Ultimate magazine theme for WordPress.

ইউরোপ এখন আর অবৈধভাবে আসা লোকজনকে আশ্রয় দিতে রাজি নয় ।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা-আইওএমের ২০১৭ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, ভ‚মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ঢোকার চেষ্টা করেছে যেসব দেশের নাগরিকরা, বাংলাদেশিরা রয়েছেন সে রকম প্রথম পাঁচটি দেশের তালিকায়।

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা অনলাইন ডেস্ক ♠

আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির আশায় এ দেশের বিভিন্ন শ্রেণির দক্ষ ও অদক্ষ কর্মী বিদেশমুখী হয়েছে। বিদেশে উপার্জিত অর্থে তাদের জীবনমানের পরিবর্তন ঘটাতেই গত কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কর্মরত থেকে পরিবারের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করছে এবং একই সঙ্গে দেশের জিডিপির ধারাকে শক্তিশালী করছে। এই আগ্রহকে পুঁজি করে মানব পাচারকারী চক্র আমাদের দেশের তরুণদের টার্গেট করে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থের জন্য অবৈধ পথে বিদেশে পাড়ি জমাতে তাদের প্রলুব্ধ করে থাকে। আর সেই প্রলোভনে পড়ে আমাদের তরুণরাও জীবন বাজি রেখে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে উদ্দেশে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সলিল সমাধি হচ্ছে। এশিয়া-আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে লিবিয়া হয়ে ভ‚মধ্যসাগর পাড়ির পুরো রুটে মানব পাচারকারী বিশাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। লিবিয়ায় এখন রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী দেশটির নানা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। আর আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্র ও স্থানীয় দালালদের যোগসাজশে অভিবাসীদের বিভিন্ন জায়গায় আটকে রেখে নির্যাতন করছে এবং জোরপূর্বক মুক্তিপণ আদায় করছে। চাহিদামতো মুক্তিপণ দিতে না পারলে অভিবাসীরা নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে।
বিদেশ পাড়ি দেয়ার নামে মানুষের প্রতারণা ও হয়রানির মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদেশ গমনে যুবকদের অতি উৎসাহের বিষয়টিকে সহজেই পুঁজি করে নিচ্ছে একশ্রেণির দালাল। সময়ের ব্যবধানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের বসবাসের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অনেকেই নানাভাবে ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে পৌঁছে গিয়ে নিজেকে বসবাসের উপযোগী করে নিচ্ছেন। নিজে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই করে নিলেই শুরু হয়ে যায় দেশ থেকে সঙ্গী-সাথী, আত্মীয়-পরিজনকে নেয়ার প্রস্তুতি। আর এক্ষেত্রেই দেখা দিচ্ছে নানা বিপত্তি। তাদের কোনো ট্র্যাভেলস নেই, রিক্রুটিং লাইসেন্সও নেই। শুধু অভিজ্ঞতা রয়েছে চোরাইপথে কীভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি দেয়া যায়। বৈধ পথে যাওয়ার তেমন সুযোগ না থাকায় শেষ পর্যন্ত ঝুঁকির পথেই পা বাড়াচ্ছেন যুবকরা। করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পূর্বে প্রতিদিন বিভিন্ন দেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দালালের পরামর্শে পা বাড়িয়ে ঘরছাড়া হয়েছিল যুবকরা। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা-আইওএমের ২০১৭ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, ভ‚মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ঢোকার চেষ্টা করেছে যেসব দেশের নাগরিকরা, বাংলাদেশিরা রয়েছেন সে রকম প্রথম পাঁচটি দেশের তালিকায়। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ভ‚মধ্যসাগর দিয়ে যত মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করা চেষ্টা করে, সেই তালিকায় বাংলাদেশও আছে। বাংলাদেশের সঙ্গে যে দেশগুলো শীর্ষ তালিকায় আছে সেগুলো হলো- সিরিয়া, নাইজেরিয়া, গায়ানা, আইভরিকোস্ট, মরক্কো, ইরাক, আলজেরিয়া, ইরিত্রিয়া এবং গাম্বিয়া। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের নাগরিকরা কেন আফ্রিকা বা যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার নাগরিকদের সঙ্গে এভাবে সাগর পাড়ি দিচ্ছে?

অনেক বাংলাদেশিরই জানা নেই যে, ইউরোপের পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। ইউরোপ এখন আর অবৈধভাবে আসা লোকজনকে আশ্রয় দিতে রাজি নয়, বরং কাগজপত্রহীন মানুষগুলোকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। নিউইয়র্কে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউর অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রী ইউরোপ থেকে অনিয়মিত বাংলাদেশিদের ফেরত আনার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। অনিয়মিত অভিবাসন দেশের জন্য খুবই অস্বস্তিকর। সিরিয়া, লিবিয়ায় না হয় যুদ্ধ চলছে, তাই সেখানকার নাগরিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথ পাড়ি দিচ্ছেন। কিন্তু বাংলাদেশিরা কেন জীবনের এত ঝুঁকি নিচ্ছেন? শুধুই কি ভাগ্য অন্বেষণ, নাকি যে কোনোভাবে বিদেশে যাওয়ার নেশা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম সম্প্রতি তরুণদের মধ্যে যে জরিপ করেছে, তাতে দেখা গেছে আরো ভালো জীবনযাপন এবং পেশার উন্নতির জন্য বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৮২ শতাংশ তরুণই নিজের দেশ ছেড়ে চলে যেতে চান। এসব তরুণ মনে করেন না যে নিজের দেশে তাদের ভবিষ্যৎ আছে। তাছাড়া এমনিতেই বাংলাদেশিদের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভয়াবহ। তারা মনে করেন বিদেশে গেলে ভাগ্য বদলে যাবে। অনেকের ভাগ্য বদলাচ্ছে সেটাও সত্য।

অভিবাসন বিষয়ে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা লাখ লাখ অভিবাসীকে চরম দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দেয়। কর্তৃপক্ষ সঠিক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে অভিবাসন কার্যক্রম পরিচালনা করলে দেশে কোনো অভিবাসীই বিপাকে পড়ত না। এটা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নয়, বিশ্বের সব দেশের জন্যই একই বিষয়। তবে উন্নত দেশগুলোর অভিবাসন প্রক্রিয়া যথেষ্ট স্বচ্ছ। তাই তাদের অভিবাসন নিয়ে তেমন কোনো সমস্যার উদ্ভব হয় না। আমাদের দেশে অভিবাসীদের প্রতি যথাযথ নজর না দেয়ায় বিভিন্ন দেশে অভিবাসীরা নানা ধরনের সমস্যায় রয়েছেন। এই সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে ভবিষ্যতে এ খাতে বড় রকমের বিপর্যয় দেখা দেবে। অভিবাসীদের সুরক্ষায় অবৈধ অভিবাসনও বন্ধ করতে হবে। শুধু নিজ দেশের নাগরিকদের নয়, একটি দেশের সীমানার মধ্যে যেসব লোকজন থাকবেন তাদের সুরক্ষার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দেশের। এছাড়া অভিবাসী প্রেরণকারী দেশগুলোকেও নিজ দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে হবে। দেশের জন্য অভিবাসন জরুরি। তবে অত্যাবশ্যকীয় নয়। একজন নাগরিককে বিপদে ফেলে দেয়া রাষ্ট্রের কাজ হতে পারে না। বিশ্বজুড়ে এখন অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এক পরিসংখ্যানে বলেছে, ২০১৫ সালেই গৃহহীন ও শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৫৩ লাখ। এর আগে বিশ্বব্যাপী শরণার্থী সংকট আর কখনো ঘটেনি। অভিবাসন একটি নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা। দিন দিন বিভিন্ন কারণে অভিবাসন সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে প্রতিবছরই ভাগ্যোন্নয়নের আশায় অবৈধপথে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন অভিবাসন প্রত্যাশীরা। অবৈধপথে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পথে নির্যাতনের শিকার হন তারা। পথিমধ্যে গভীর জঙ্গলে ও সাগর পাড়ি দিতেই মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। যাত্রাপথে চরম অনিশ্চয়তায় কাটে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দালালদের পাশাপাশি যারা অবৈধভাবে বিদেশে যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। আসুন আমরা সবাই অবৈধ মানব পাচারকারী ও দালালচক্রের মোকাবিলা করে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলি এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করি।

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ : কলাম লেখক ও গবেষক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »