Ultimate magazine theme for WordPress.

অভিশপ্ত এক হীরা “হোপ ডায়মন্ড”!

প্রথম হীরার খনি পাওয়া যায় ভারতের গোলকন্ডাতে। যদিও ব্রাজিলের হীরার খনিতে সবচেয়ে বেশি হীরার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে।

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা আন্তর্জাতিক ডেস্ক ♦

প্রায় ১.২ বিলিয়ন বছর আগে জন্ম নেয়া এক হীরা “হোপ ডায়মন্ড”, যার জন্মস্থান রয়ে গেছে আজও অজানা। কথিত আছে, এই হীরার টুকরোটি রামের স্ত্রী সীতার মূর্তি থেকে চুরি করে এক দরিদ্র পুরোহিত আর সেখান থেকেই শুরু এর অভিশাপের। একজন ,দুজন নয়, অসংখ্য লোকের মৃত্যুর জন্য দায়ী এই হীরা। এখন পর্যন্ত যতজন মালিকের হাতে গিয়েছে তাদের প্রত্যেকেই মারা গিয়েছেন অপঘাতে, সহায় সম্বলহীন নিঃস্ব অবস্থায়। আর তালিকায় আছেন দরিদ্র পুরোহিত থেকে শুরু করে রাজা- মহারাজা পর্যন্ত সকলে!

Hope diamond। নামটা শুনলেই মনে কি হয় না যে এই হীরার পাথরখানি সৌভাগ্য বয়ে আনে বলেই এই নাম দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা যারা জানেন না, তারা শুনলে তাদের চোখ কপালে ঠে যাবে। ইতিহাস বলছে, এই হীরা যার কাছেই গিয়েছে সে-ই অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে। মূল বিষয়ে যাবার আগে চলুন জেনে নিই এই হীরার উৎপত্তি সম্পর্কে। প্রায় ১.২ বিলিয়ন বছর আগে কার্বন দিয়ে তৈরি এই হীরা গভীর খণিতে তৈরি হয়। প্রথম কোথায় এটি পাওয়া গিয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম হীরার খনি পাওয়া যায় ভারতের গোলকন্ডাতে। যদিও ব্রাজিলের হীরার খনিতে সবচেয়ে বেশি হীরার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। সময়ের পরিক্রমায় এই হীরকখণ্ড বিভিন্ন হাত ঘুরে ফরাসী রত্নপাথর সংগ্রাহক ও ব্যবসায়ী Jean Baptiste Tavernier এর কাছে আসে। তিনি বলেন এই হীরক খন্ড ভারতের গোলকুণ্ডা রাজ্যে (বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশ প্রদেশ) গন্তুর জেলাতে অবস্থিত কল্লুর খনিতে পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু এই হীরাটির প্রথম মালিক কে ছিল? এই বিষয়টি অস্পষ্ট। ধারণা করা হয়, Tavernier এটি কারো কাছ থেকে কিনেছেন কিংবা চুরি করেছেন। আরো অনেক রত্নপাথরের সাথে তিনি এই হীরার বিশাল খন্ডটিও ফ্রান্সে নিয়ে আসেন। এরপর এটিকে কেটে সুন্দর আকৃতি দেয়া হয়। এসময় এর ওজন হয় ১১৫ ক্যারেট কিংবা ২৩ গ্রাম। আরেক বর্ণনা অনুযায়ী এটির ওজন ১১২.২৩ ক্যারেট কিংবা ২২.৪৫ গ্রাম।

হীরার বর্ণনা তো গেল। এবার চলুন প্রবেশ করি মূল কাহিনীতে। কিছু সূত্র অনুসারে, এই হীরার টুকরোটি রামের স্ত্রী সীতার একটি মূর্তি থেকে চুরি করে এক দরিদ্র পুরোহিত। এক সময় সে ধরা পড়ে ও তাকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এরপর এটি Jean Babtiste Tevernier এর মাধ্যমে ফ্রান্সে আগমন করে ১৬৪২ সালে। ট্রাভার্নিয়ার অনেক অর্থের মালিক হয়ে ফ্রান্সে আসেন বটে কিন্তু তার ছেলে সব কেড়ে নেয়। ভাগ্য পুনরুদ্ধারের আশায় তিনি আবার ভারতে পাড়ি জমান। ভারতে আসলে একদিন তিনি একদল উগ্র কুকুরের শিকারে পরিণত হন, যারা তাকে কামড়ে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। হীরার পরবর্তী মালিক ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই। তিনি হীরাটিকে কেটে ১১২ ক্যারেট থেকে কমিয়ে ৬৭.৫ ক্যারেটে নিয়ে আসেন। কিন্তু অভিশাপ তাতে কমে নি। নিকোলাস ফ্যুঁকো নামে একজন রাজকীয় কর্মকর্তা কোন এক রাষ্ট্রীয় নাচের অনুষ্ঠানের জন্য হীরাটি ধার নেন। পরে তাকে হীরা চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে যাবজ্জীবন দণ্ডের আদেশ দিয়ে কারারুদ্ধ করা হয়। সেখানেই তিনি মারা যান। Princess de Lambelle যিনি নিয়মিত এই হীরাটি পরতেন, প্যারিসে একদল জনতার হাতে প্রহারের শিকার হয়ে মারা যান। রাজা চতুর্দশ লুই নিজেও রাজ্য হারিয়ে চরম অবহেলিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এরপর রাজা ষোড়শ লুই ও তার স্ত্রী রাণী Marie Antoinetteকে গিলোটিনে রেখে শিরচ্ছেদের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। ১৮৩০ সালে হীরাটি লন্ডনের একজন ব্যাংকার হেনরি থমাস প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেন। এরপরেই সেই পরিবারের ভাগ্য খারাপ হয়ে যেতে শুরু করে। অবস্থা এতোটাই খারাপ হয়ে যায় যে, হেনরির একজন নাতি সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় মারা যান। এরপরের ১৬ বছর হীরেটি বিভিন্ন জনের হাতে ঘুরে বেড়ায়। হীরের পরবর্তী মালিক ফ্রান্সের জ্যাক কোলেট আত্মহত্যা করেন। এরপরের মালিক রাশিয়ার জার পরিবারের রাজপুত্র ইভান ক্যানিতোভিৎস্কি ১৯০৮ সালে নিহত হন। এরপর চার লক্ষ মার্কিন ডলার দিয়ে তুর্কী সুলতান আব্দুল হামিদ এটি কিনে নেন ও তার উপপত্নীদের মাঝে সবচেয়ে প্রিয় Subaya কে উপহার হিসেবে দেন। কিন্তু এর এক বছরের মাথায় তিনি নিজে Subaya কে হত্যা করেন ও সিংহাসন থেকে পদত্যাগ করেন। হোপ ডায়মন্ডের পরবর্তী মালিক সিমোন মন্থারিডস তার স্ত্রী ও শিশুকন্যাসহ এক মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত হন।

ভারত থেকে ইউরোপ ঘুরে হোপ ডায়মন্ড আর সাথে থাকা অভিশাপ পাড়ি জমালো এবার আমেরিকার উদ্দেশ্যে। মার্কিন ধনুকবের নেড ম্যাক্লিন এক লাখ ৫৪হাজার ডলারের বিনিময়ে হীরাটি কিনে নেন। তার ছেলেটি মারা যায় গাড়ি দুর্ঘটনায় আর মেয়ের মৃত্যু হয় অতিরিক্ত ওষুধে সেবনে। নেডের স্ত্রী মরফিনে আসক্ত হয়ে পড়েন। নেড মারা যান এক বৃদ্ধাশ্রমে। আর তার স্ত্রী অতিরিক্ত মাদকাসক্ত হয়ে মারা যান ১৯৪৭ সালে। অভিশাপ এবার তার গন্তব্য খুঁজে নেয় তার ছয় নাতি-নাতনির ভাগ্যের কাছে। ১৯৬৭ সালে নেডের একজন নাতনি এভালিনকে তার এপার্টমেন্টে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, দৃশ্যত এর কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় নি। নেদের উত্তরাধিকারীরা হীরেটি হ্যারি উইনিস্টন নামে একজন হীরের ডিলারকে বিক্রি করে দেয়। হ্যারি এটি স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে দান করে দেন। তখন থেকে এই হোপ ডায়মন্ড সেখানেই রয়েছে। কিন্তু কেন আর কি কারণে এত সব ঘটলো, বিজ্ঞানের চোখে আজও তা রহস্যই রয়ে গেছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »