Ultimate magazine theme for WordPress.

ব্রাজিলের সরকারের চাপে রোগীকে হাইড্রোক্সি ক্লোরোকুইন দিচ্ছেন চিকিৎসকরা!

দক্ষিণ আমেরিকায় করোনাভাইরাসের কেন্দ্রস্থল ব্রাজিলে প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার মানুষ আক্রান্ত শনাক্ত হচ্ছে। দেশটিতে ২৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, আর মৃত্যু হয়েছে ৯০ হাজারেরও বেশি মানুষের। 

0

সার্জেন্ট জোনাস মেনদোনকার লাশবাহী গাড়িকে ঘিরে পুলিশের অশ্বারোহী বাহিনী লাল ধুলা উড়িয়ে ছুটল কবরস্থানে। কেউই হয়তো ভাবেননি এটা সার্জেন্ট মেনদোনকার হতে পারেন। তার পরিবার বলছে, ৫৮ বছর বয়সী এ মিলিটারি পুলিশের মধ্যে যখন করোনাভাইরাস সংক্রমণের মৃদু উপসর্গ দেখা দেয় তখন তার ওজন খানিকটা বেড়ে গেলেও স্বাস্থ্য ভালোই ছিল। চারদিন পর ভয়াবহ জ্বর এলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

মেনদোনকার পরিবার জানায়, ব্রাজিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তার চিকিৎসক তাকে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন দেন, সাথে ছিল অ্যান্টিবায়োটিক, জ্বর কমানোর ওষুধ ও অ্যাড্রেনালিন।

তার মেয়ে থাইস সাতুরনিনো মেনদোনকা বলেন, ‘সর্বশেষ দুই দিন চিকিৎসকরা খুব আশাবাদী ছিলেন। জ¦রও চলে গেল। ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের অবস্থারও উন্নতি হলো। ভালোই ছিল।’

তবু আকস্মিক তিনি মারা গেলেন। এ নিয়ে থাই বলেন, ‘ঈশ্বরের ইচ্ছা!’

দক্ষিণ আমেরিকায় করোনাভাইরাসের কেন্দ্রস্থল ব্রাজিলে প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার মানুষ আক্রান্ত শনাক্ত হচ্ছে। দেশটিতে ২৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, আর মৃত্যু হয়েছে ৯০ হাজারেরও বেশি মানুষের।

দেশটিতে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। বিজ্ঞান দেখিয়েছে, ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রোক্সি ক্লোরেোকুইন কাজ করে না। কিন্তু ব্রাজিলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আর প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো জোর দিয়ে বলছেন, এটা কাজ করে। তাতে হাজারো ব্রাজিলিয়ান মিথ্যা আশায় প্রলুব্ধ হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারের চাপেই চিকিৎসকরা এই ওষুধটি রোগীকে দিচ্ছেন।

মেনদোনকার ভাই জুরাসিও এখন ক্লোরোকুইন খাচ্ছেন। সঙ্গে আছে ইনভারমেকটিন, অ্যাজিথ্রোমাইসিন ও সরকার অনুমোদিত অপ্রমাণিত একটি ককটেল। তিনি বলেন, ‘এই তো আমি। আমার বন্ধুবান্ধবের মধ্যে অন্য যারা হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন সেবন করেছে সবাই বেশ ভালো আছে। কিন্তু একটি কথা: কখনো কখনো ভিন্ন একটি ইস্যু কোনো ব্যক্তিকে গুরুতর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে। বুঝেছেন?’

ওষুধটি নিয়ে বিতর্কের যেন শেষ নেই। এ নিয়ে গবেষণার পর গবেষণা হয়েছে। অবশেষে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এটি কভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে কার্যকর তো নয়-ই, বরং ক্ষতির কারণও হতে পারে।

ব্রাজিলে ৫৫টি হাসপাতালে ক্লোরোকুইন নিয়ে সমীক্ষা চালায় রিসার্চ গ্রুপ ‘কোয়ালিজাও কভিড-১৯ ব্রাজিল’, যার সদস্য ছিলেন হসপিটাল সাও পাওলোর পরিচালক ও অধ্যাপক ফ্লাভিয়া মাচাদো। তিনি জানান, রোগটির প্রাথমিক পর্যায়ে এটির ব্যবহার নিয়ে তারা গবেষণা অব্যাহত রেখেছেন, যদিও এটি শুধুই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ব্যবহার করা উচিত। তার কথায়, ‘আমরা ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছি এবং এখন পর্যন্ত যে তথ্যপ্রমাণ পেয়েছি তা এটি ব্যবহারের বিপক্ষেই কথা বলছে।’

ক্লোরোকুইন নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্ক চরমে। কেউবা এটির বিক্রির জন্যই ব্যবহারের পক্ষে কথা বলেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সার্জন জেনারেল ডা. বিবেক মূর্তি বলেন, এতে সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়। তার কথায়, ‘সব সময়ই ক্লোরোকুইন ঘিরে আমার এমন কল্পকাহিনীকে তাড়াতে সময় ব্যয় করি। কিন্তু এখন মূল সমস্যার সমাধান না করে এ নিয়ে সময় নষ্ট করা অর্থহীন।’

এমন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে এই ওষুধের পক্ষে সবচেয়ে সরব ছিলেন সেখানে হোয়াইট হাউজের কভিড-১৯ মোকাবেলা বিষয়ক সমন্বয়ক ডেবোরাহ বার্কস বলছেন, ক্লোরোকুইন যে কাজ করে তার কোনো প্রমাণ নেই।

ব্রাজিলে অবশ্য ওষুধটির পক্ষের মানুষগুলো এ নিয়ে গবেষণার ফলকে প্রত্যাখ্যান করে বলছেন, রোগের প্রথম দিকে এর কিছু ইতিবাচক প্রভাব আছে। এছাড়া এই গবেষণাকে চ্যালেঞ্জ করে আরো কিছু প্রতিবেদনও করা হয়েছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসোনারো তো তার সমর্থকদের সঙ্গে যেকোনো সমাবেশ কিংবা বৈঠকে এ ওষুধের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন এবং নিজেও এ ওষুধটি সেবন করে সম্প্রতি করোনাভাইরাস সংক্রমণ কাটিয়ে উঠেছেন বলে দাবি করছেন।

ক্লোরোকুইনের মিলিয়ন মিলিয়ন ডোজ আমদানি করেছে ব্রাজিল। সাও পাওলো রাজ্য মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন পরিচালিত এক জরিপ বলছে, ৫০ শতাংশ চিকিৎসকই চাপের মুখে অপ্রমাণিত এই ওষুধটি রোগীকে পথ্য হিসেবে খেতে দিচ্ছেন।

সূত্র: সিএনএন

 

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Translate »