্মুখিন হয়েও ধৈর্যধারণ করেন। তাদের অহংকার ও অত্যচার চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল এবং পাপ ষোলকলায় পূর্ণ হয়েগিয়েছিল। ফলে নূহ আঃ বললেন-

ক) হে আমার পালনকর্তা! আমাকে সাহায্য কর। কেননা ওরা আমাকে মিথ্যবাদী সাব্যস্ত করেছে। (সূরা মুমিন-২৬)

খ) তুমি আমার ও তাদের মাঝে চূড়ান্ত ফায়সালা করে দাও এবং আমাকে ও আমার সাথী মুমিনদেরকে তুমি মুক্ত কর। (সূরা শুআরা- ১১৮)

গ) আমি অপারগ হয়ে গেছি। এক্ষণে তুমি ওদের ওপর প্রতিশোধ নাও। (সূরা ক্বামার-১০)

ঘ) হে আমার প্রভু! পৃথিবীতে একটি কাফের গৃহবাসীকেও তুমি ছেড়ে দিওনা। যদি তুমি ওদের রেহাই দাও তাহলে ওরা তোমার সৎ বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করবে এবং ওরা পাপাচারী ও কাফের ব্যতীত কোনো সন্তান জন্ম দিবে না। (সূরা নূহ ২৬-২৭)

৭। জাহাজ নির্মাণ-

নূহ আঃ কে যখন জাহাজ তৈরীর নির্দেশ দেওয়া হয় তখন তিনি জাহাজ চিনতেন না, তৈরী করতেও জানতেন না। আর সে কারণেই তাঁকে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিলেন, ‘তুমি আমার চোখের সামনে জাহাজ তৈরী কর আমার ওহী অনুসারে।’ (সূরা হুদ- ৩৭)

এভাবে সরাসরি অহীর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নূহ আঃ এর হাতে জাহাজ শিল্পের গোড়া পত্তন করেন। যুগে যুগে উন্নত সাধিত হয়েছে, আজ আধুনিক বিশ^ সভ্যতা যার উপরে দাড়িয়ে আছে।

৮। চুলা ও তুফান-

আল্লাহ তাআলা বলেন, অবশেষে যখন আমার আদেশ আসল এবং চুলা উথলে উঠল। (সূরা হুদ- ৪০)

ইরাকের মুছেল নগরীতে অবস্থিত নূহ আঃ এর পারিবারিক চুলা থেকে পানি উথলে বের হয়। এটি ছিল মহা প্লাবনের প্রাথমিক আলামত। (তাফসীর কুরতুবী)

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তখন আমি আকাশ সমূহের দুয়ার খুলে দিলাম প্রবল বারিপাতের মাধ্যমে এবং আমি ভূমি থেকে প্রবাহিত করলাম ঝর্ণা সমূহকে। অতঃপর উভয় পানি মিলিত হল পূর্ব নির্ধারিত (ডুবিয়ে মারার) কাজে। (সূরা ক্বামার- ১১/১২)

৯। পরিত্রান ও মুক্তি-

১০ রযব মাসের শুরু হওয়া এই মহা প্লাবনের সমাপ্তি ঘটে, ইরাকের মুছেল নগরীর উত্তরে ‘‘ইবনে ওমর” দ্বীপের অদূরে আর্মেনিয়া সীমান্তে অবস্থিত যুদি পবর্ত মালায়, ১০ মহাররাম তারিখে জাহাজটি মাটি স্পর্শ করার মাধ্যমে। (নবীদের কাহিনী-১ম খন্ড,৭০ পৃঃ)

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »