Ultimate magazine theme for WordPress.

দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম-মধ্য অঞ্চলে, প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র পেরু।

দেশটির উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব বরাবর আন্দিজ পর্বতমালা চলে গেছে। বিশ্বের প্রশস্ততম নদী আমাজানের উৎপত্তিস্থল পেরুর আন্দিজ পর্বতের ‘নেবাদু মিসমিন’ নামক চূড়া। পেরুর দু্ই-তৃতীয়াংশ আমাজান রেইন ফরেস্টে আবৃত।

0

©ক্রাইম টিভি বাংলা পর্যটন ডেস্ক:

সাউথ আমেরিকা যাব শুনে মায়ের প্রবল উদ্বেগ। আমাজ়নের জলে দারুণ স্রোত, কুমির আর আনাকোন্ডা গিজগিজ করছে, বিষাক্ত তির নিয়ে চারপাশে লুকিয়ে রয়েছে বিভিন্ন উপজাতি। বুঝলাম, সম্প্রতি টিভিতে দেখানো বাংলা সিনেমার কল্যাণে আমাজ়ন-আতঙ্ক ঢুকেছে মায়ের মনে। বললাম, ওই দিকটাতে যাব না আমরা। আমাজ়নের ধারে-কাছেই যাব না। শুনে দুশ্চিন্তা খানিকটা কমল মায়ের, কিন্তু তার পরেই মায়ের হতাশামাখা বাণী: আমাজ়নই দেখবি না, তবে আর সাউথ আমেরিকা ভ্রমণ কী হল!

তবু বেরলাম। সুইজ়ারল্যান্ড থেকে। আল্পস থেকে আন্ডিজের কোলে। পেরুর অনেক অংশ খুবই উঁচু, রাজধানী লিমা ততটা নয়। বাসে চেপে সারা শহর ঘুরে ঘুরে দেখলাম। প্লাজা দে আরমাস, বিশাল ক্যাথিড্রাল চার্চ এবং সান ফ্রান্সিসকো ক্লোস্টার। ভাল লাগল লারকো মিউজ়িয়ম। বাইরে রঙিন বোগেনভেলিয়া গাছ।

ফেরার পথে মনে হচ্ছিল, দিনটা ভারী সুন্দর। কুড়ি-বাইশ ডিগ্রি তাপমাত্রা, বিকেল চারটে বাজে, আকাশে অস্তমান সূর্য। প্রশান্ত মহাসাগরও দূরে নয়। এত ভাল লাগছিল, ভাবলাম সমুদ্রের কাছাকাছি যাব। আমাদের হোটেলটা পাহাড়ের ওপর, একটু উচ্চতায়। হোটেলে গিয়ে শুনলাম সমুদ্রের জলের কাছাকাছি যেতে হলে অনেকটা সময় লাগবে, আর দিনের আলো না থাকলে তেমন ভালও লাগবে না। তবে কাছেই একটা পাহাড়ি রেলিং দেওয়া চমৎকার জায়গা থেকে সমুদ্র দেখা যায়। অতএব কাছাকাছি একটা শপিং মলে খেয়ে, জল কিনে, ম্যাপ দেখে দেখে সমুদ্র খুঁজতে চললাম। এবং পথ হারিয়ে ফেললাম।

সমুদ্র দূরের কথা, হোটেলও যে বহু দূরে ফেলে এসেছি সেটা বুঝতে পারলাম খানিক বাদে। ফিরতে পারছিলাম না। একজন ট্যাক্সি চালককে ম্যাপ দেখাতে সে স্প্যানিশ ভাষায় নির্দেশ দিতে থাকল। বললাম, আমাদের পৌঁছে দেবে? সে বলল, পাঁচ সল (ওদেশের টাকা, তিন ডলারেরও কম) লাগবে। এয়ারপোর্টের সব জায়গায় লেখা ছিল, অচেনা ট্যাক্সিতে উঠো না, খুব সাবধান। এদিকে এই ট্যাক্সিতে উঠে তো পড়লাম, ট্যাক্সিও চলেছে তো চলেছেই, কিছুই চিনতে পারছি না। বাংলায় জন্মেছি, জীবন কেটেছে ভয়ে। রাস্তায় বেরনো মানেই দুষ্টু লোকের পাল্লায় পড়া। ভাষা জানি না, অচেনা দেশ, এয়ারপোর্টের ওইসব লেখা— মনের মধ্যে আতঙ্ক তোলপাড় করতে থাকল। অবশেষে যখন হোটেল দেখা গেল, ড্রাইভারকে পাঁচের বদলে দশ সল দেওয়া হল। সে খুশি হয়ে অসংখ্য ফ্লাইং কিস ছুড়ে দিল, তবে প্রশান্ত মহাসাগর দেখা হল না।

পরদিন লিমা থেকে কুসকো এলাম প্লেনে। একটা ছোট্ট পাহাড়ি শহর, ইনকা সভ্যতার ছাপ সর্বত্র। ক্যাথিড্রালগুলোয় স্পানিশ স্থাপত্যের প্রভাব। ক্যাথিড্রালের ওপরে অসাধারণ কারুকাজ, সোনালি রঙের ছটায় চোখ ঝলসে যায়। সেই ক্যাথিড্রালের তলায় আলো ঢোকে না, অন্ধকারে রাশি রাশি কঙ্কাল সাজানো। কেমন হরর ফিল্মের সেট-এর মতো ভয়াবহ লাগে। এমনটা আমি আগেও দেখেছি। বাডেনে এমন কঙ্কালের স্তূপ রাখা আছে চার্চের নীচের অংশে। ভাল লাগছিল না একটুও। এসে থেকে পেরুতে একটা বিশ্রী ঘ্যানঘ্যানে মাথাধরা লেগে আছে।

কাছেই একটা দোকানে ঢুকে খেলাম আমরা। গ্রিল্‌ড চিকেন আর সবজি, সঙ্গে ফ্রেশ পাইনাপেল জুস। তবু শরীর খারাপ লেগেই রইল। পরের দিন ছুটি। বাকিরা যাবে কাছাকাছি গ্রামে আমাদের গাইড মিলানির সঙ্গে, আমরা বিশ্রাম নেব।

মিলানি অল্পবয়েসি একটা মেয়ে, চমৎকার জার্মান বলে। ও বলে, ওর শরীরে উপজাতি বা ইনকাদের রক্ত আছে। ওকে দেখলেও তা বোঝা যায়। আমাদের দলের সকলেরই পছন্দ হয়ে গেল ওকে। আমাদের দলের বেশির ভাগই জার্মান, চারজন অস্ট্রিয়ান, আমরা চারজন সুইজারল্যান্ড থেকে। এক জার্মান ভদ্রলোকের সঙ্গে এয়ারপোর্টেই আলাপ হল, হাতে জাপানি ভাষা শেখার বই। জানি না কাকে ইমপ্রেস করার জন্য তিনি এই ভাষা শিখতে শিখতে আমাদের সঙ্গে চললেন। সারা পরিক্রমায় মাত্র একজন জাপানি পেয়েছিলেন তিনি। সারাক্ষণ কমপ্লেন করা কিছু লোকের অভ্যেস— সেই ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এর হোটেলের ভদ্রলোকের মতো, যিনি জানতে চেয়েছিলেন হোটেলে হট অ্যান্ড কোল্ড রানিং ওয়াটার আছে কিনা। এই ভদ্রলোকও খানিকটা তেমন। তাঁকে জিগ্যেস করলাম, মুরাকামি পড়েছ, বা ইশিগুরো! বোঝা গেল তিনি নামও শোনেননি। অবশ্য মুরাকামি, ইশিগুরো বা কুরোসাওয়ার নাম না জানলেও পৃথিবীর যে-কোনও প্রান্তে বেঁচে থাকা যায়, জাপানে তো বটেই। পরে যখন শুনলাম, পেরুর একজন প্রেসিডেন্ট জাপানি ছিলেন, আপাতত জেলে বন্দি, তখন ভাবলাম এঁকে বলি তাঁর সঙ্গে একবার মোলাকাত করে আসতে।

পেরু হল আদ্যোপান্ত দুর্নীতির দেশ। তিনজন প্রেসিডেন্ট বা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী আপাতত জেলে। তার মধ্যে একজন জাপানি। শুধু নিজের পকেট ভরানো ছাড়া এরা নাকি আর কোনও কাজ করেনি। পাশাপাশি দেশগুলো সব ড্রাগের চোরাকারবার করে। সব জায়গায় আমাদের সাবধান করা হয়েছিল এই সব ব্যাপারে।

কুসকোতে দেখলাম বসে থাকলেই জুতো পালিশ এসে বিরক্ত করে। আমার পায়ে চামড়ার জুতো নেই তবু বকরবকর করে যাচ্ছে। আমাকে বহুদিন যাবৎ বহু লোক জিগ্যেস করেছে, আমি লাতিন আমেরিকা মহাদেশের মানুষ কিনা। এদেশে এসে বুঝলাম, আমি একেবারেই এদের মতো দেখতে। প্রচুর লোক স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে চলে। স্প্যানিশ ভাষা জানি না বলে আফসোস হয়।

পরদিন মাচু পিচু গেলাম। বহু দেশে গেছি, বহুরকম অভিজ্ঞতা হয়েছে, কিন্তু মাচু পিচুর মতো কষ্টকর অভিজ্ঞতা আর নেই। যদিও সমুদ্রতল থেকে ২৫৩০ মিটার উঁচুতে এই অঞ্চল, অর্থাৎ কুসকোর চেয়ে নিচু।

সকাল বেলা বাসে করে ওলান্ টেইটেম্বু স্টেশনে এসে ট্রেন ধরা হল। মাচু পিচু চললাম, সঙ্গে চলল উরুবাম্বা নদী। এই নদী আমাজ়ন বেসিনের অন্যতম। আসলে মাচু পিচু অঞ্চলটাই হল আন্ডেস পর্বতমালা ও আমাজ়ন বেসিনের মাঝে। গাছপালা সব কেমন অন্যরকম, উদ্ভিদ আর অন্যান্য জীববৈচিত্র একেবারে স্বতন্ত্র। ভিজে ভিজে আবহাওয়া, অথচ বেশ রোদের দিন। ফার্স্ট ক্লাস ট্রেনে কফি ও বিস্কুট খেলাম। কফিটা খুবই ভাল। বিস্কুটটা পাড়ার বেকারির কালোজিরে দেওয়া নোনতা বিস্কুটের মতো। ট্রেন থেকে নেমে আবার খানিকটা বাসে এলাম। মাচু পিচু ঢোকার আগে মিলানির নির্দেশমতো আমরা সবাই সান ক্রিম এবং তার ওপর মশার স্প্রে লাগালাম। চারদিকে সবাই পুচপুচ করে স্প্রে করেই চলেছে। আফ্রিকায় যেমন সেতসি মাছি, এখানে তেমনি মশার উৎপাত। নানারকম অসুখের ভয়।

মাচু পিচু মোট তিনটে লেভেলে উঠতে হয়। আমি ভেবেছিলাম একটা লেভেলে উঠে চুপ করে বসে থাকব। কিন্তু শেষমেশ তিনটে স্তর পেরিয়ে ওপরে উঠে এলাম। অসম্ভব উঁচু পাথরের সিঁড়ি, বৃষ্টি পড়ে খানিকটা পিছল হয়ে আছে, তবু শেষ ধাপে এসে দারুণ লাগল। এবার ঘুরে ঘুরে সেই পরিত্যক্ত শহরের মধ্যে দিয়ে নামা। নামাটাও কঠিন বেশ।

আমি ইজিপ্ট গেছি। পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন এবং সেসব ধ্বংস হয়ে যায়নি, চোখের সামনে দেখা যায় সবটুকু। ইজিপ্টে যাওয়া যেন ইতিহাসের মধ্যে প্রবেশ করা। সেই তুলনায় মাচু পিচু অনেক নবীন। কিন্তু আশ্চর্য যে, এই হারানো শহরে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত রোমাঞ্চ হল। এই মেঘ, এই ছায়া, এই ভয়ানক রোদ্দুর। তার মাঝে লুকোচুরি খেলছে ইনকাদের শহর, প্রাচীন এই সভ্যতা। সূর্যদেবতার উপাসনা করত তারা। এখানে এই পবিত্র শহরে থাকতেন ইনকা রাজা ও তাঁর সঙ্গী, মানে উচ্চবর্গের ইনকারা।

ইনকা ও অ্যাজটেক দুই সভ্যতাই স্প্যানিশরা এসে ধ্বংস করে। মাচু পিচু ছেড়ে অধিবাসীরা পালিয়ে যায়। এমনকী শহরের প্রবেশের সেতুগুলোও ধ্বংস করে দিয়ে যায় তারা। বহুদিন এই শহর সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না বাইরের মানুষের। ১৯১১ সালে হিরাম বিংহাম নামে একজন আমেরিকান প্রত্নতত্ত্ববিদ এই শহরের সন্ধান পান।

মাচু পিচু ছেড়ে চলে যাবার পেছনে শুধু স্প্যানিশ নৃশংসতা ছিল মনে হয় না। তারা অনেক প্রাণঘাতী রোগ নিয়ে এসেছিল ইউরোপ থেকে। স্মল পক্স একের পর এক জীবন কেড়ে নিচ্ছিল মাচু পিচু শহরে। একে সূর্যদেবতার এক ভয়ানক রোষ ভেবে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে শহর ত্যাগ করে অধিবাসীরা। পেছনে পড়ে থাকে তাদের বিজ্ঞানচর্চা, সূর্য উপাসনা এবং জীবন যাপনের যাবতীয় উপকরণের ধ্বংসাবশেষ।

অনেকে আমাকে বলেছিল, মাচু পিচুতে দেখার কিছু নেই, পরিত্যক্ত একটা শহর। তেমন কিছু প্রাচীনও নয়। আমার তেমনটা মনে হয়নি। প্রথমত, পেরুতে যেমন সমুদ্র আছে, পাহাড় আছে, তেমন ট্রপিকাল রেন ফরেস্টও আছে, মাচু পিচু থেকে খানিকটা দূরে অবশ্য। তবে এই অঞ্চলটা খুব ইন্টারেস্টিং, ভৌগোলিক দিক দিয়ে। এ হল জঙ্গল অঞ্চল। এই যে উরুবাম্বা নদী, যার জল সাদা। মনে হয় এমন নদী আগে কখনও দেখিনি।

পরদিন সারাদিন কাটল পথে। শুধু বাসে বসে থাকা। যাচ্ছি পুনো শহরের দিকে, টিটিকাকা লেকের পাশে। আজ এ পথের সবচেয়ে উঁচু রে লায়া পাস পেরিয়ে যাব। শুনেছিলাম রে লায়া পাসে নাকি অনেকে জ্ঞান হারান, আমার তিনি মোবাইল হারালেন। না চুরি নয়, একদমই নয়। আলপাকার লোমের টুপি কিনছিলেন, মোবাইল টেবিলে রেখে উনি টুপি কিনে খুব খুশি হয়ে বাসে উঠলেন। ঘণ্টাখানেক বাদে খেয়াল হল। মোবাইল আর পাওয়া গেল না অবশ্য।

ইতিমধ্যে হল কী আমাদের একজন সহযাত্রী জার্মান মহিলা, দলে তিনিই সবচেয়ে বয়স্ক, বাসের মধ্যে বেশ চেঁচামেচি করতে লাগলেন। তিনি রোজ সকালে ইনসুলিন নেন, আজ ক্যাপসুল খুলতে পারেননি, নতুন লটের ওষুধ। বাসের সবাই— সব্বাই— একবার করে চেষ্টা করল ক্যাপসুল খুলে সিরিঞ্জ টা লাগানোর। কেউ পারল না। শেষে বাস থামিয়ে ওষুধের দোকানে যাওয়া হল, তারাও ফেল। তখন তিনি বলতে লাগলেন, আমি মারা যাব, আমি আজ মারা যাব।

বাস দাঁড়াল হসপিটালের সামনে। প্রায় একঘণ্টা। কী হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না। আমার তিনি এবং অল্পবয়েসি দুটো ছেল- মেয়ে সঙ্গে গেছে। মিলানি বেশ উত্তেজিত, অনেকটা সময় নষ্ট হচ্ছে। অবশেষে তাঁরা ফিরলেন। শুনলাম ডাক্তার আসতে দেরি হচ্ছিল। ডাক্তার এলে মহিলা নাকি নিজেই প্যাঁচ ঘুরিয়ে ক্যাপসুল খুলে ইঞ্জেকশন নেন। সব্বাই যে কী বিরক্তই হল!

মাঝে এক জায়গায় থেমে আমরা রাকচি দেখলাম। এটা ইনকাদের এক মন্দিরের ভগ্নাবশেষ। খাওয়ার কথা লিখছি না। শুধু মাংস আর মাংস। আমার তিনি আলপাকার মাংস খেলেন, আমি নিরামিষ বার্গার একটা। সকালে ব্রেকফাস্টে প্রচুর ফল পাই যদিও, পাকা পেঁপে, কলা, আম। কিন্তু রাস্তায় ফল বিক্রি হচ্ছে খুব কম। আম পাওয়া গেলেও খেতে ভাল না।

আমাদের হোটেলটা একদম টিটিকাকা লেকের পাশে। ভাবলাম ঘুমোব না, সারারাত বারান্দায় বসে থাকি। এই সেই টিটিকাকা লেক! কত পড়েছি। আজ মুখোমুখি আমরা। ৩৮১২ মিটার উঁচু তে এই লেক। কিন্তু সেই মাথাধরা। এখানেও। নাছোড়।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »